ঢাকা, সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৮ ১৪৩৩

মুজিবুর রহমান রঞ্জু কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ০৩:০৩, ২৮ অক্টোবর ২০২০
আপডেট: ১৪:০৫, ২৮ অক্টোবর ২০২০

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান : অদম্য সাহসী এক যোদ্ধা

আজ ২৮ অক্টোবর, সিপাহী হামিদুর রহমানে ৪৯তম শাহাদাৎ বার্ষিকী। বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত এক অদম্য সাহসী দেশপ্রেমিক যোদ্ধার নাম। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ধলই সীমান্ত ফাঁড়িতে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে বীরদর্পে লড়াই করে শহীদ হন ইপিআর সদস্য হামিদুর রহমান।

চারদিকে চা বাগান, মাঝখানে মৌলভীবাজারের ধলই সীমান্ত চৌকি। ২৮ অক্টোবর ভোররাতে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পাক আর্মিদের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। শত্রুপক্ষে বেশ হতাহত হয়।

মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ফাঁড়ির খুব কাছে পৌঁছে গেলেও পাক সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিবর্ষণে আর এগোতে পারছিলো না।  

এ অবস্থায় সিপাহী হামিদুর রহমান ধলই ক্যাম্পে স্থাপিত মেশিনগান ধ্বংসের দায়িত্ব নেন। বুকের ওপর ক্রলিং করে পাক সেনাদের বাংকার ও মেশিনগানে গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। নিস্তব্দ হয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনীর সকল আয়োজন। কিন্তু শত্রু সেনাদের কাছ থেকে সহযোদ্ধাদের নিরাপদ করে ফেরার পথে পাক বাহিনীর ছোঁড়া গুলিতে শহীদ হন সিপাহী হামিদুর রহমান।

১৯৭১ সালের সেসময়কার ঘটনা

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬ অক্টোবর ক্যাপ্টেন কাইয়ূম, ক্যাপ্টেন আব্দুন নূর, নায়েব সুবেদার আবুল হোসেন সুবেদার সাত্তার, হাবিলদার মকবুল, ক্যাপ্টেন কাইয়ূমের রানার সিপাহী হামিদুর রহমান, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমান, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্র বাহিনী ব্যাটেলিয়নের নেতৃত্বে ধলই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

ধলই সীমান্তে পাক বাহিনীর ২২ বেলুচ রেজিমেন্ট, ১ কোম্পানী রাজাকার ও ১ আর্টিলারী গ্রুপের বেকআপ টিম হিসাবে ধলইভ্যালি পাক বাহিনীর ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের ২ প্লাটুন, সেনা সদস্য, ১ প্লাটুন রাজাকার নিয়ে একটি শক্ত অবস্থান ছিল। পাক বাহিনীর প্রধান অটোমেটিক অবস্থানগুলো ছিল খুবই মজবুতভাবে তৈরী ব্যার্ঙ্কাধসঢ়; পাক বাহিনী ধলই সীমান্ত ফাঁড়ির সামনে পাঞ্চী ও ভূমি মাইন স্থাপন করেছিল। অন্য দিকে পক হানাদার বাহিনীর বিপরীতে ছিল ১ম ইস্ট বেঙ্গল, ভারতীয় মিত্র বাহিনীর জাট ব্যাটেলিয়ন, ১ কোম্পানী এফ এফ ও ১টি আর্টিলারী গ্রুপ। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় মুক্তিযোদ্ধা, মিত্র বাহিনী এ, বি ও ডি তিনটি দলে বøকিং পজিশন দখলের যাত্রা শুরু করে। এ কোম্পানীতে কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুব, বি কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দীন ও ডি কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন মেজর বজলুল গনি পাটওয়ারী।

রাত সাড়ে ১০টায় ক্যাপ্টেন কাইয়ূমের নেতৃত্বে মূল দল এগিয়ে যায় ধলাই সীমান্ত ফাঁড়িতে অবস্থানরত শক্তিশালী পাক বাহিনীর দিকে। রাতে ঘন কুয়াশায় মূল টার্গেট ঠিকমত দেখা যাচ্ছিল না বলে ক্যাপ্টেন কাইয়ুম পিছন থেকে আর্টিলারী সহায়তা চাইলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই ভারতীয় আর্টিলারী গ্রুপ পাক হানানাদর বাহিনীর শক্ত অবস্থানের উপর বৃষ্টির মত গোলা বর্ষণ করলে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। আর্টিলারী ফায়ারের আড়ালে মুক্তিযোদ্ধাদের ৭ ও ৯ নং প্লাটুন যথা সময়ে নায়েব সুবেদার আবুল হাসেম ও সুবেদার সাত্তারের নেতৃত্বে একটি দল ঝাপিয়ে পড়ে শত্রুসেনার দিকে। এসময় মাটিতে পুতে রাখা মাইনের কারণে শত্রু শিবির দখলকালে হতাহত হয় বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা। তখন পাক সেনারা নতুন উদ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণ রচনা করে।

পাক সেনাদের একটি এলএমজির কারণে মুক্তিযোদ্ধারা সামনে এগুতো পারছিল না। এ অবস্থায় সিপাহী হামিদুর রহমান ধলই ক্যাম্পের স্থাপিত এলএমজি ধ্বংসের দায়িত্ব নিয়ে বুকের উপর ক্রলিং করে এগিয়ে এলেন। পাক সেনারা হামিদুর রহমানকে দেখে ফেলার আগেই তিনি গ্রেনেড নিক্ষেপ করলেন, পাক সেনাদের ব্যাঙ্কার ও এলএমজির উপর। নিস্তব্দ হয়ে গেল পাক হানাদার বাহিনীর সকল আয়োজন। গ্রেনেড হামলা করে শত্রু সেনাদের কাছ থেকে সহযোদ্ধাদের নিরাপদ করে ফিরার পথে একেবারে সীমান্ত লাইন বরাবর পৌছার সময় পাক বাহিনীর ছোড়া গুলিতে সিপাহী হামিদুর রহমান শহীদ হন।

ধলই সীমান্ত ফাঁড়িতে হামিদুর রহমানের সাহসী ভূমিকায় ও আত্মত্যাগে পাক সেনারা পরাভূত হলে আর অন্য দিকে কুরমা সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর অন্য দলটি ধলই ভ্যালি ক্লাবে অবস্থানরত পাক বাহিনীর দলকে প্রতিরোধ করলে ধলই সীমান্তের যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা জয়লাভ করে।

ধলই সীমান্তে যখন মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী কোন ভাবেই পাক সেনাদের পরাভূত করতে পারছিল না ঠিক তখনই বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান জীবন বাজি রেখেই একাকী এসে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে পাক সেনাদের পরাজিত করার সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এ সীমান্তে বিজয় নিশ্চিত করলেন।

হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর

বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের সম্মানে কমলগঞ্জের ধলই সীমান্তে বিজিব ফাঁড়ির নামকরণ করা হয় হামিদুর রহমান সীমান্ত ফাঁড়ি। এ ফাঁড়ির সামনেই চা বাগানের সবুজ চায়ের মাঝে নির্মিত হয়েছে হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ। তাঁর বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের তথ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত ছবি ও লিখিত কিছু ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়েয়ে এখানে নির্মিত বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।

আইনিউজ/এইচকে

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়