ঢাকা, বুধবার   ১০ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ২৬ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:১১, ২২ জুন ২০২১
আপডেট: ২৩:১৫, ২২ জুন ২০২১

হাকালুকিতে নির্বিচারে ২০ হাজার বৃক্ষনিধন: ৭ জনকে আসামী করে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা

দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি হাওরের মালাম বিলের কান্দিতে জলজ বৃক্ষ নির্বিচারে নিধনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের এজাহার পাঠিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

মঙ্গলবার (২২ জুন) পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক মো. বদরুল হুদা আইনিউজকে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, এই এজাহারনামা বড়লেখা থানায় অফিসার ইনচার্জ বরাবর পাঠানো হয়েছে। 

মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে, হাকালুকি হাওরের অন্তর্গত মালাম বিলের প্রায় ১২ বিঘা খাসজমিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ও প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া ১০-১৫ ফুট উচ্চতার এসব বৃক্ষ এজহারে উল্লেখ করা ৭ জন এবং অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জন মিলে কেটে ফেলে। এর ফলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এর ১৫(১) এবং ১৫(২) ধারায় মামলার সুপারিশ করা হয়। 

বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জকে পাঠানো এ এজহারে যে ৭ জনকে আসামী করে নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলো- বড়লেখার মনাদি গ্রামের সুফিয়ান আহমদের ছেলে জয়নাল উদ্দিন, কাজীরবৃন্দ গ্রামের মকদ্দছ আলীর ছেলে মক্তদির আলী, একই গ্রামের মৃত আমরুজ আলীর ছেলে মশাঈদ আলী, মৃত মইয়ব আলীর ছেলে রিয়াজ আলী, ছত্তার আলীর ছেলে জয়নাল উদ্দিন, আব্দুল হান্নানের ছেলে কালা মিয়া ও মইয়ব আলীর ছেলে সুরুজ আলী। 

এছাড়াও আরও ১৫-২০ জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে আসামী করা হয়েছে।

এজহারে স্বাক্ষীদের মধ্যে বড়লেখার হাল্লা ফরেস্ট বীটের অফিসার সুমন বিশ্বাসসহ ১১ জনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা যায়, হাওরের মালাম বিলের কান্দিতে জলজ বৃক্ষ নির্বিচারে নিধন করা হয়। নিধনের শিকার ওইসব জলজ বৃক্ষের বয়স ৫ থেকে ১৮ বছর। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ইতিমধ্যেই নিধন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার জলজ বৃক্ষ। রহস্যজনক কারণে ওই ঘটনার পরও নির্বাক জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ বিভাগ। 

অভিযোগ উঠেছে, মালাম বিলের বাঁধ নির্মাণের নামে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইজারাদারের লোকজন গাছগুলো কেটে নিয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য। ওই বিলটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে পড়েছে।

এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পূর্বেই হাকালুকি ইসিএ ব্যবস্থাপনা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য ও জলজ বনের পাহারাদার মো. আব্দুল মনাফ ৭ জনের বিরুদ্ধে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের অনুলিপি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাকালুকি হাওরের অন্তর্ভূক্ত বড়লেখা উপজেলার অধীনে মালাম বিলের (মৎস্য জলাশয়) আয়তন ৪২৮.৯২ একর। ১৪২৭ বাংলা হতে ১৪৩২ বাংলা সন পর্যন্ত সময়ের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৩ টাকায় মালাম বিলটি ইজারা নিয়েছে বড়লেখা উপজেলার মনাদি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০০৩ সাল হতে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মালাম বিলের (কান্দির) পাড়ে সরকারি ভূমিতে হিজল, করচ, বরুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ বৃক্ষ রোপণ করে। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে। বর্তমানে প্রাকৃতিক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সৃজিত জলজ উদ্ভিদগুলো ১০-১৫ ফুট উচ্চতার হয়েছে। যা হাকালুকি হাওরের ইসিএ এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবরোধে বিশেষ অবদান রাখছে। গত ২৭ মে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইজারাদারের লোকজন বিলের বাঁধ নির্মাণের নামে বিলের পাড়সহ প্রায় ১২ বিঘা জমির প্রায় ২০ হাজার গাছ অবৈধভাবে কেটে নেয়। এরপর তারা সেখানে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করেছে। এতে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী (বনায়ন পাহারাদার) আব্দুল মনাফ ও আরফান আলী বলেন ‘মালাম বিলের ইজারাদার সমিতির লোকজন বর্ণি ইউনিয়নের কাজিরবন্দ গ্রামের জয়নাল উদ্দিন, মক্তদির আলী, মশাইদ আলী, রিয়াজ উদ্দিন, কালা মিয়া, সুরুজ আলী, মনাদি গ্রামের জয়নাল উদ্দিন প্রমুখদের নিয়ে এক্সাভেটর দিয়ে মে মাসের প্রথম দিকে বিলের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সরকারি ভূমির জলজ বৃক্ষ নিধন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। আমরা বাধা দিলে তারা তা মানেনি। এছাড়া বিলের পাড়ের গাছ কেটে অনেকেই বোরো চাষের জমি তৈরী করছে। এ ঘটনায় ৭ জনের নামে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’

মনাদি মৎস্যজীবী সমিতির পরিচালক জয়নাল উদ্দিন বলেন, ‘জলমহাল ইজারায় শুধুমাত্র মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করা হয়। তা সকলেই জানেন, প্রভাবশালীরা বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকারীরাই এখানকার গাছ কেটেছেন, বাঁধ দিয়েছেন। যদিও কাজটা মোটেও ঠিক হয়নি। বিষয়টি প্রশাসনের সঙ্গে মিটমাট করা হবে বলে শুনেছি।’ কারা গাছ কেটেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

বন বিভাগের হাকালুকি বিটের দায়িত্বে থাকা জুনিয়র ওয়াইল্ডলাইফ স্কাউট তপন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘জলা বনের পাহারাদারের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বনায়নটি পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের। তাই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে অবগত করেছি। বিষয়টি তাদের দেখার কথা।’

পরিবেশকর্মী রিপন দাস বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যখন নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ঠিক তখনই নির্বিচারে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। এতে হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশের বিরূপ প্রভাব পড়বে। বিলের বাঁধ নির্মাণে নামে যারা এই গাছগুলো কেটেছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

পরিবেশ অধিপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ইবিএ প্রজেক্টের এডমিন এন্ড ফাইনান্স অফিসার (এএফও) সাহিদ আল শাহিন রোববার (২০ জুন) বিকেলে বলেন, ‘হিজল-করচ গাছ কাটার ঘটনাটি পাহারাদার আমাকে জানিয়েছে। অফিসের কাজে আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। তারা জানায় দুস্কৃতিকারীরা প্রায় ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলেছে। আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে ইসিএভুক্ত মালাম বিল এলাকায় প্রায় ৭০ একর জায়গায় হিজল-করচসহ পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলো অনেক বড় হয়েছিল। এ ঘটনায় পাহারাদার থানায় ও ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ইসিএভুক্ত এলাকায় সরকারি অনুমোদিত প্রকল্প ব্যতিত গাছ কাটা, খনন, স্থাপনা নির্মাণ, পাখি শিকার করা ইত্যাদি বেআইনি। গাছগুলো কাটায় হাওরের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়