Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, সোমবার   ০৯ মার্চ ২০২৬,   ফাল্গুন ২৫ ১৪৩২

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:১০, ৯ মার্চ ২০২৬

টেবিল টেনিসের রানী খই খই সাই মারমা

পাহাড় ডিঙিয়ে স্বপ্নের ঠিকানায়

টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই সাই মারমা

টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই সাই মারমা

দুর্গম পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে এসে নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলো ছড়াচ্ছেন টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই সাই মারমা। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে স্বপ্নের সন্ধানে এগিয়ে চলা এই তরুণীর গল্প আজ অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে অনেককেই।

খই খই সাই মারমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে হোস্টেলে। পরিবার ছিল নিম্নবিত্ত; বাবা ক্যহ্লাখই এবং মা মোহ্লাচিং কৃষিকাজ করে সংসার চালান। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষক বাবা মেয়েকে ভর্তি করান বান্দরবানের লামায় অবস্থিত কোয়ান্টাম স্কুলে, যেখানে পড়াশোনা ছিল অবৈতনিক। ২০১৫ সালে সেখানে ভর্তি হওয়ার পর বছরে মাত্র একবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন খই খই। রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার চুশাক পাড়া একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা; বাজার থেকে প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে বাড়িতে পৌঁছাতে হয়।

পড়াশোনায় ভালো খই খই স্কুলে মজার ছলেই টেবিল টেনিস খেলতেন। ৯ ফুট দৈর্ঘ্য, ৫ ফুট প্রস্থ এবং আড়াই ফুট উচ্চতার টেবিলে ছোট্ট খই খইয়ের অসাধারণ দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন কোয়ান্টাম স্কুলের শিক্ষকরা। সেই প্রতিভাই একসময় তাকে বড় মঞ্চের পথে এগিয়ে দেয়। ২০১৯ সালে ঢাকায় একটি ক্যাম্পে অংশ নিয়ে টেবিল টেনিস ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের নজর কাড়েন তিনি।

এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন খই খই মারমা। গত নভেম্বরে সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে জাবেদ আহমেদের সঙ্গে জুটি বেঁধে মিশ্র দ্বৈত বিভাগে রৌপ্যপদক জিতে ইতিহাস গড়েন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে টেবিল টেনিসে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সাফল্য। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না এই পাহাড়ি কন্যা; আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বড় অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

বর্তমানে খই খই মারমা বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করার কারণে পড়ার চাপও কম নয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া এই টেবিল টেনিস তারকা খেলাধুলা ও পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলেন, “আমার যেহেতু পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক বেশি ছিল, খেলাধুলার দিকে প্রথমে তেমন মনোযোগ ছিল না। কিন্তু এখন খেলাধুলা করছি, তাই পড়াশোনা আর খেলা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া অনেক কষ্টের। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ায় পড়ার চাপ বেশি, এর মধ্যেই আবার অনেক প্রতিযোগিতা থাকে।”

এখন টেবিল টেনিসই খই খই মারমার আপন ভুবন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, “আমি যদি খেলায় ভালো করতে পারি, তাহলে এটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাই। ২০২৮ সালের অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করার চেষ্টা করব। পাশাপাশি পড়াশোনায় মেডিকেল বা ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিরও চেষ্টা থাকবে।”

নারী হওয়ায় খেলাধুলার পথে তার যাত্রা সহজ ছিল না। সমাজের নানা বাধা ও কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে কখনও সরে যাননি তিনি। খই খই বলেন, “হোস্টেলে বড় হয়েছি। খেলাধুলা করার কারণে পাড়ার অনেক মানুষ বলত খেলা ছেড়ে পড়াশোনায় মন দিতে। আবার কেউ কেউ বলত টেবিল টেনিসে ভবিষ্যৎ নেই, ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে পারতে। কিন্তু আমি যেহেতু এই খেলায় জড়িয়ে গেছি, তাই এটাকে ছাড়ার কথা ভাবিনি।”

সম্প্রতি জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে সিনিয়র ও জুনিয়র—দুই বিভাগেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন খই খই মারমা। জাতীয় পর্যায়ে এখন পর্যন্ত তিনি ১০টি স্বর্ণপদক জিতেছেন। গত কয়েক মাসের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্ট অ্যাওয়ার্ডও।

নিজের এই অর্জনগুলো এখনও তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। খই খই বলেন, “এখন অনেক মানুষ আমাকে চেনে, এটা খুব ভালো লাগে। বিভিন্ন খেলায় আমার অনেক আইডল আছে। সবসময় ভাবতাম তাদের মতো হব। তবে এত দ্রুত এই পর্যায়ে পৌঁছে যাব, সেটা কখনও ভাবিনি। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে পদক পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি, চেষ্টা করলে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।”

দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে টেবিল টেনিসের টেবিলে নিজের স্বপ্নকে এগিয়ে নিচ্ছেন খই খই সাই মারমা—যার গল্প আজ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে নতুন প্রজন্মের জন্য।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়