ঢাকা, সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৯ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ১৬:১১, ২১ অক্টোবর ২০২০
আপডেট: ২১:১৩, ২১ অক্টোবর ২০২০

সরেজমিন লাউয়াছড়া

প্রবেশপথের শোভা দেখে বুঝা যায়না ভেতরের গাছ চুরির ক্ষত

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

দেশের মিশ্র চিরহরিৎ বন মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। প্রবেশপথে দু’পাশে গাছের সারি শোভা দেখে বুঝাই যাবেনা এই বনের ভিতরের ক্ষত। গভীর বনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে দাঁড়ানো গাছের ফাঁকে ফাঁকে পড়ে আছে কাটা গাছের গুড়ি। নানা জাতের উদ্ভিদ আর জীববৈচিত্র্যে আবাস লাউয়াছড়া দীর্ঘদিন থেকেই বনদস্যুদের আক্রমণের শিকার। আইনিউজের অনুসন্ধানে এমনই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

তবে করোনা প্রদুর্ভাবের সময় লকডাউনে সবাই ঘরে থাকার সুযোগে সবচেয়ে বেশি গাছ পাচার হয়েছে বন থেকে। কোটি কোটি টাকা মূল্যে গাছ চুরির ফলে উজাড় হচ্ছে বন। ধংস হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ। হুমকির মুখে পড়েছে বন্য প্রাণী। স্থানীয়দের অভিযোগ বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা ও কিছু অসাধু লোক এই চোরচক্রের সাথে যুক্ত থাকার কারণেই থামছে না গাছ চুরি।

সবুজ ঝোাপজঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে গাছের গুড়ি

আইনিউজে টিম সরেজমিন লাউয়াছড়া বনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখতে পায়, সবুজ ঝোাপজঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে নতুন পুরাতন অনেক কাটা গাছের গুড়ি। পায়ে চলা পথের পাশেও রয়েছে কাটা গাছের গুড়ি। ফুলবাড়ি এলাকার বাঘমারা বন ক্যাম্পের পাশের টিলা, লাউয়াছড়া উদ্যানের পার্শ্ববর্তী কালাছড়া বিটের আশপাশ এলাকায় সেগুন, আগর, বনাক, চাপালিশ, আকাশমনিসহ বিভিন্ন জাতের শতাধিক কাটা গাছের আলামত পড়ে আছে। লাউয়াছড়া খাসি পুঞ্জির পেছনে পান জুম লাগোয়া আগর বাগানেও কয়েকটি কাটা গাছের গুড়ি রয়েছে।

সবুজ ঝোাপজঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে গাছের গুড়ি

সবুজ ঝোাপজঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছে গাছের গুড়ি। ছবি : আইনিউজ

আইনিউজকে স্থানীয়রা জানান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে গাছ চুরির ঘটনা নতুন কিছু নয়। নিয়মিতই সেখান থেকে গাছ পাচার হচ্ছে। তবে লকডাউনের সময় বনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল ছিলো। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগীতায় চোরচক্র সেই সুযোগটি কাজে লাগায়। অবাধে গাছ পাচার হয় তখন।

রেল লাইনে বিশেষ ধরণের ট্রলি ব্যবহার করে গাছ পাচার

বালাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজারের সভপতি আসম সালেহ সোহেল আইনিউজকে বলেন, ’এই বনের ভিতর দিয়ে রেল লাইন চলে গেছে। সেই লাইনে বিশেষ ধরণের ট্রলি ব্যবহার করে চোরচক্র সহজেই গাছ পাচার করতে পারে। লকডাউনের সময় আবার ট্রেন যোগাযোগও বন্ধ ছিলো। আর বনের ভেতর দিয়ে সড়কপথতো আছেই। সবাই ঘরে থাকার সুযোগটি ভালো করেই কাজে লাগিয়েছে বনদস্যুরা।

রেল লাইন লাইনে বিশেষ ধরণের ট্রলি ব্যবহার করে চোরচক্র সহজেই গাছ পাচার করতে পারে : ছবি : আইনিউজ

লাউয়াছড়া বন ও জীববৈচিত্র রক্ষা আন্দোলনের আহবায়ক আইনিউজকে জলি পাল বলেন, ’ এই বনের গাছ চুরির সাথে কারা যুক্ত সেটা সবাই জানে। বন বিভাগের কিছু মানুষের সম্পৃক্ততা আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সংঘবদ্ধ চোরচক্রকে প্রতিহত করা যাচ্ছেনা। শুধু চোররাই দায়ি নয় তাদের পেছনের শক্তিকে প্রতিহত করা না গেলে এই বন রক্ষা পাবেনা।’ 

লোকবল সংকটে অসহায় বন বিভাগ

তবে লাউয়াছড়া বন বিট কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও শ্রীমঙ্গল রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মুনায়েম হোসেন বন বিভাগের অবহেলা ও গাছ চুরিতে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তারা বন বিভাগের লোকবল সংকটকে গাছ চুরির জন্য দায়ি করে জানান, চারজন প্রহরী, ১ জন মালি ও ২ জন বুটম্যান নিয়ে সশস্ত্র গাছ চোরদের ঠেকানো কঠিন।

মোনায়েম হোসেন আরো বলেন, ১২শ ৫০ হেক্টর বন পাহাড়ায় অন্তত ২৫জন লোকের দরকার। সেখানে মাত্র কয়েকজন লোক নিয়ে এতোবড় বন রক্ষা করা সম্ভব নয়।

বনবিভাগের তথ্যমতে, করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সুযোগে সংঘবদ্ধ চোরচক্র ১৭১টি গাছ চুরি হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে সবচেয়ে বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাছ চুরির দায়ে ৩৫টি মামলা দয়ের করা হয়েছে। একই সময়ে সেগুন, আগর, বনাক, চাপালিশ ও আকাশমনিসহ বিভিন্ন জাতের প্রায় ৯শ ঘনফুট চোরাই কাঠ উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৭ লক্ষ টাকা।

সংরক্ষিত বন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

বনবিভাগসূত্র আইনিউজকে জানায়, প্রাকৃতিক ও প্রকল্পের মাধ্যমে সৃষ্ট এই উদ্যানের পূর্ব নাম ছিল পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন। ১৯২৫ সালে তৎকালিন বৃটিশ সরকার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মৌলভীবাজার ফরেস্ট রেঞ্জের আওতাধীন ২ হাজার ৭৪০ হেক্টর আয়তনের বনে বৃক্ষায়ন শুরু করে। ১৯৯৬ সালে সংরক্ষিত বন থেকে ১২৫০ হেক্টর আয়তন নিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশের ২১টি বন্যপ্রাণি অভয়াশ্রম ও ১৭টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিপন্ন প্রজাতির নানা জাতের উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের কারণে সুন্দর বনের পরেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত চির হরিৎ এই রেইন ফরেস্ট বা বর্ষাবন। একসময় বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্রই এ ধরণের বন ছিলো। তবে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চা বাগান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ক্রমে সংকুচিত হয়েছে চিরহরিৎ এ বর্ষাবন।

বাংলাদেশের ২১টি বন্যপ্রাণি অভয়াশ্রম ও ১৭টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। ছবি : আইনিউজ

এই বনে সেগুন, চাপালিশ, কড়ই, অর্জুন, ঢেউয়া, লটকন, পিতরাজ, কদম, ছাতিয়ান, শিমুল, চিকরাশি, নাগেশ্বর, আকাশমনি, ডুমুর, বট, অশ্বথ, কাউ, জলপাই, হারগজা, চালমুগড়া, জারুল, চালতা, উদল, আমলকি, বহেরা, হরিতকি, জাম, তুন, আওয়াল, অর্কিড, লোহা কাঠ, রকতন, গামার, আগর, বাঁশ-বেতসহ ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এছাড়া দেশের একমাত্র ক্লোরর্ফম প্রজাতির আফ্রিকান টিকওক গাছটি রয়েছে এই বনে। সহব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত বিশাল আয়তনের এই উদ্যানটি রক্ষার জন্য এখানে যে লোকবল থাকার কথা সেই লোকবলে বড় ঘাটতি রয়েছে। ২১ জন লোকবলের বিপরীতে আছেন মাত্র ৭জন। সহকারী বিট কর্মকর্তা ও ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা নেই বহুদিন। বন প্রহরী, মালিসহ বিভিন্ন পদের লোকবলের শূন্যতা রয়েছে। নিয়মিত পাহাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন, আগ্নেয়াস্ত্র আর প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় সঠিকভাবে পাহাড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকৃত অবস্থা জানতে বন বিভাগের তদন্ত

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণি ব্যাবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) রেজাউল করিম চৌধুরী আইনিউজকে বলেন, বন বিভাগের প্রাথমিক অনুসন্ধানে গাছ চুরির আলামত মিলেছে। চলতি বছর সংঘবদ্ধ চোরদের বিরুদ্ধে ৩৫টি মামলা হয়েছে। প্রকৃত অবস্থা জানতে বন বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করছে। বন বিভাগের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়