ঢাকা, সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৯ ১৪৩৩

মুজিবুর রহমান রঞ্জু, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ০০:৩৫, ১৫ অক্টোবর ২০২০
আপডেট: ১৫:৫৮, ১৫ অক্টোবর ২০২০

কাগজের ফুলে প্রতিবন্ধী ঝর্ণা মল্লিকের জীবন

হবিগঞ্জ সদরের পইল এলাকার মেয়ে ঝর্ণা মল্লিক (৩৭)। দেড় বছর বয়সে টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে ডান পা কিছুটা অচল হয়ে যায়। সেই থেকে তিনি প্রতিবন্ধী হয়ে ডান পা টেনে টেনে চলাচল করেন।

পারিবারিক সামাজিকতায় ১৫ বছর আগে তার বিয়ে হয় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার রবিরবাজারে সিএনজি অটোরিক্সা ওয়ার্কশপ মালিক বিজয় মল্লিকের সাথে। শ্বশুর, এক মেয়ে ও স্বামী মিলে ৪ সদস্যের তাদের সংসার।  প্রতিবন্ধী হওয়ায় তার তীব্র ইচ্ছে নিজে কোন কাজ করে সংসারে সাহায্য করা বিশেষ করে স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর। এ ইচ্ছেতে কাকী শ্বাশুড়ি লাভলী মল্লিকের কাছে কাজ শেখেন কাগজের ও কাপড়ের ফুল তৈরীর। সাথে বেতের কুলা, ঢালা ও বিশেষ করে বিয়ের পান চিনির সাজানো কুলা তৈরী।

শুরুতে বাড়িতে একা একা কাগজের ও কাপড়ের নানা ধরণের ফুল, মালা, ঘর সাজানোর ফুল, বিয়ে বাড়ির বিভিন্ন আঙ্গিকের ফুল তৈরী করে জমিয়ে সিএনজি অটো রিক্সায় করে কমলগঞ্জের শমশেরনগর, মৌলভীবাজার সদর ও কুলাউড়ায় বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করতেন।

আর তখনই সমাজের এক শ্রেণীর পরশ্রীকাতর নারী-পুরুষ তাকে নানাভাবে অপবাদ দিতে শুরু করে। এমনকি তার শাশুড়িও সমাজের ঐসব নারী- পুরুষের সাথে সুর মিলিয়ে নানা অশালীন কথা বলতেন ছেলের বউকে। প্রতিবন্ধী ঝর্ণা মল্লিক এসবে কান না দিয়ে একা লড়াই করে তৈরী সামগ্রী পৌছে দিতেন শমশেরনগর, মৌলভীবাজার ও কুলাউড়ার বড় বড় দোকানে।

দিনে দিনে তার তৈরী ফুল, মালা, কুলা ও ঢালার চাহিদা বেড়ে যায়। আস্তে আস্তে তার এলাকার বেকার নারীরাও এ কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তখনই সমাজেরপরশ্রী কাতর মানুষজনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। ঝর্ণা মল্লিককে রোজগারের একটি মডেল হিসেবে মেনে নেয়। তখন শ্বাশুড়িও বুঝতে শুরু করেন ছেলের একার স্বল্প আয়ে সংসার চলছে না। ছেলের বউয়ের আয় সংসারের কাজে লাগছে।

বাজারের চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য হয়ে নিজ এলাকার আগ্রহী ১০০ জন নারীকে তার ফুল,মালা, কুলা ও ঢালার তৈরীর কাজে লাগান। এতে তার সরবরাহও বেড়ে যায় আর নতুন করে ১০০ পরিবার আয়ের মুখ দেখে। 

সাম্প্রতিক করোনা সংক্রমণকালে হাট বাজার, দোকানপাঠ ও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তাকে ছেড়ে দিতে হয় দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নতুন করে নিয়োজিত ১০০ নারী শ্রমিককে। কিন্তু ঝর্ণা মল্লিক থেমে যাননি। তিনি একা একা বাড়িতে কাগজ ও কাপড়ের নানা রং-এর ফুল, মালা, কুলা ও ঢালা বানিয়ে স্বল্প আকারে হলেও শমশেরনগর, মৌলভীবাজার ও কুলাউড়ার দোকানগুলো পৌছে দিচ্ছেন।

সম্প্রতি শমশেরনগরের ৩টি নির্ধারিত দোকানে  ও মালা সরবরাহকালে কথা হয় ঝর্ণা মল্লিকের সাথে। ঝর্ণা মল্লিক বলেন, ঢাকা থেকে পাইকারী হাট থেকে সাদা কাগজ কিনে এনে নিজে রং করে তা শুকাতেন। আর কিনে আনেন এক রং ওয়ালা বিভিন্ন রং-এর কাপড়। তা দিয়ে ১০ ধরণের ফুল, মালা বিয়ে পালঙ্ক সাজানোর সামগ্রী তৈরী করেন।

সেগুলো হচ্ছে কাগজ দিয়ে বর কনের তিনধরণের গলার মালা। কাপড় দিয়ে ৩ ধরণের গলার মালা। পালঙ্ক  ও কুঞ্জ সাজানোর লম্বা লাগ (স্থানীয়ভাবে এটাকে লর বলে) মালা।  কাগজ দিয়ে পাইপ গ্যান্ডা। মাইক পাতা মালা। কাপড়ের কচু পাতা গ্যান্ডা। ২ ধরণের গোলাপ সেট, কক শিটের ফুল। পালঙ্ক সাজানোর পাঁকানি ও রজনী মালা।

কুলা ঢালা তৈরী করেন বিয়েতে ব্যবহারের জন্য।  বেতের একটি কুলার দাম ১৫০ টাকা ও ককশিটের একটি কুলার দাম ১০০ টাকা। দৈনিক ৫ থেকে ৬টি কুলা তৈরী করা যায়। তার তৈরী সামগ্রী বেশী ব্যবহৃত হয় বিয়ের বাড়ির জন্য। ফালগুন মাসে হিন্দু বিয়ে হয় বেশী। তখনই কাজের মৌসুম বলে চাপ পড়ে বেশী। সে সময় পায়ের ব্যথার সাথে কোমরের ব্যথাও বেড়ে যায়। তৈরী সামগ্রী বিভিন্ন স্থানের দোকানে পৌছে দেওয়ার খরচ, উপকরণ খরচ সব খরচ বাদে প্রতি মাসে অবশিষ্ট থাকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এভাবে আয় করে দুই ননদকে বিয়ে দিয়েছেন। আধা পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন একটি দুধের গাভী কিনেছেন।

তার রয়েছে প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব। দুর্দিনে শমশেরনগরের ব্যবসায়ী কামাল সিকদার ও আল- আমিন বিনা সুদে আথির্ক সহায়তা না দিলে তিনি এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারতেন না বলে জানান। এই দুইজন তার পাইকারি ক্রেতা।

কোন ব্যাংক থেকে ঋণ পাননি। তবে ব্র্যাক  ও স্থানীয় শক্তি সঞ্চয় ও ঋণদান সংস্থা থেকে ৪০ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়েছেন। সাপ্তাহিক কিস্তিতে একটি সংস্থার ঋণ প্রায় শোধ করে ফেলেছেন। আরও একটি সংস্থার ঋণ পরিশোধ করছেন।

সরকারি কোন ব্যাংক বা সংস্থা থেকে কম সুধে ঋণ পেলে তার এ ব্যবসা আরও বড় করতে পারতেন বলে জানান ঝর্ণা মল্লিক। 

আইনিউজ/এইচকে 

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়