ঢাকা, সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৮ ১৪৩৩

মুজিবুর রহমান রঞ্জু

প্রকাশিত: ২২:২৪, ২ নভেম্বর ২০২০
আপডেট: ২২:৫৬, ২ নভেম্বর ২০২০

চা বাগানে অবাধে তৈরি হচ্ছে চোলাই ও হাড়িয়া মদ

সংগৃহীত

সংগৃহীত

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের সবগুলো চা বাগানে অবাধে তৈরি হচ্ছে জীবননাশক চোলাই ও হাড়িয়া মদ। পাশাপাশি অবাদে চলে গাজার ক্রয় বিক্রয় সেবন। ব্রিটিশ আমল থেকে চা বাগান সমূহে নিবন্ধিত মদের পাট্টার পাশাপাশি প্রায় প্রত্যেক চা শ্রমিক ঘরে পঁচা ভাত দিয়ে ও ক্ষতিকারক কিছু উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে চুলাই হাড়িয়া মদ।

সারাদিনের পরিশ্রমের পর সন্ধ্যার পরেই মাদকসেবনকারী মাতাল শ্রমিকরা নিজ বাড়িতে গিয়ে হানাহানি, ভাঙচুরসহ নানা ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

সরেজমিনে কমলগঞ্জের কয়েকটি চা বাগান ঘুরে জানা যায়, এ উপজেলার ২২টি চা বাগানের অধিকাংশ লেবার লাইন (শ্রমিক বস্তি) সমূহে অবৈধভাবে গড়ে উঠা মদের পাট্টায় তৈরি চোলাই, হাড়িয়া মদ ও গাজা সেবন করছেন প্রায় ষাট শতাংশ শ্রমিক। যুগ যুগ ধরে চা বাগানে মাদক সেবনের এই ভয়াবহতা থাকলেও নীরিহ সাধারণ শ্রমিক ও যুবসমাজকে রক্ষায় মাদক উৎপাদন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ নেয়নি। ফলে মাদক সেবনে চা বাগান ও বস্তির যুব সমাজরাও উৎসাহিত হচ্ছে।

কমলগঞ্জের শমশেরনগর, আলীনগর, মাধবপুর, ধলই, কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর চা বাগান ঘুরে পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চা বাগান সমূহে ব্রিটিশ আমল থেকেই নিবন্ধিত মদের পাট্টার পাশাপাশি নিজস্ব উৎপাদিত চোলাই ও হাড়িয়া মদ পান করেন শ্রমিকরা।

চা বাগানে দিনে ও রাতে মদ পান করলেও মূলত সন্ধ্যার পরেই সেবনকারীদের ভয়াবহতা নেমে আসে। চা বাগানের স্থানে স্থানে নিজস্ব বাড়ির পাট্টা সমূহে এসব মদ উৎপাদন করা হয়। ক্ষতিকর নিশাদল, চিটাগুড়, হালকা পরিমাণে ইউরিয়া সার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, পুরাতন পঁচা ভাতের মতো নানা পদার্থ দিয়ে চোলাই ও হাড়িয়া মদ তৈরী হয় বলে তারা জানান। বেশী নেশা হওয়ার জন্য আবার বনাঞ্চল থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন লতাপাতার রসও মেশানো হয়। এর মাঝে স্বর্ণ গলানোর কাজে ব্যবহৃত নিশাদলও এসব মদে মেশানো হয়। যা সরাসরি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি করে থাকে।

চা বাগানের একজন মদ পানকারী অর্ধ লিটার থেকে দেড় লিটার পর্যন্ত পান করে থাকে। আবার অনেকেই গাজা সেবন করেন। চা বাগানের নারী শ্রমিক সরসতি মৃধা, পারুল মৃধা, সরসতি রিকিয়াশন, অর্চনা বাউরী, মীনা বাউরী, দেওন্তী বাউরী, নান্সী রিকিয়াশন, সুমিত্রা রিকিয়াশন জানান, তাদের স্বামীরা সন্ধ্যার পর মদের পাট্টায় গিয়ে মদ পান করে মাতাল হয়ে উঠেন। পরে রাস্তাঘাটে ও ঘরে এসে ঝগড়া-ঝাটি, সন্তানদের গালিগালাজসহ বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করেন।  

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শমশেরনগর চা বাগানের জাগরন যুব ফোরামের সভাপতি মোহন রবিদাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চা বাগানে মাদক উৎপাদন বন্ধে পুলিশ প্রশাসনই যথেষ্ট। তবে মাদক উৎপাদন ও সেবনকারীদের ধরে মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করলে অল্প দিনের মধ্যে তারা জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। তাহলে চা বাগানে মাদক বন্ধে কে ব্যবস্থা নিবে?

শমশেরনগর চা বাগানের দেওরাজ রবিদাস, রাজদেও কৈরী সহ চা বাগানের শ্রমিকরা বলেন, চা বাগানে উৎপাদিত মদের পাট্টায় এখন বস্তির যুবকদের বেশী দেখা যায়। ফলে চা শ্রমিকদের সাথে বস্তির লোকজনও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে চা বাগানে অবৈধভাবে মদের পাট্টা বন্ধ করা উচিত বলে তারা মনে করেন ।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের রেজিস্টার ও মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. আবু সালে মো. সায়েম বলেন, নেশা এমনিতেই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি। এছাড়া  ক্ষতিকর নিশাদল, পঁচা ভাত, ও রেক্টিফাইড স্পিরিট দিয়ে তৈরী চুলাই ও হাড়িয়া মদ কিডনী ও লিভারের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে লিভারের।

কমলগঞ্জের শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) সুধনি চন্দ্র দাশ বলেন, মাদক বন্ধে চা বাগানসহ সকল স্থানেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মাদকের আস্তানা নির্মূলে ও কমলগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশ কোন প্রকার কার্পণ্য করছে না। প্রায় প্রতিদিনই কমলগঞ্জের কোন না কোন স্থান থেকে পুলিশ মাদকসহ মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করছে।

এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান বলেন, চা বাগানে বৈধ মদের পাট্টা সমূহে কোন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। তবে অবৈধভাবে উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই অভিযান চালিয়ে মাদকের বেশ কয়েকটি বড় চালান ধরে আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।

আইনিউজ/মুজিবুর রহমান রঞ্জু 

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়