আবুজার বাবলা
দরিদ্র দেশের রাষ্ট্রপতি: বছরে ৩৫ কোটি টাকা খরচে জনগণের কী লাভ?
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও হোসে ‘পেপে’ মুজিকা। ছবি: সংগৃহীত
একটি পুরোনো ভক্সওয়াগন বিটল। রাজধানীর ঝাঁ-চকচকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ছেড়ে নিজের ছোট খামারবাড়িতে বসবাস। রাষ্ট্রপতির বেতন থেকে অধিকাংশ অর্থ দরিদ্র মানুষের জন্য দিয়ে দেওয়া। বিলাসী রাষ্ট্রীয় জীবনের বদলে সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন—এই ব্যতিক্রমী জীবনযাপনের কারণেই বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছিলেন উরুগুয়ের ৪০তম প্রেসিডেন্ট হোসে ‘পেপে’ মুজিকা। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকা মুজিকা তাঁর সরল জীবনযাপন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ভোগের বাইরে রাখার জন্য ‘বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হিসাবে তিনি তাঁর প্রেসিডেন্টের বেতনের প্রায় ৯০ শতাংশ দাতব্য কাজে দিতেন এবং রাজধানীর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বদলে নিজের ছোট খামারেই থাকতেন। মুজিকা এখন আর বেঁচে নেই। ২০২৫ সালের মে মাসে ৮৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানের জীবনযাপন কেমন হওয়া উচিত—এই প্রশ্নে তাঁর উদাহরণ আজও প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে বাংলাদেশে, যেখানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় পরিচালনায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির পেছনে জনগণের এই অর্থ ব্যয়ের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ আসলে কী পাচ্ছে?
বছরে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা
জাতীয় বাজেটের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এটি জাতীয় বাজেটের তুলনায় খুব বড় অঙ্ক নয়। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় এই বরাদ্দ অত্যন্ত ক্ষুদ্র।
তবে একজন রাষ্ট্রপতির পেছনে রাষ্ট্রের ব্যয় বলতে শুধু রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের বাজেট বোঝায় না। রাষ্ট্রপতির বাসভবন, নিরাপত্তা, যানবাহন, সফর, চিকিৎসা, প্রটোকলসহ কিছু ব্যয় অন্য সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকেও হয়ে থাকে। ফলে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকাকে রাষ্ট্রপতির পেছনে জনগণের মোট ব্যয় বলা যাবে না। বরং এটি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরাসরি বাজেট বরাদ্দ। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী বা সরকারি যানবাহনের সব ব্যয় আলাদা করে ‘রাষ্ট্রপতির ব্যয়’ হিসেবে প্রকাশিত হয় না। ফলে যাচাইযোগ্য সরকারি হিসাব ছাড়া ৩৫ কোটি টাকার বেশি কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে রাষ্ট্রপতির মোট বার্ষিক ব্যয় হিসেবে দাবি করা ঠিক হবে না।
রাষ্ট্রপতির নিজের বেতন কত?
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা আয়করমুক্ত। বছরে বেতন দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু বেতনই রাষ্ট্রপতির আর্থিক সুবিধার পুরো চিত্র নয়। ‘রাষ্ট্রপতির পারিশ্রমিক ও বিশেষাধিকার আইন, ১৯৭৫’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির জন্য বছরে ২ কোটি টাকা discretionary grant নির্ধারিত রয়েছে। একই আইনে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন সরকারিভাবে সজ্জিত ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি-টেলিফোনের ব্যয় বহন, রাষ্ট্রপতি ও পরিবারের জন্য সরকারি পরিবহন, সরকারি সফরের ব্যয় এবং বিদেশ সফরে নির্ধারিত ভাতার বিধান রয়েছে।
এমনকি রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা entertainment-এর ব্যয়ও sumptuary allowance হিসেবে দেওয়ার বিধান রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, এই ব্যয় রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে এবং এই allowance অডিটের আওতাভুক্ত নয়। রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের জন্য দেশ-বিদেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয়ও সরকারের বহনের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মাসিক বেতন দেখে তাঁর রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার প্রকৃত চিত্র বোঝার সুযোগ নেই।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি করেন কী?
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর অধিকাংশ সাংবিধানিক কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করেন। অন্যদিকে সংবিধানের ৫৫(২) স্পষ্ট করে বলছে, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হবে।
রাষ্ট্রপতির কাজ তাই মূলত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন এবং সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতির পদ কি অপ্রয়োজনীয়? না। রাষ্ট্রপ্রধানের একটি সাংবিধানিক পদ সংসদীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয়, সুযোগ-সুবিধা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
মুজিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মুজিকার প্রসঙ্গ এখানে বিলাসবহুল রাষ্ট্রীয় জীবনযাপনের বিপরীতে একটি রাজনৈতিক দর্শনের উদাহরণ হিসেবে আসে। তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েও ব্যক্তিগত জীবনযাপনে রাষ্ট্রীয় চাকচিক্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের পরিবর্তে নিজের খামারে থাকা, পুরোনো গাড়ি ব্যবহার এবং বেতনের বড় অংশ দাতব্য কাজে দেওয়া তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আলাদা করে তুলেছিল।
তবে মুজিকার উদাহরণকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা দরকার। কারণ উরুগুয়ে ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। মুজিকার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ওপর আইনগত মানদণ্ড হিসেবেও চাপিয়ে দেওয়া যায় না। তবু তাঁর জীবন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তি কতটা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করবেন এবং কতটা নিজেকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কাছাকাছি রাখবেন?
জনগণের উপকার কোথায়?
৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বাংলাদেশের মোট বাজেটের তুলনায় বড় নয়—এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০২২ সালে দেশের প্রায় ৬২ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল; আর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দারিদ্র্যের চাপ আবার বেড়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দিয়ে হয়তো দেশের দারিদ্র্য দূর হবে না। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বন্ধ করলেও জাতীয় অর্থনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু ৩৫ কোটি টাকা যদি জনস্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, নিরাপদ পানি, পুষ্টি কিংবা কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবকাঠামোতে ব্যয় করা হয়, তাহলে তার প্রত্যক্ষ সুফল পাওয়া সম্ভব। তাই বিতর্কটি কেবল ‘রাষ্ট্রপতির জন্য ৩৫ কোটি টাকা খরচ করা যাবে কি না’—এমন সরল প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—রাষ্ট্রীয় অর্থের প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ জনকল্যাণমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না।
শেষ কথা
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদ সাংবিধানিকভাবে প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর মর্যাদা, দায়িত্ব ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর অধিকাংশ কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। ফলে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কেন্দ্র। এ কারণে রাষ্ট্রপতির পেছনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রশ্নটি পদটির অস্তিত্ব নিয়ে নয়, বরং ব্যয়ের যৌক্তিকতা, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ নিয়ে হওয়া উচিত।
মুজিকা দেখিয়েছেন—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসেও জীবনযাপনকে অত্যন্ত সাধারণ রাখা সম্ভব। বাংলাদেশে হয়তো মুজিকার মতো খামারে বসবাস করা রাষ্ট্রপতির পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তাঁর দর্শন থেকে অন্তত একটি শিক্ষা নেওয়া যায়—রাষ্ট্রের অর্থ ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতীক নয়; এটি জনগণের অর্থ। সেই জনগণের অর্থে বছরে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ হলে প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—এই ব্যয়ের প্রতিটি টাকার বিনিময়ে রাষ্ট্র ও জনগণ কী পাচ্ছে?
ইএন/এসএ
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ





















