ঢাকা, শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২৬,   শ্রাবণ ৩১ ১৪৩৩

হাসানাত কামাল

প্রকাশিত: ২১:৫৩, ১৫ আগস্ট ২০২৬
আপডেট: ২৩:০৫, ১৫ আগস্ট ২০২৬

মৌলভীবাজারে বঙ্গবন্ধু

জাতীয় চারনেতাসহ ১৯৭২ সালে মৌলভীবাজার সফরকালে ছবিটি তুলেন সাংবাদিক হারুনুর রশীদ।

জাতীয় চারনেতাসহ ১৯৭২ সালে মৌলভীবাজার সফরকালে ছবিটি তুলেন সাংবাদিক হারুনুর রশীদ।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নেতা, তার প্রমাণ মৌলভীবাজার জেলা। এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া চা-শ্রমিকদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। অর্থাৎ যেখানে শোষণ, বঞ্চণা সেখানে ছুটে গেছেন বঙ্গবন্ধু। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে যখন জেলার বিভিন্ন প্রান্তে গিয়েছি খুঁজে পাই জাতির পিতার পদচিহ্ন। গণমানুষের অস্তিত্বে, দেশের প্রতিটি প্রান্তে আছেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিব। 

পর্যটন ও প্রবাসীদের জেলা মৌলভীবাজার। হাওর, পাহাড়-টিলা, সমতল ঘেরা প্রকৃতি কন্যা এ জেলায় রয়েছে চা-বাগানের ছড়াছড়ি।

তৎকালীন মহকুমা মৌলভীবাজারের মাটি ও মানুষের সাথে ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল এক আত্মিক সংযোগ। ঘুরেফিরে বারবার ছুটে এসেছেন এখানকার মানুষের কাছে। আন্দোলন-সংগ্রামে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী চা-শ্রমিকদের প্রতি ছিল তাঁর আলাদা ভালোবাসা। তাদের উন্নয়নে-উত্তরণে নিয়েছেন নানা উদ্যোগ। সুবিধাবঞ্চিত চা-শ্রমিকদের অগ্রযাত্রায় বঙ্গবন্ধু নিরন্তর কাজ করে গেছেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সবুজ ঘাসে পা ফেলেছেন বঙ্গবন্ধু। তার আগে তৎকালীন আনসার ফিল্ড, মৌলভীবাজার ক্লাব ও জনমিলন কেন্দ্রে নানা উপলক্ষে এসেছেন। বক্তব্য রেখেছেন দরাজ কন্ঠে ।

তাছাড়া বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর, শ্রীমঙ্গলসহ প্রতিটি উপজেলায় ছুটে গিয়েছেন মানুষের কথা শুনতে। দেশের মানুষকে শোষণ-বঞ্চনার কথা শুনিয়েছেন। দেখিয়েছেন স্বাধীন দেশের স্বপ্ন।

গবেষকেরা বলছেন- বঙ্গবন্ধু মৌলভীবাজারে প্রথম পা রাখেন ১৯৫৬ সালে। তখন তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রম, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী। শ্রমিকদের সাথে এক বৈঠকে মিলিত হতে রেলযোগে সিলেট যাত্রাপথে শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেন। তখন এ অঞ্চলের চা শ্রমিকেরা তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করেন।

১৯৬৪ সালের ১২ এপ্রিল রেলযোগে বঙ্গবন্ধু কুলাউড়ায় আসেন। কুলাউড়া শহরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জনসভায় যোগ দেন। জনসভা শেষে শহরের উত্তরবাজারে হাজী আসদ উল্লাহর বাড়িতে অবস্থিত আওয়ামী লীগ অফিস পরিদর্শন করেন। সেখানে দলীয় নেতাকর্মীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ কুলাউড়া উপজেলা শাখার তৎকালীন সভাপতি জয়নাল আবেদীনের বাসায় রাত্রিযাপন করেন।

১৯৬৮ সাল। বিশাল ছাত্র সমাবেশে যোগ দিতে মৌলভীবাজারে আসেন বঙ্গবন্ধু। সেইদিন তিনি মহকুমা শহরের শাহ মোস্তফা সড়কে তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট-হাউজে রাত্রিযাপন করেন। বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে তোরণ নির্মাণ করেন তখনকার তরুণ-যুবারা।

সত্তরের নির্বাচনকে ঘিরে একাধিকবার মৌলভীবাজারে এসেছেন বঙ্গবন্ধু। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য সিলেট থেকে বড়লেখা, এরপর কুলাউড়া ও টেংরাবাজার হয়ে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন জনতার নেতা শেখ মুজিব।

বড়লেখা রেলওয়ে স্টেশন মাঠের পশ্চিম-উত্তর কর্নারে ডা. শুক্কুর সাহেবের বাড়ির পূর্ব পার্শ্বে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু।

জুড়ীর জাঙ্গীরাই পুরাতন ভাঙ্গা রেলওয়ে ব্রীজ সংলগ্ন স্থানে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রচারণামূলক জনসভায় বক্তব্য রাখেন।

এরপর কুলাউড়া হয়ে রাজনগরের টেংরাবাজারে জনসভায় যোগ দেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে তৎকালীন ভটেরবাজার, বর্তমান টেংরাবাজারে লোকজন জড়ো হয়ে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করেন। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দিতে প্রচারণামুলক বক্তব্য রাখেন।

এরপর মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বিশাল নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেন বঙ্গবন্ধু। একই সময়ে তিনি কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগরে নির্বাচনী জনসভায়ও যোগ দেন। এবং ৭০ এর নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভা শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে প্রচারণায় যোগ দেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে ঘিরে মৌলভীবাজারের প্রতিটি উপজেলা চষে বেড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধু। কথা বলেছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সাথে।

মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত ভেঙ্গে ফেলা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল।

১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে দলীয় কাজে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে আসেন বঙ্গবন্ধু। শহরের হবিগঞ্জ রোডস্থ বর্তমান হোটেল প্যারাডাইসের সামনে গাড়ী থেকে নেমে উপস্থিত জনতার সামনে বক্তব্য রাখেন। সেখান থেকে মিশন রোডস্থ আওয়ামী লীগ নেতা ডা. আলী সাহেবের বাসায় দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে বৈঠকে যুক্ত হন। ডা. আলী সাহেবের সহধর্মীনীর স্মৃতিতে সেইদিনের কথা ওঠে আসে।

এরপর ফুলছড়া চাবাগানের তৎকালীন ম্যানেজার ও আওয়ামী লীগ নেতা আকবর সাহেবের বাংলোতে যান। সেখানে সময় কাটিয়ে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজে রাত্রিযাপন শেষে পরের দিন সিলেটের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেসময় চা-শিল্পের উন্নয়নে ১৯৫৭ সালের ৪ জুন চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। তখন তিনি চা-শ্রমিক, চা-শিল্প ও মালিক-ব্যবস্থাপক ত্রিমুখী উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু চা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন এই চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করতেন। যা আজও শ্রীমঙ্গল টি রিসোর্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠি চা শ্রমিকের আস্থা ও প্রিয়ভাজন হয়েছিলেন তিনি। চা শিল্পের উন্নয়নে ঘুরেছেন বিভিন্ন বাগানে। শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া, রাজঘাট ও নন্দরাণী চা-বাগানে অবস্থান করেছেন। নন্দরাণী চা-বাগানের ডাক বাংলোতে রাত্রিযাপনও করেছেন বঙ্গবন্ধু।

চা শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে দেখা করতেন বঙ্গবন্ধুর সাথে। তিনিও মৌলভীবাজারে এলে খোঁজ নিতেন চা শ্রমিকদের।

মৌলভীবাজারের মাটি ও মানুষের সাথে বঙ্গবন্ধুর ছিলো হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। তাইতো বারবার ছুটে এসেছেন এ মাটির টানে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর এ জনপদে আসেন ইতিহাসের মহানায়ক। ১৯৬৬ সালে ছয়দফা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেও মৌলভীবাজার আসেন বঙ্গবন্ধু। তখন মৌলভীবাজার ক্লাব প্রাঙ্গণে জনসভায় ভাষণ দেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ জন্মের পরেও জাতির পিতা এসেছেন মৌলভীবাজারে। ১৯৭৩ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে দেয়া হয় বিশাল গণসংবর্ধনা। মৌলভীবাজারবাসী অধির আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন প্রিয় নেতার। অতঃপর মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্মিত মঞ্চে ওঠেন জনতার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেইদিন স্বাধীন দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান, গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধুকে দেখতে মানুষের ঢল নামে বিদ্যালয় মাঠে।

সেই ছোট্ট খোকা থেকে তিনি হয়ে ওঠেছেন গণমানুষের নেতা, একটা দেশের স্রষ্টা, বাঙালি জাতির পিতা কিংবা বঙ্গবন্ধু। মৌলভীবাজার একটি অগ্রসর ও উন্নত জেলা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য এ জেলার অপার সৌন্দর্য্য পরতে পরতে বিদ্যমান। পর্যটন জেলা হিসেবে পরিচিত এজেলার প্রতিটি উপজেলায় আমরা খুঁজে পাই বঙ্গবন্ধুর পদচিহ্ন

হাসানাত কামাল, সাংবাদিক

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়