ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২,   আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

জসীম উদ্দীন মাসুদ

প্রকাশিত: ২২:৩৪, ২৭ এপ্রিল ২০২২
আপডেট: ১২:৩৪, ২৯ এপ্রিল ২০২২

জাতীয় আইনগত সহায়তা: সামাজিক নিরাপত্তার আলোকবর্তিকা

আইনের চোখে সবাই সমান। প্রতীকী ছবি

আইনের চোখে সবাই সমান। প্রতীকী ছবি

‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’-এ কথা যেমন সত্যি আবার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ যে কত অসহায় হয়ে পড়ে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো কোন মানুষের মামলায় জড়িয়ে পড়া। মামলার প্রতিযোগিতায় যেখানে অনেক ধনকুবের নিঃস্ব হয়ে যান সেখানে দরিদ্র মানুষের অবস্থা তো আরো অসহনীয়। অনেক দরিদ্র আবার শোষিত ও নির্যাতিত হওয়ার পরও অর্থের অভাবে অন্যায়কে মেনে নিয়ে মামলা থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হন। দরিদ্র মানুষের চাহিদার এ জায়গাটি অভাবনীয়ভাবে পূরণ করছে জাতীয় আইনগত সহায়তা।         

ফিরে দেখা

৫০০ কোটি বছর বয়সী এ পৃথিবীর জনসংখ্যা বর্তমানে ৭৮০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আজ থেকে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে প্রথম যখন মনুষ্য আকৃতির প্রাণীর আবির্ভাব ঘটলো মূলত তখন থেকেই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে অন্যান্য হাজারো প্রজাতির জীবের সাথে আদি মানবেরা অগণিত প্রজন্ম ধরে নিজেদের চাহিদা পূরণ ও আবাস ভাগাভাগি করে নেয়ার মানসে নিজেদের মধ্যে নানান দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লো। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই আবার আপোষ ও সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলো আদি বিচার ব্যবস্থার, যা কালক্রমে নতুন নতুন সভ্যতা ও রাষ্ট্রের গোড়া পত্তনের ধারাবাহিকতায় রূপ নিলো আধুনিক বিচার ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থায় গোড়া থেকেই ধণিক সম্প্রদায় অর্থ ও প্রতিপত্তির কারণে নিজেদের অস্তিত্বকে জোরালোভাবে টিকিয়ে রাখতে সম্ভব হয়েছে। পক্ষান্তরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী মামলায় টিকে থাকতে না পেরে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিয়েছে।

‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’-এ কথা যেমন সত্যি আবার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ যে কত অসহায় হয়ে পড়ে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো কোন মানুষের মামলায় জড়িয়ে পড়া। মামলার প্রতিযোগিতায় যেখানে অনেক ধনকুবের নিঃস্ব হয়ে যান সেখানে দরিদ্র মানুষের অবস্থা তো আরো অসহনীয়। অনেক দরিদ্র আবার শোষিত ও নির্যাতিত হওয়ার পরও অর্থের অভাবে অন্যায়কে মেনে নিয়ে মামলা থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হন। দরিদ্র মানুষের চাহিদার এ জায়গাটি অভাবনীয়ভাবে পূরণ করছে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা। সরকার অক্ষম, অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে একটি নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে এনে ইতোমধ্যে ২৮টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৪২টি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আইনগত সহায়তা প্রদান এর অন্তর্ভূক্ত না হলেও অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্যে এখন সামাজিক নিরাপত্তার এক আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা

প্রকৃত অর্থে ২০০০ সালের পূর্বে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরকারীভাবে আইনগত সহায়তা প্রদানের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা ছিল না। অবশ্য কিছু কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান যেমন-আইন ও সালিশ কেন্দ্র, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক, ব্লাস্ট, নারী প্রগতি, মহিলা পরিষদ, মানবাধিকার সংস্থা ইত্যাদি অসহায় ও অসচ্ছল মানুষকে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছিল। আইনগত সহায়তা দিতে বাংলাদেশ সরকারকে ২০০০ সাল থেকে সহযোগিতা করছে কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সী (সিডা)।

আইনগত সহায়তার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

বিশ্বের অনেক দেশ যেমন- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশে সরকারি খরচে আইনি সহায়তার পদ্ধতি চালু রয়েছে। রাষ্ট্রের শতভাগ মানুষ যাতে আদালতের কাছে প্রতিকার চাইতে পারে, সেজন্যে এই ব্যবস্থা রাখা হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদে (আইসিসিপিআর) বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি আইনের বা আদালতের আশ্রয় নিতে চান অথচ তার আর্থিক সামর্থ নেই, তবে ওই ব্যক্তিকে আইনগত সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকার বাধ্য থাকবে। ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে অধিকার সম্পর্কিত যে ২৫টি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে তার ৬টি অনুচ্ছেদে সরাসরি বিচারের অধিকারের সাথে সম্পর্কিত, যার মূল বক্তব্য হচ্ছে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশে আইনগত সহায়তাপ্রাপ্তির সাংবিধানিক ভিত্তি

আইনগত সহায়তাপ্রাপ্তির অধিকার মূলত একটি সাংবিধানিক অধিকার। স্বাধীনতার মাত্র ৯ মাসের মাথায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল সেখানে রয়েছে ন্যায়বিচারের স্পষ্ট নির্দেশনা। সংবিধানের ১৯.১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে’। অনুচ্ছেদ ২৭- এ বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী’। সংবিধানের ৩৫.৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রত্যেক নাগরিকের দ্রুত বিচার লাভের অধিকার থাকবে’। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সংবিধানে এসব বিধান অন্তর্ভুক্তি করা হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী তিন দশকে দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারে আইনগত সহায়তা প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো চালু হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবার সরকার গঠন করেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণে বিচার পেতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণকে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা প্রদান করার লক্ষ্যে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ প্রণয়ন করে দেন এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে সরকারি আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

বাংলাদেশে আইনি সহায়তা শুরুর কথা

সমগ্র বাংলাদেশে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বর্তমান সরকার ইতিপূর্বে ক্ষমতায় থাকাকালে আজ থেকে ২১ বছর আগে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানা আর্থ-সামাজিক কারণে অসমর্থদের আইনি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন ২০০০’ পাস করা হয় এবং পরবর্তীতে একটি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা ২৮ এপ্রিল, ২০০০ থেকে এ আইন কার্যকর হবে বলে ঘোষণা করা হয় এবং আইনের ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’  নামের একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়।  এর আগে ১৯৯৪ ও ১৯৯৭ সালে রেজুশেনের মাধ্যমে দুইবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও আইনগত সহায়তাকে প্রাতিষ্ঠানিককরণ করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এই সংস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই করা যায়নি। ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সংস্থাটিকে বছরে ৫০ লাখ টাকা করে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হতো। অথচ তার মাত্র তিন শতাংশও খরচ হতো না। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে প্রথম একে একটি সক্ষম ও কার্যকরি সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

আই নিউজে আরো পড়ুন : ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ বাংলাদেশের বদলে যাওয়া সক্ষমতা

আইনগত সহায়তা’র অর্থ

আইনগত সহায়তা’র অর্থ আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায় সম্বলহীন এবং বিভিন্ন কারণে বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অসমর্থ বিচার প্রার্থীকে-

১. কোন আদালতে দায়ের যোগ্য মামলায় আইনি পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান;

২. দায়ের হয়েছে বা বিচার চলছে এমন মামলায় আইনি পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান;

৩. আইনজীবীর ফিস বা মামলার প্রাসঙ্গিক খরচ প্রদান এবং

৪. নিযুক্ত সালিশকারীকে সম্মানী প্রদান।

বাংলাদেশে আইনি সহায়তার বর্তমান অবস্থা

২০০০ সালের পর বাংলাদেশের ৩ লক্ষাধিক অসহায় ও দরিদ্র মানুষ সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় আইনি সহায়তা পেয়েছেন। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই কার্যক্রমের আওতায় ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার মাধ্যমে সরকারি খরচে অস্বচ্ছল বিচার প্রার্থীদের ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৮৭টি মামলায় আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে আইনি সহায়তার মাধ্যমে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৮টি মামলা নিস্পত্তি হয়েছে।

বিকল্প বিরোধ নিস্পত্তি সেবার (এডিআর) মাধ্যমে লিগ্যাল এইডে মামলা নিস্পত্তি হয়েছে ৫০ হাজার ৩৫৩টি। এ সব মামলায় সুবিধাভোগী মোট ৭ লাখ ২ হাজার ২৫ জন। সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ২৩ হাজার ৮০৭ জন, দেশের ৬৪ টি জেলার লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ৫ লাখ ২২ হাজার ৪৪৪ জন, ঢাকা ও চট্রগ্রাম শ্রমিক আইনি সহায়তা সেলের মাধ্যমে ২৪ হাজার ১৩৪ জন এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার নির্ধারিত হটলাইন কলসেন্টার ১৬৪৩০ নম্বরে (টোল ফ্রি) ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৪০ জন বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পেয়েছেন। এছাড়াও ২০১২ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯১ হাজার ৬১৩ জন কারাবন্দীকে দেশের ৬৪ জেলার লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কাঠামো

সংস্থা পরিচালনার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে ১৯ সদস্যের একটি জাতীয় পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। জেলা জজের সমমানের পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে এই সংস্থার পরিচালকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। সংস্থার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে জেলা কমিটির কার্যাবলী তদারক ও নিয়ন্ত্রণ এবং আইনগত সহায়তা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার এবং আইনগত সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতা নিরূপন। সংস্থার অধীনে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে সারা দেশে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জেলা ও দায়রা জজ জেলা কমিটির চেয়ারম্যান ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারকে সদস্য-সচিব করে প্রতিটি জেলায় একটি করে জেলা কমিটি গঠিত হয়। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১১ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সদস্য-সচিব করে উপজেলা কমিটি এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন সচিবকে সদস্য-সচিব করে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার একটি ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়।

জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস

জনগণকে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন ২০০০’ কার্যকরের তারিখ অর্থাৎ ২৮ এপ্রিলকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জনগনকে সচেতন করার পাশাপাশি এর আরো প্রধান তিনটি উদ্দেশ্য হলো-দরিদ্র ও অসহায় জনগণের ন্যায় বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, সরকারি আইনসেবা কার্যক্রমকে আরো কার্যকর, বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা এবং সরকারি-বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আইন সহায়তা কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকর করা। ২০১৩ সাল থেকে আইন সেবার মূলমন্ত্র সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে যথাযথ মর্যাদায় বাংলাদেশের সকল জেলায় উৎসবমূখর পরিবেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ২০২২

‘বিনা খরচে নিন আইনি সহায়তা, শেখ হাসিনার সরকার দিচ্ছে এই নিরাপত্তা’- বাংলাদেশ সরকার এই শ্লোগানটিকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ২০২২’ এর প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। র‌্যালী, দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনাসভা, পোস্টারিং, মাইকিং কার্যক্রম, স্বেচ্ছা রক্তদান কর্মসূচি, লিগ্যাল এইড মেলা, ক্লায়েন্ট-আইনজীবী যৌথ সভা, সেরা প্যানেল আইনজীবী পুরস্কার, ম্যাগাজিন, সুভ্যেনির বা দেয়ালিকা প্রকাশ, শর্ট ফিল্ম, নাটিকা বা ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, কুইজ প্রতিযোগিতা, ফ্রি লিগ্যাল এইড ক্লিনিক ইত্যাদি কর্মসূচির মাধ্যমে দেশব্যাপী এবার এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। 

আই নিউজে আরো পড়ুন : আত্মহত্যা নয়, লড়াই করুন, পাশে আছি

আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০- কে শক্তিশালীকরণ

আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ প্রণয়নের পর  থেকে একে যুগোপযোগী, শক্তিশালী ও দরিদ্রবান্ধব করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নীতিমালা, বিধিমালা ও প্রবিধানমালা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১১ সালে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন, দায়িত্ব, কার্যাবলী ইত্যাদি) প্রবিধানমালা, ২০১১ প্রণয়ন করা হয়। ২০১৩ সালে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০১৩ (সুপ্রীম কোর্ট কমিটি গঠন ও কার্যাবলী প্রণয়ন করা হয়। ২০১৪ সালে প্রণীত হয় আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা। ২০১৫ সালে আইনগত সহায়তা প্রদান (আইনী পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বিধিমালা, ২০১৫ ও আইনগত সহায়তা প্রদান প্রবিধানমালা, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। ২০১৬ সালে প্রণীত হয় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (চৌকি আদালত বিশেষ কমিটি গঠন, দায়িত্ব, কার্যাবলী ইত্যাদি) প্রবিধানমালা, ২০১৬ ও জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (শ্রম আদালত বিশেষ কমিটি গঠন, দায়িত্ব, কার্যাবলী ইত্যাদি) প্রবিধানমালা, ২০১৬।

যেসব মামলায় সরকারি আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়

ফৌজদারি মামলা

স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে স্বামীর বিয়ে, শারীরিক নির্যাতন, যৌতুক দাবী বা যৌতুকের জন্য নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, পাচার, অপহরণ, ধর্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আটক বা গ্রেফতার।

দেওয়ানি মামলা

সন্তানের অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ও দেনমোহর আদায়, বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধার, দলিল বাতিল, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, সম্পত্তির বন্টন বা বাটোয়ারা, ঘোষণামূলক মামলা এবং চুক্তি সংক্রান্ত মামলা।

যেসব বিষয়ে আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়

১. বিনামূল্যে ওকালতনামা সরবরাহ।

২. মামলা পরিচালনার জন্যে আইনজীবী নিয়োগ।

৩. আইনজীবীর ফি পরিশোধ।

৪. মধ্যস্থতাকারী বা সালিশকারীর সম্মানী পরিশোধ।

৫. বিনামূল্যে আদেশের রায় কিংবা অনুলিপি সরবরাহ।

৬. ডিএনএ টেস্টের যাবতীয় ব্যয় পরিশোধ।

৭. ফৌজদারি মামলায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ব্যয় পরিশোধ।

৮. মামলার সাথে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় পরিশোধ।

আইনি পরামর্শ

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার অধীন প্রত্যেকটা জেলায় লিগ্যাল এইড অফিস আছে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের দায়িত্বে আছেন একজন লিগ্যাল এইড অফিসার, যিনি সিনিয়র সহকারি জজ পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। এছাড়া সরকারি খরচে দরিদ্র বিচার প্রার্থীদের মামলা পরিচালনার জন্য প্রত্যেকটি জেলায় আইনজীবীগণের একটি প্যানেল রয়েছে। লিগ্যাল এইড অফিসার এবং প্যানেলভুক্ত আইনজীবীগণ প্রত্যেকটি জেলায় লিগ্যাল এইড অফিস ব্যবস্থাপনা ও সরকারি অর্থায়নে মামলা পরিচালনার পাশাপাশি বিনা খরচে দরিদ্র বিচার প্রার্থীগণকে আইনি পরামর্শ প্রদান করে থাকেন।

সরকারি আইন সহায়তা তহবিল শতভাগ ব্যয়

বর্তমান সরকারের বিগত ১৩ বছরে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমের ব্যাপক অগ্রগতির ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের ব্যয় অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালের পূর্বে সরকারি আইন সহায়তা তহবিলের ব্যয় ১০ শতাংশেরও কম ছিল, যা ২০০৯ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ শতাংশ, ২০১০ সালে ৮৬ শতাংশ, ২০১১ সালে ৯৮ শতাংশ, ২০১২ সালে শতভাগ এবং সর্বশেষ ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সাল থেকে এ তহবিলের ব্যয় শতভাগে উন্নীত হয়েছে, বর্তমানে ও আগের ধারা অব্যাহত রয়েছে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীগণকে সরকারি আইন সহায়তার আওতায় মামলা পরিচালনায় আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে আইনগত সহায়তা প্রবিধানমালা, ২০১৫ জারী করার মাধ্যমে আইনজীবীগণের ফি এর হার বহুলাংশে বর্ধিত করা হয়েছে। আইনজীবীগণের ফি এর হার বৃদ্ধির ফলে প্যানেল আইনজীবীগণের মধ্যে ব্যাপক কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।

শ্রমিক আইন সহায়তা সেল চালু

জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস, ২০১৩ এর অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের আইনগত সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে ঢাকার শ্রম ভবনে শ্রমিক আইন সহায়তা সেল চালু করা হয়। এই সেলের মাধ্যমে শ্রমিকদেরকে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে আইনি সেবা প্রদান করা হয়।

কোথা থেকে আইনি সেবা পাওয়া যায়

আইনি সেবা প্রদান অধিকতর বিস্তৃত ও সহজ করার লক্ষ্যে সরকার ২০১৬ সালে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে টোল ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইন কল সেন্টার চালু করেছে। অফিস চলাকালীন এই কল সেন্টারের ১৬৪৩০ নম্বরে যে কোনো মোবাইল বা টেলিফোন থেকে ফোন করে আইনি পরামর্শ, আইনগত তথ্য, লিগ্যাল কাউন্সিলিং, মামলা করার প্রাথমিক তথ্য, সরকারি আইসি সেবা সম্পর্কিত যে কোনো পরামর্শ, সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে কোনো অভিযোগ কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ সম্পর্কিত সেবা পাওয়া যায়। এর জন্য কোনো কলচার্জ কাটা হয় না।

লিগ্যাল এইড অফিস থেকে

জেলা পর্যায়ের মামলা পরিচালনায় আইনগত সহায়তা লাভের জন্য ৬৪টি জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থিত জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির কাছে আবেদন করতে হয়। সুপ্রিমকোর্টে সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের’ মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির কাছে আবেদন করতে হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য সেখানকার শ্রমিক আইন সহায়তা সেলের মাধ্যমে শ্রম আদালত বিশেষ কমিটির কাছে আবেদন করতে হয়। চৌকি আদালতে সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট চৌকি আদালত বিশেষ কমিটির কাছে আবেদন করতে হয়।

বিডি লিগ্যাল এইড অ্যাপের সহায়তায়

অনলাইনে আইনি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ২০১৮ সালে বিডি লিগ্যাল এইড অ্যাপ চালু করেছে। এছাড়া director-nlaso.gov.bd ই-মেইল ঠিকানায় এবং bdnlaso ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগ করেও বিনা মূল্যে সরকারি আইনি সেবা নেওয়া যেতে পারে। বিদেশ থেকে +৮৮০৯১২৩১৬৪৩০ নম্বরে ফোন করে বিনা মূল্যে সরকারি আইনি সেবা নেওয়া যাবে।

আইনগত সহায়তা পেতে সুযোগ পাবে যারা

আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা ২০১৪ এর বিধি-২ এর আওতায় যে সব ব্যক্তিগণকে আইনি সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে সেটা দেখলেই বোঝা যায় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্যে এই সংস্থা আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। যারা বিনামূল্যে এই আইনি সহায়তা পাবে:

(১) অসচ্ছল বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তি যাদের বার্ষিক গড় আয় সুপ্রীম কোর্টে আইনগত সহায়তার ক্ষেত্রে ১৫০০০০/-টাকা এবং অন্যান্য আদালতের ক্ষেত্রে ১০০০০০/- টাকার বেশি নয়।

(২)  কর্মক্ষম নন, আংশিক কর্মক্ষম বা কর্মহীন কোন ব্যক্তি।

(৩) বার্ষিক ১,৫০,০০০/- টাকার ঊর্দ্ধে আয় করতে অক্ষম এমন মুক্তিযোদ্ধা।

(৪) কোন শ্রমিক যাহার বার্ষিক গড় আয় ১০০০০০/- টাকার বেশি নয়।

(৫) কোন শিশু।

(৬) মানব পাচারের শিকার কোন ব্যক্তি।

(৭) শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু।

(৮) নিরাশ্রয় ব্যক্তি বা ভবঘুরে।

(৯) পারিবারিক সহিংসতার শিকার বা সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন এইরূপ কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। 

(১০)  বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন এমন কোন ব্যক্তি।

(১১)  ভিজিডি কার্ডধারী দুঃস্থ মাতা।

(১২)  দুর্বৃত্ত দ্বারা এসিড দগ্ধ নারী বা শিশু।

(১৩)  আদর্শ গ্রামে গৃহ বা ভূমি বরাদ্দ প্রাপ্ত ব্যক্তি।

(১৪)  অসচ্ছল বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা এবং দুঃস্থ মহিলা।

(১৫)  প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।

(১৬) আর্থিক অসচ্ছলতার দরুণ আদালতে অধিকার প্রতিষ্ঠা বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অসমর্থ ব্যক্তি।

(১৭) বিনা বিচারে আটক এমন ব্যক্তি যিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে আর্থিকভাবে অসচ্ছল।

(১৮) আদালত কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে বিবেচিত ব্যক্তি।

(১৯) জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে সুপারিশকৃত বা বিবেচিত ব্যাক্তি।

আইনগত সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়নে আছে চ্যালেঞ্জ

সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যাযবিচার প্রতিষ্ঠায় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তবায়নে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সুপারিশের আলোকে নিম্নে েএর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

১. প্রকৃতপক্ষে এই কার্যক্রমের সাফল্য নির্ভর করছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও জনমত সৃষ্টির উপর। ব্যাপক প্রচার না থাকায় আইনি সহায়তা চেয়ে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির কাছে আবেদনের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। অন্যান্য প্রচারযন্ত্রের পাশাপাশি তথ্য অধিদপ্তরকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে মাইকিংসহ পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি বিতরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিলবোর্ড স্থাপনসহ সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন-এ নিয়মিতভাবে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।

২. জেলা কমিটির সভার পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কারণ যে সমস্ত আবেদনকারী আইনগত সহায়তা পাওয়ার জন্যে আবেদন করেন একটি মাসিক সভাতেই তা অনুমোদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে জরুরী প্রয়োজন হলেও একজন বিচার প্রার্থীকে কমপক্ষে ১ মাস অপেক্ষা করতে হয় যেটি দ্রুত ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটায়।

৩. কমিটিতে সুবিধাবঞ্চিতদের পক্ষে কোন প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অনেক সময় দেখা যায় কোন ইউনিয়নে আইনগত সহায়তা চাওয়া ব্যক্তি ঐ ইউনিয়নেরই লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কার্যকলাপেরই ভিকটিম। এ ক্ষেত্রে অসহায় মানুষ সমাধান পাবার চেয়ে উল্টো আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

৪. এখনও যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর সেহেতু লিখে আবেদন করার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের জন্য মৌখিক আবেদনের ব্যবস্থা রাখা উচিত।

৫. আইনজীবী প্যানেলে অন্তর্র্ভূক্ত হতে হলে কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতাকে শিথিল করা প্রয়োজন কারণ অভিজ্ঞ আইনজীবীর চেয়ে নবীন আইনজীবীদের মামলায় ব্যস্ততা কম থাকে। তাছাড়া কোন কোন নবীন আইনজীবী দরিদ্রদের প্রতি কাজ করার আগ্রহ থাকলেও তা এই আইনের আওতায় করা সম্ভব হয় না।

৬. প্যানেল আইনজীবীদের এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের বিদ্যমান আর্থিক সুবিধা আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

৭. শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিকসহ সিভিল সোসাইটির বিভিন্ন সদস্যদেরকে এই কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। মামলা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত এনজিওসমূহকে পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পাবে। জেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে জেলা কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।

৮. এ আইনে আবেদনকারীর আবেদনের ভিত্তিতে নিয়মিত মাসিক সভায় আবেদন গ্রহণ ও আইনজীবী নিয়োগ করা হলেও মামলা ফাইল করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় মামলার দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়। জেলা কমিটি আইনি সহায়তার জন্য প্রাপ্ত আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই ও গ্রহণ এবং আইনজীবী নিয়োগ করে থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে মামলা নিয়মিতভাবে ফলো আপের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

৯. উপজেলা কমিটি ও ইউনিয়ন কমিটিকে আরো সক্রিয় করা প্রয়োজন।

১০. কমিটির মাসিক সভায় আগের মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে রিপোর্ট উপস্থাপন এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে মামলার ফলোআপ করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা প্রয়োজন।

১১. প্যানেল আইনজীবীদের হালনাগাদ তালিকা বোর্ডে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। প্যানেল আইনজীবীদের সাথে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির নিয়মিত সভার ব্যবস্থা করা।

১২. কাগজপত্র-দলিলাদি সংগ্রহ, বিচার প্রার্থীর আদালতে আসা-যাওয়া, স্বাক্ষীর যাতায়াত ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া উচিত।

১৩. ওয়েবসাইটে জেলা ওয়ারী হালনাগাদ বিস্তারিত তথ্য সন্নিবেশ করা প্রয়োজন।

সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এখন শুধু এগিয়ে যাবার পালা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খ্যাতনামা রাজনীতিক ও আইনবিদ Alexander Hamilton আজ থেকে ২০০ বছর আগে বলেছিলেন, ‘‘The first duty of society is justice’’। প্রকৃত অর্থে সমাজ তথা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো মানুষের জন্য ন্যয়বিচার নিশ্চিত করা। একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমাজের দরিদ্র, নিপীড়িত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারসমূহের নিশ্চয়তা বিধান করা। সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে একমাত্র আইন আদালতের মাধ্যমেই মানুষ তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু দারিদ্রতা বা অর্থের অভাবে কেউ যদি তার বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে অথবা আইনের আশ্রয় লাভ করতে না পারে তবে তার অন্য সব মৌলিক অধিকারগুলো ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আইন কখনো মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করে না।

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশকে সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। অনেক সময় দেখা যায় যে, বিনা বিচারে অনেক দরিদ্র মানুষ দিনের পর দিন কারাগারে আটক থাকছেন। তাদের মুক্তির জন্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা হয়ে উঠেছে এক মুক্তির ঠিকানা। তাছাড়া জনগণকে সরকারি খরচে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করাকে সরকারের কোন দান বা বদান্যতা হিসাবে মনে করার অবকাশ নেই। কারণ যে কোন নাগরিকের জন্মগত অধিকার হলো সুবিচার প্রাপ্তি। সেই লক্ষ্যেই নিবেদিত হোক রাষ্ট্র ও সমাজ।

তথ্যসূত্র

১. আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০, রেজিস্টার্ড নং ডি এ-১, বাংলাদেশ গেজেট, ২৬ জানুয়ারি, ২০০০

২. জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার প্রজ্ঞাপন, বাংলাদেশ গেজেট, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

৩. আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা, ২০১৪

৪. আইনগত সহায়তা প্রদান (আইনী পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বিধিমালা, ২০১৫

৫. জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার ওয়েবসাইট: www.nlaso.gov.bd

জসীম উদ্দীন মাসুদ, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা ও সদস্য, জেলা লিগ্যাল এইড কমিটি, মৌলভীবাজার

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়