ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১২ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮:২৩, ২৭ আগস্ট ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে উদ্ধার বাংলাদেশে অত্যন্ত দুর্লভ ‘সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্ন

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকায় একটি বিরল প্রজাতির ‘সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক’ (Siebold’s Water Snake) উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয়দের কাছে অপরিচিত এই সাপের বাচ্চাটি দেখতে পেয়ে প্রথমে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সাপটির প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।

বুধবার (২৬ আগস্ট) উপজেলার সিন্দুরখান বাজারসংলগ্ন কুঞ্জবন এলাকায় স্থানীয় লোকজন সাপের একটি বাচ্চা দেখতে পান। অপরিচিত সাপটি দেখে ভয় পেয়ে স্থানীয়রা সেটিকে আটক করে নিরাপদ স্থানে রাখেন।

পরে কুঞ্জবন এলাকার প্রধান শিক্ষক একরামুল কবীর বিষয়টি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে জানান। খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সাপটি দেখে তাঁরা এটিকে বিরল কোনো প্রজাতির জলজ সাপ হতে পারে বলে ধারণা করেন।

সাপটির সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, মনিরুল খান এবং বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের পর সাপটির পরিচয় সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক (Ferania sieboldii) হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশে দুর্লভ জলজ সাপ
সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক হোমালোপসিডি (Homalopsidae) পরিবারের একটি জলজ সাপ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ferania sieboldii। পুরোনো বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে প্রজাতিটিকে Enhydris sieboldii নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে Ferania sieboldii নামটি স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশের সরীসৃপের ওপর প্রকাশিত ‘Red List of Bangladesh: Reptiles and Amphibians’-এ প্রজাতিটিকে Enhydris sieboldii নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এ প্রজাতির নিশ্চিত রেকর্ড অত্যন্ত সীমিত এবং ২০১৫ সালের মূল্যায়নে এর বাংলাদেশি সংরক্ষণ-অবস্থা Data Deficient (DD) বা তথ্য-অপ্রতুল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে দেশের জলাভূমিতে এ সাপের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এর সম্ভাব্য বিস্তৃতির কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৩ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের সাপের একটি চেকলিস্টেও Ferania sieboldii বা সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেককে মৃদু বিষধর (mildly venomous) প্রজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই গবেষণায় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের জলাভূমিসহ দেশের কিছু সমতল অঞ্চলে এ প্রজাতির বিস্তৃতির কথা বলা হয়েছে।

জলাভূমিই এর প্রধান আবাস
গবেষণা অনুযায়ী, সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেক মূলত স্বাদুপানির জলাভূমি, নদী, নদীর প্লাবনভূমি, খাল ও পুকুরের মতো জলাশয়ের আশপাশে বসবাস করে। কাদাযুক্ত তলদেশ এবং জলজ উদ্ভিদসমৃদ্ধ পরিবেশ এদের জন্য উপযোগী। অনেক সময় এরা কাদার মধ্যে লুকিয়ে থাকে।

এ প্রজাতির খাদ্যতালিকায় স্বাদুপানির মাছ, ব্যাঙ ও অন্যান্য ছোট জলজ প্রাণী রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজাতিটি জলজ পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে অভিযোজিত এবং এর জীবনযাপন সম্পর্কে এখনো তুলনামূলকভাবে কম তথ্য পাওয়া যায়।

সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেকের শরীরে সাধারণত বড় বড় অনিয়মিত কালচে বা বাদামি দাগ দেখা যায়। এর আঁশ মসৃণ এবং জলজ জীবনযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এ প্রজাতির দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০-৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

মৃদু বিষধর, তবে মানুষের জন্য বড় হুমকি নয়
সাপটিকে স্থানীয়ভাবে ‘বিষহীন’ বলে মনে করা হলেও বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসে সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেককে পুরোপুরি বিষহীন বলা যায় না। এটি পেছনে বিষদাঁতযুক্ত (rear-fanged) এবং মৃদু বিষধর সাপের অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি গোখরা, কালাচ বা অন্যান্য চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষধর সাপের মতো নয়।

তাই এ ধরনের সাপ দেখলে আতঙ্কিত হয়ে মেরে ফেলার পরিবর্তে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী বা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। বিশেষ করে অপরিচিত কোনো সাপ নিজে হাতে ধরার চেষ্টা না করাই নিরাপদ।

সিলেট অঞ্চলের জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা:
সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেকের উপস্থিতি শ্রীমঙ্গলের জলাভূমি ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বাংলাদেশে প্রজাতিটির বিস্তৃতি, সংখ্যা ও জনসংখ্যার প্রবণতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এ কারণে এ ধরনের প্রত্যেকটি নির্ভরযোগ্য রেকর্ড গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, জলাভূমি ধ্বংস, জলজ উদ্ভিদ অপসারণ, পানিদূষণ এবং মাছ ধরার জালে আটকে পড়া এ ধরনের জলজ সাপের জন্য সম্ভাব্য হুমকি। ফলে জলাভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ এ প্রজাতিসহ অন্যান্য জলজ সরীসৃপ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর
উদ্ধার করা সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় নিরাপদে রাখা হয়। পরে সেটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সাপটিকে এর উপযোগী প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা সম্ভব হবে।

শ্রীমঙ্গলের কুঞ্জবন এলাকায় পাওয়া এই সাইবোল্ড’স ওয়াটার স্নেকের ঘটনাটি শুধু একটি বিরল সাপ উদ্ধারের ঘটনা নয়, বরং স্থানীয় জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকা অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত প্রাণীদের অস্তিত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এ ধরনের প্রাণী সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এবং সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে এগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি।

ইএন/এসএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়