ঢাকা, সোমবার ২২ জুন ২০২৬,   আষাঢ় ৮ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:৩৭, ২২ জুন ২০২৬
আপডেট: ১৯:৫৬, ২২ জুন ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে পর্দা নামলো তিন দিনব্যাপী হারমোনি ফেস্টিভ্যালের

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, জাতিগত বৈচিত্র্য এবং সম্প্রীতির অনন্য বন্ধনকে নতুন করে তুলে ধরল তিন দিনব্যাপী হারমোনি ফেস্টিভ্যাল (সিজন-২)। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আয়োজনে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত এই উৎসবের পর্দা নেমেছে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

রোববার (২১ জুন) রাত পৌনে ১০ টার দিকে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হওয়া জমকালো আয়োজনে ভরপুর ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২’ এর সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। মূলত উৎসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা করা এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো।

সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার সমন্বয়ে আয়োজন করা হয় এই উৎসব। নৃ-গোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় নিজস্ব সংস্কৃতি, নৃত্য, গান, লোকজ পরিবেশনা, হস্তশিল্প প্রদর্শনী, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নানা আয়োজনে উৎসব প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। অংশগ্রহণকারী নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে খাসিয়া, গারো, মনিপুরি, ত্রিপুরা, সবর, খাড়িয়া, রিকিয়াসন, বাড়াইক, কন্দ, রাজবল্লব, ভূইয়া, সাঁওতাল, ওরাও, লোহার, মুন্ডা, কুর্মী, ভূমিজ, বুনারাজি, গঞ্জু, মৃধা, তেলেগু, গৌড়, রবিদাস, পাইনকা, কৈরী/ভোজপুরী, কালিন্দি ও কড়া সম্প্রদায়।

আয়োজকদের মতে, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহাবস্থান ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কার্যকর উদ্যোগ। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পরিচিত করার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরাই ছিল উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য।

পর্যটন সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল টেকসই সাংস্কৃতিক পর্যটনের প্রসার। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটন বিকাশের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিল্পীরা তাদের নিজস্ব লোকজ গান, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনী (স্টল): উৎসবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত স্টল দেওয়া হয়। যেখানে তাদের হাতে বোনা পোশাক (যেমন: ত্রিপুরার কোমর তাঁতের কাপড়), গহনা, ঐতিহ্যবাহী শিকারের সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক স্মারক প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পিঠাপুলির স্বাদ নেওয়ার সুযোগ ছিল সেখানে।

উৎসবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের তৈরি হস্তশিল্প, পোশাক ও ঐতিহ্যবাহী পণ্য দর্শনার্থীদের আগ্রহ কাড়ে। এর মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির বার্তাও উঠে আসে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে ‘কমিউনিটি-বেসড ট্যুরিজম’ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটন বিকাশের লক্ষ্যও উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল। এই ধারণার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন কার্যক্রমের অংশীদার করে তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে পর্যটন সম্পদ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে পর্যটনের সুফল সরাসরি স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত হওয়া ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল’-এর মতো বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক উৎসব ও মেলবন্ধন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন নামে উদযাপন করা হয়। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় 'হারমনি ডে' বা 'হারমনি উইক', ভারতে নাগাল্যান্ডের 'হর্নবিল ফেস্টিভ্যাল', এবং ক্রোয়েশিয়ার 'হারমনি ফেস্টিভ্যাল' অন্যতম। এছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বৈচিত্র্যময় লোকসংস্কৃতি নিয়ে এমন অনেক কমিউনিটি উৎসব উদযাপিত হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আমরা খুব শিগগিরই ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-৩’ দেখতে যাচ্ছি। সিলেট অঞ্চলের অসংখ্য বৈচিত্র্যকে আমরা এক মঞ্চে তুলে ধরতে পেরেছি, যা আমাদের জন্য আনন্দের ও গর্বের বিষয়। হারমোনি ফেস্টিভ্যালে আমরা দেখেছি, শ্রীমঙ্গলের সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ এক ছাদের নিচে একসঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করেছেন। আমরা আপনাদের আশ্বস্ত করছি, আগামীতে আরও বড় পরিসরে, আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই উৎসবের আয়োজন করা হবে।”

সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সালেহা বিনতে সিরাজ বলেন, “গত তিন দিন ধরে আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, সৌহার্দ্য ও ধৈর্য আমাদের এই আয়োজনকে সফল ও অর্থবহ করেছে। হারমোনি ফেস্টিভ্যালের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্য এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা। গত বছরের তুলনায় এ বছর উৎসবের সাজসজ্জা ও পরিবেশনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ভবিষ্যতে আমরা আরও নান্দনিক, বর্ণিল ও ঐতিহ্যনির্ভর আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পোশাক, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব।”

তিনি আরও বলেন, “হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২ মূলত ডিসেম্বর মাসে আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে সেটি বর্ষাকালে অনুষ্ঠিত করতে হয়েছে। বর্ষাকালে আয়োজন করতে গিয়ে আমাদের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আগামী বছর, অর্থাৎ ২০২৭ সালের জানুয়ারির দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-৩’ আরও বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে। শীতকালকে কেন্দ্র করেই আমরা পরবর্তী আসরের আয়োজন করতে যাচ্ছি।”

তিন দিনের এই আয়োজন শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল সংস্কৃতির সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। সংশ্লিষ্টদের আশা, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল ভবিষ্যতেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে আরও শক্তভাবে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পর্যটন ও অর্থনীতিতে ভূমিকা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা-বাগান মাঠে এই উৎসবটি বার্ষিক ভিত্তিতে আয়োজন করার পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আগে থেকেই ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারবেন, যা এই অঞ্চলের ‘কমিউনিটি-বেসড ট্যুরিজম’ বা স্থানীয় পর্যটন শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।

Green Tea
বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ