ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২০ জানুয়ারি ২০২২,   মাঘ ৭ ১৪২৮

দীপংকর মোহান্ত

প্রকাশিত: ২১:৫৭, ৫ নভেম্বর ২০২১
আপডেট: ২২:৩২, ৫ নভেম্বর ২০২১

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা

মৌলভীবাজার : এক ছায়াতলে অসংখ্য মতের সম্প্রীতির কেন্দ্র

হযরত শাহ মোস্তাফা [র.] সহ শাহজালালের অনেক সফরসঙ্গী মৌলভীবাজারে ধর্ম প্রচারে এসেছিলেন। শাহ মোস্তফা মৌলভীবাজারে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়ান। ষাট-সত্তর বছর আগেও শাহ মোস্তফা সাহেবের মাজারে বার্ষিক ওরসের সময় ‘ভাতের মেলা’ বসতো। অর্থাৎ সবাই বাড়ি থেকে রান্না করা ভাত নিয়ে এসে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করতেন।

বিধাতার নিপুণ তুলির আঁচড়ে মৌলভীবাজারের ভূ-পরিবেশ যেন এক শোভন ও নান্দনিক রূপ লাভ করেছে। নয়নাভিরাম একটু জায়গার মধ্যে রয়েছে পর্বতময় অসংখ্য পাহাড়-টিলা-বন-বনাঞ্চল। তার বুক চিরে বয়ে চলা ছোট-ছোট পাহাড়ি ছড়ার সাথে মিতালি করেছে বিল-ঝিল-হাওর। আবার সমতলভূমিকেও পরম মমতায় আগলে রেখেছে কোলে। প্রকৃতির ছন্দের সাথে সবাই দোল খায় তালে-তালে। ফলে এ জনপদে জীববৈচিত্র্য ও জন-সম্প্রদায়ের বিচিত্র্যময় কোলাহল জেলার প্রাণশক্তিকে সচল রাখছে। মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য ও মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস দেশ-বিদেশে সমাদৃত।

পাহাড়ের ভাঁজে-ভাঁজে মাতৃতান্ত্রিক ‘খাসিয়া বা ‘খাসি’ নৃগোষ্ঠীর বসবাস জনমণ্ডলের প্রাচীনত্ব দাবী করে। এই মোহনীয় বন-বনাঞ্চল ও মুক্ত পরিবেশ-ই এককালে কুকি, ত্রিপুরী, সিন্টেঙ্গসহ অনেক অস্ট্রিক-নৃগোষ্ঠীকে বসবাসে আহবান করেছিল। এখনো কয়েকটি নৃ-গোষ্ঠী ক্ষয়িষ্ণুধারা জনপদে বিদ্যমান রয়েছে। সমতলের ভূমিপুত্র ‘শব্দকর’ সমাজের জীবনধারা ও গ্রামীণ কৃষি সংস্কৃতি জানান দেয় যে- বহুকাল আগ থেকেই এই বিশাল মুক্ত বায়ুর আঙ্গিণায় মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। উনিশ শতকের শুরুতে ‘মণিপুরী’ নৃগোষ্ঠীর আগমন ঘটে। ঐতিহাসিককালে ভাটেরা ও পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের সাক্ষ্য দেয় যে, খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মৌলভীবাজারে বহিরাগত লোকদের স্থায়ী আবাসন গড়ে ওঠেছে। আবার ঔপনিবেশিকদের হাতে চা-গাছ আবিষ্কারের সূত্র ধরে মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য ও বিভিন্ন জন-সংস্কৃতির চা-শ্রমিকদের মিলন-মেলার হাট বসেছে। জেলা ‘সবুজ-বরণ’ টিলার ফাঁকে তারই মুক্তা ছাড়ায়। ফলে জন-জীবনের স্রোতে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় ছাপ পড়েছে। বর্তমানে হিন্দু-মুসলমানের পাশাপাশি খাসিয়া, মণিপুরি [বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ, মুসলিম মণিপুরি], ত্রিপুরী, সাঁওতাল, মুণ্ডা প্রভৃতি অনেক কৃষ্টি-সংস্কৃতির লোকজন একত্রে বসবাস করছে। যা সমৃদ্ধ মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি।

মৌলভীবাজার জেলায় বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় ৫০,০০০ লোকজন আছেন বলে অনুমান করা হয়। তবে পাহাড়-হাওরের কারণে এই জনপদে মূল লোক সংখ্যা বরাবর কম ছিল। প্রকৃতির মতো স্থানীয় মানুষের জীবনধারাও শান্ত প্রকৃতির। এখানে বিচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সুর বেজেই চলছে।

মৌলভীবাজারবাসীর জনমানসে ধর্মীয় সমন্বয় ও সম্প্রীতি লক্ষ করা যায়। যা  সুপ্রচীনকালে এই অঞ্চলে শৈব-বৌদ্ধ-তন্ত্র ধর্মের অম্বীতধারা বাণ ডেকেছিল। পরে ব্রাহ্মণ্যবাদের মৃদু হাওয়া লাগে। চৈতন্য-পূর্ব বৈষ্ণব উপাসনার পরশে মানুষ জেগে ওঠে [বিষ্ণু মূর্তি/শালগ্রাম অর্থে]। এই মতবাদগুলো জনচিত্তে ঐক্য ও মিলনের বন্ধনে একাকার হয়ে যায়। এটাই মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য।

সুদীর্ঘদিন চলার পর চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পীর হযরত শাহজালাল [রা.] কর্তৃক সিলেট বিজয়ের পর মৌলভীবাজারের মাটিতে সুফিবাদী ধারার উন্মেষ ঘটে ও মুসলিম শাসনের যাত্রা শুরু হয়। নবাগত এই ধর্মমতকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানায়। সুফিবাদের সাথে স্থানীয় ধর্ম-সংস্কৃতির দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে পুনরায় মানবীয় ধর্মের পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে বহুমত্রিক ধর্ম মতে কেউ কাউকে আঘাত করতে দেখা যায়নি। হযরত শাহ মোস্তাফা [র.] সহ শাহজালালের অনেক সফরসঙ্গী মৌলভীবাজারে ধর্ম প্রচারে এসেছিলেন। শাহ মোস্তফা মৌলভীবাজারে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়ান। ষাট-সত্তর বছর আগেও শাহ মোস্তফা সাহেবের মাজারে বার্ষিক ওরসের সময় ‘ভাতের মেলা’ বসতো। অর্থাৎ সবাই বাড়ি থেকে রান্না করা ভাত নিয়ে এসে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করতেন [বিশেষত মুসলিম সমাজ]।

মাজারে হিন্দুদের সরব উপস্থিতি থাকতো। এইদিন আবার পৌষ সংক্রান্তির উপলক্ষে মাছের মেলা জমে ওঠে। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের আনন্দ প্রায় একই সময় হয়ে থাকে। মধ্যযুগে এই জায়গায় শ্রীচৈতন্যের প্রেমধর্ম বা মানবধর্ম ও সুফিবাদ বা মরমিবাদ মিলেমিশে দাস্যভাবে মধুর রসে স্রষ্টার মধুকোষে সমর্পিত হওয়ার উপাদান যোগায়। শ্রীচৈতন্যের পার্ষদ ও বৈষ্ণব পদকর্তা বি ত ঘোষ ও বাসু ঘোষ এই মাটির সন্তান। মুসলিম শাসনামলে চৈতন্যোত্তর সমন্বয়বাদী বৈষ্ণবধারা বিকাশ লাভ করে। ফলে এই মাটি থেকে ওঠে আসেন পাগলা শঙ্কর, ঠাকুরবাণী, অজ্ঞান ঠাকুর প্রমুখ গণ-চরিত্রের বৈষ্ণব সাধক। আবার সহজিয়া ধারাকে প্রেমময় করে প্রান্তিকজনের চিত্তকে সিক্ত করেছেন বৈষ্ণব রঘুনাথ গোঁসাই, শ্যামকিশোর গোঁসাই প্রমুখ। ঢেউপাশা গ্রামে ছিল সহজিয়াদের লীলাভূমি। মরমিবাদের সাথে রাধাপ্রেম মাধুর্যমণ্ডিত করে পীর-ফকির সাধুসন্তকে মানবিক পথ-রেখা দেখিয়েছিলেন অন্তর্দর্শনধারী দীন ভবানন্দ, সৈয়দ শাহ নূর, ফকির ইয়াছিন শাহ প্রমুখ ভাবুক কবিরা। তাঁরা প্রেমবাদী দর্শনের গভীরে গিয়ে মূলাধারকে খুঁজে-খুঁজে ফানাফিল্লা হয়েছেন। ফলে ভাব-রসিকদের একত্রে পথ চলতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এই অনুপম পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় জন-সমাজ কট্টর বা মৌলবাদের হাতে এখনো চলে যায়নি। বিভিন্ন ধর্মীয় পর্বে ও উৎসব-পার্বণের উৎসমুখে ‘মানুষে’র গন্ধ এখনো পাওয়া পাওয়া।

ভৌগলিক স্থান হিসেবে মৌলভীবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আদি-মধ্যযুগে বৃহৎবঙ্গের পূর্বপ্রান্তের এই জমিনে পাঠান ও মোগলদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। জনগণ দীর্ঘকাল মোগল শাসনে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। জনতা ১৭৬৫ সাল থেকে কোম্পানির শাসনকে মেনে নিতে পারেনি। তখন ছোটবড় জমিদার ছিলেন ভিতরে-ভিতরে কোম্পানি সরকারের বিরুদ্ধে। সিপাহি বিদ্রোহের সময় চট্টগ্রাম থেকে আগত সৈন্যরা মণিপুরের দিকে যাওয়ার লক্ষ্যে মৌলভীবাজারের মধ্য দিয়ে লাতু অ লে প্রবেশ করেছিল। তখনকার দুই একজন জমিদার গোপনে বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছিলেন [যেমন পৃত্থিমপাশার জমিদার]। পরের যুগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাপ ও অগ্নি ফুলকির এখানেও ওড়েছিল।

১৯০৫ থেকে স্বদেশী আন্দোলনের পর মৌলভীবাজারে সশস্ত্র বিপ্লববাদী আন্দোলনের মন্ত্রগুপ্তির প্রভাব বেড়ে যায়। স্মরণীয় যে সর্বভারতীয় অনুশীলন দলের বিপ্লবী নেতা নগেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে গিরিজা দত্তের বাড়ি ছিল মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভোজপুর গ্রামে। ১৯১২ সালে ব্রিটিশ গুর্খা সৈন্যদের সাথে লড়াই করে পরাধীন মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন মহেন্দ্রচন্দ্র দেব [জগৎসী, মৌলভীবাজার সদর]। তাছাড়া বিপ্লবী লীলা নাগের প্রভাবে গড়ে ওঠেছিল বিপ্লবী শ্রীসংঘের শক্তিশালী শাখা [রাজনগর উপজেলা]। ১৯২১ সালে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের গরম হাওয়া বয়ে যায় জেলার ওপর দিয়ে- মানুষজন ব্যাপাকহারে স্বদেশী হয়ে ওঠেছিল। অনেক সংগ্রামীর ঠাঁই হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের কারাগারে।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় যারা মাতৃভূমি স্বাধীন করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে স্কুল-কলেজ- এমনকি গৃহ ত্যাগ করেছিলেন- সেই সর্বত্যাগী নেতা-কর্মীদের আলাদা বসবাসের জন্য কংগ্রেসীদের নেতৃত্বে ১৯২৫ সালে কুলাউড়ার রঙ্গিরকূল পাহাড়ে গড়ে ওঠে ‘বিদ্যাশ্রম’ নামে আবাসস্থল। তাঁরা সেখানে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকতেন। তখন রাজনৈতিক কারণে ঘরছাড়া, অসংসারী ও উচ্চশিক্ষিত তরুণরা গ্রামে-গ্রামে গিয়ে জন-মানুষকে শিক্ষাদান, আধুিনক চাষাবাদ, চরকায় সুতা কাটা, সেনিটেশন কৌশল শেখাতেন। আর কাজের মধ্য ব্রিটিশবিরোধী মনোবৃত্তি জাগ্রত করতেন। ফলে এই অ লে রাজনৈতিক সচেতনতা আগ থেকে পরিলক্ষিত হয়।

ত্রিশের দশকে কমিউনিস্টপার্টির প্রতিবাদী ও গঠনমূলক কার্যক্রম চোখে পড়ে। কমলগঞ্জে মণিপুরি কৃষক বিদ্রোহ ইতিহাস খ্যাত [১৯৩০]। যে কারণে পাকিস্তান আমলে সহসাই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার গতি এই অ লে দ্রæত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৯ সালে বড়লেখা দাসেরবাজারে নানকার-কৃষকরা পাক-ফৌজের হাতে প্রাণ দিয়ে [৬ জন] জমিদারীর বিলুপ্ত আইন ও কৃষকদের সত্ত্বা প্রতিষ্ঠার দ্বার মুক্ত করেছিল।   এটাই মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।

চলবে...

 দীপংকর মোহান্ত, লেখক ও গবেষক।

  • আইনিউজে এই লেখাটি ধারাবাহিকভাবে চলবে। এতে উঠে আসবে মৌলভীবাজারের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিসহ আড়ালে পড়ে যাওয়া বিভিন্ন তথ্য। প্রতি শুক্রবার এই লেখাটির এক পর্ব আইনিউজে প্রকাশ করা হবে। কালের প্রবাহে চাপা পড়ে যাওয়া এই স্বয়ংসম্পূর্ণ তথ্য জানতে থাকুন আইনিউজের সঙ্গেই।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়