ঢাকা, বুধবার   ০৮ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৩ ১৪২৭

তানভীর রাসিব হাশেমী

প্রকাশিত: ১০:২৯, ২৫ জুন ২০২০

দেশ এখন মাছের স্রোতে ভাসে

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

সরকারের নানবিধ বহুমুখী প্রকল্পের কারণে দেশে প্রাকৃতিক দূষণ হ্রাস পেয়েছে অনেকাংশে। ফলে কিছুটা হলেও ভারসাম্য ফিরেছে প্রকৃতিতে। জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদ প্রকৃতির নিজস্ব গতিতে বৃদ্ধির সুযোগ পেয়েছে। ফলে দেশে প্রচুর পরিমাণে মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মৎস্যসম্পদ বিষয়ে সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছে। বিশ্বের যেসব দেশে মৎস্য উৎপাদনের হার বাড়ছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয় থেকে এবার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা আগের মতোই পঞ্চম স্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে মূলত ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি। দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলোতে গত এক যুগে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯০ হাজার টন। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। সূত্র জানায়, ২০১৯-২০২০ সমাপ্ত অর্থবছরে সেই রেকর্ড ভেঙে এখন পর্যন্ত ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ গত ১১ বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ।

তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫ থেকে ১৩০টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। দেশে প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ইলিশের অভয়াশ্রম। ক্রমবর্ধমান ইলিশ উৎপাদনের এই প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে ইলিশ উৎপাদনের রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একইসঙ্গে ইলিশ উৎপাদনেও বাংলাদেশ রয়েছে প্রথম স্থানে।

গত ৮ জুন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে মিঠাপানির মাছে বাংলাদেশ তার তৃতীয় স্থান ধরে রেখেছে। বিশ্বে মাছ উৎপাদন বাড়ানোর দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এ বছর দেশে মাছ উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

সরকারের দূরদর্শী বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে প্রজনন ঋতুতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা আগের তুলনায় বেশি কার্যকর হচ্ছে। এ ব্যাপারে জেলেদের সচেতনতা বেড়েছে, সরকারি প্রশাসনের নজরদারির ব্যবস্থাও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। এরপরে রয়েছে পুকুর ও ছোট জলাশয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অগ্রগতি। এক্ষেত্রে দেশের মৎস্যবিজ্ঞানীদের বিরাট অবদান রয়েছে। তারা বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো চাষিরা পুকুর ও ছোট জলাশয়ে পরিকল্পিতভাবে ও বাণিজ্যিক লক্ষ্যে উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন। 

বিজ্ঞানীরা অনেক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির দেশি মাছের আধুনিক চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং চাষিরা সেগুলো উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন বলে ওই মাছগুলো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিজ্ঞানী চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান বলেন, এ বছর নদীতে মাছের খাবার ভালো রয়েছে। সব স্থানের জলাশয়ে খাদ্য প্রচুর থাকায় ইলিশসহ সব মাছ দ্রুততার সঙ্গে বাড়ছে। করোনাসহ সম্ভবত আম্ফানের প্রভাবে এমনটি হয়েছে। এরকম দূষণমুক্ত পরিবেশ বহু বছর পরে লক্ষ্য করা গেছে। ইলিশ উৎপাদনে এ বছর পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মৎস্য উৎপাদন ক্রমে বৃদ্ধির এ খবর বিশেষত এই কারণে সুখবর যে এই মাছ থেকে আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীর আমিষের ঘাটতি ক্রমে দূর হচ্ছে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মোট প্রাণিজ আমিষের চাহিদার অর্ধেকের বেশি অংশ এখন পাওয়া যাচ্ছে মাছ থেকে।

এদিকে, সরকারের প্রচেষ্টায় ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক সম্পদের ওপর আমাদের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদের বর্তমান উৎপাদন দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের মধ্যে আমরা মাত্র ২৫-৩০টি মাছ ও চিংড়ি–কাঁকড়া বাণিজ্যিকভাবে আহরণ করে থাকি। সরকার ধীরে ধীরে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপ্রচলিত অমেরুদণ্ডী প্রজাতি, যেমন অক্টোপাস, সেপিয়া, লোলিগো ও শামুক আহরণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়