ঢাকা, রোববার   ১০ মে ২০২৬,   বৈশাখ ২৭ ১৪৩৩

জাবেদ ভূঁইয়া

প্রকাশিত: ২১:২৩, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ২২:৩৩, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

শ্রীমঙ্গলে ১৩০০ বছরের পুরোনো মন্দিরের সন্ধান

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে একটি পাহাড়ের পাদদেশ আর উজান থেকে নেমে আসা ছোট নদীর (ছড়া) উপকণ্ঠে ১৩ শত বছরের পুরাতন একটি মন্দির উদ্ধার হবার সম্ভবনা উঁকি দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে মন্দিরটি সপ্তম বা অষ্টম দশকের  তাম্রশাসন আমলের হতে পারে।

প্রত্নতত্ত্ব ও সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য উপাত্ত বের হতে পারে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এ মন্দিরটি ধারণা সত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করলে।

প্রত্নতত্ত্ব ও সিলেটের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য ভাষ্যকার সর্বজনবিদিত কমলাকান্ত গুপ্ত যে আলোকছটা রেখে গেছেন সমাজের জন্য, সেটা কাজে লাগিয়ে আরও বহুদূর পর্যন্তু যেতে পারে সেই ইতিহাসের বহুমাত্রিক পাঠের মাত্রা।

১৯৬৭ সালে  কমলাকান্ত গুপ্ত ইংলিশ ভাষায় রচিত কপার প্ল্যাটস অব সিলেট বইটি অসামান্য কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

তিনি ১৯১২ থেকে ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্তু  যে কয়েকটি ঐতিহাসিক তাম্রশাসন আবিস্কার হয়েছিলো সেগুলোর পাঠোদ্ধার, কালনির্ণয়, ব্যাখা-বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিকতার বিচার করে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার বর্তমান শ্রীমঙ্গল উপজেলার মরুণ্ডুনাথের কালাপুরেরর  তাম্রশাসনের  ইতিহাস অনিবার্য বলে অবহিত করা যায়।

জানা যায়, ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে সামন্ত মরুণ্ডুনাথ রাজার একটি তাম্রশাসন (খৃষ্টাব্দের ৮ম শতাব্দী) শ্রীমঙ্গল থানার চৌস্থলি কালাপুর গ্রাম থেকে আবিষ্কৃত হয়।

কমলাকান্ত গুপ্তের  কপার প্ল্যাটস অব শ্রীহট্ট বইয়ের অনুবাদক হিমাদ্রী দাশ পুরকায়স্থ সিলেটের তাম্রশাসন বই এর ৭২ পৃষ্ঠার উল্লেখ করেছেন,

'সামন্ত মরুণ্ডুনাথের তাম্রশাসন শ্রীঙ্গলের থানাধীন চৌস্থলী পরগনায় আবিস্কার হয়, পাহাড়ি ও জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল ত্রিপুরা রাজ্য ও বর্তমান কুমিল্লা জেলা সংলগ্ন এলাকা। প্রচুর পরিমাণ মাটির কলসীর টুকরো যে জায়গায় তাম্রশাসন পাওয়া গিয়েছিলো এবং স্বল্প দূরুত্বে, ছোট নদী মারসাওন ছড়ার নিকটে পুরাতন ইটের দেওয়াল ও পুরাতন ইট দ্বারা গঠিত রূপও দেখা গেছে।'

এই বর্ণিত ভাষ্য থেকে ধারণ করা হয়, মৌলভীবাজার জেলার বর্তমান শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৫ নং কালাপুর ইউপি এলাকার মাজদিহি চা বাগানের চৌতলী মৌজা (স্থানীয়রা চাওতলীও বলে থাকে)  শাওন ছড়ার উপকণ্ঠে প্রাচীন বটবৃক্ষের পাশেই সামন্ত মরুণ্ডুনাথ এর আমলের প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন মন্দিরের অবস্থান হতে পারে।

এই প্রতিবেদকের ব্যাপক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কালাপুর ও ভাগলপুর গ্রামকে দুই ভাগে ভাগ করা শাওন ছড়ার উপকণ্ঠে মাজদিহি চৌতলী বিটের (শাওন ছড়া, ছোট নদীর) দক্ষিণ পাশে  একটি প্রাচীন বটবৃক্ষের পাশে কালিপূজা হয়ে থাকে, স্থানীয়দের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে পরিলক্ষিত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ। এর পাশেই প্রায় কুড়ি হাত দৈর্ঘ্য পুরাতন ইটের সারি পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদকের নিজস্ব উদ্যােগে কয়েক হাত মাটি খুঁড়ে একটি দৈঘ্য প্রস্থ বিশিষ্ট সাদা সিমেন্টের আবরণের দেখা মিলেছে, প্রচুর পরিমাণে মাটির ভাঙা কলসীর টুকরো মিলেছে। স্থানীয়ভাবে মারসাওন ছড়া, ছোটনদী হাওনছড়া নামে ব্যাপক পরিচিত। একাধিক ইতিহাসবিদ এর ধারণ এই অঞ্চলটি এক সময়ে ভারতের আসাম প্রদেশের করিমগঞ্জ এলাকার সাথে যুক্ত থাকায়, আসামের অহমীয়া ভাষার প্রভাবে মারসাওন ছড়া, হাওন ছড়া নামে পরিচিতি লাভ করেছে বলে জানা যায়।

আসামের লোকজন দন্ত স, তালব শ-কে 'হ' রূপে উচ্চারণ করে থাকেন তাই সাওন ছড়া বা শাওন ছড়া হাওন ছড়া হয়ে যায়।

হিমাদ্রী দাশ পুরকায়স্থ অনুবাদ কৃত ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কমলকান্ত গুপ্তের বইয়ের অনুবাদে তিনি স্থানীয় পত্রিকার সূত্রে উল্লেখ করে জানান,  এর পঁচিশ বছর পূর্বে (আনুমানিক ১৯৪২ খিস্টাব্দে) একই গ্রাম থেকে একটি বিষ্ণু প্রতিমূর্তি পাওয়া গিয়েছিলো। একই বইয়ে তিনি দাবী করেন,  'মহারাজা লোকনাথের ত্রিপুরা তাম্রশাসনে ও সামন্তরাজা  মরুণ্ডুনাথের  কালাপুর তাম্রশাসনে বর্ণিত  অনন্ত নারায়ণের মন্দির চৌতনী (চৌস্থলী)  এলাকায় অবস্থিত ছিল।'

এই দাবির স্বপক্ষে বলা যায়, যেহেতু শাওনছড়ার উত্তরদিকে আরেক ছোট নদী নারায়ণছড়া ও দক্ষিণ দিকে জাগ ছড়া নামে আরেকটি ছোট নদীর অবস্থান রয়েছে তাতে করে তৃতীয় মন্দিরটি বর্তমান অবস্থান বর্তমান শাওনছড়ার উপকণ্ঠে হবার সম্ভবনা জোরালোভাবে প্রতিয়মান হয়।

২০১৯ সালে নাগরী থেকে প্রকাশিত কবি, গবেষক, শিক্ষক  জফির সেতু সংকলিত ও সম্পাদিত  কমলাকান্ত গুপ্তের তাম্রশাসনে শ্রীহট্ট বই এর সপক্ষে বহু ইঙ্গত রয়েছে।

জফির সেতু-এর ধারণা ছিলো কমলাকান্ত গুপ্ত বইটি ইংলিশ ভাষায় লিখে থাকলেও  এ বিষয়ে, 'নিশ্চয়ই', বাংলায় লিখে থাকবেন।  প্রথম পাওয়া যায় দুটি দুর্লভ রচনা ১৯৬১-৬২ খ্রিস্টাব্দের যুগভেরী পত্রিকায়। জফির সেতুর একান্ত আগ্রহ থেকে 'তন্ন তন্ন' খুঁজেন সমুদয় রচনা সংগ্রহ শাল।

তিনি জানান 'তৃতীয় রচনাটি পাওয়া গেল না।  এরপর অন্যত্র অনুসন্ধান চলল। পরে পাওয়া গেলো  আরও দুটো রচনা।  তাঁর ধারণা এ-বিষয়ে কমলাকান্ত গুপ্তের আরও বিচ্ছিন্ন রচনা থাকতে পারে' এ প্রতিবেদকের ধারণা  সেই বিচ্ছিন্ন  রচনায় প্রত্ন নির্দশন ব্যাপারে প্রামাণিক দলিল হিসেবে দেখা দিতে পারে।

তবে বলে রাখা ভালো,  ইংলিশ ভাষার বিষয়ে রচনাগুলো বাংলা ভাষায় লিখিত রচনার পরে লিখিত হয়েছে,সেই ইংলিশ ভাষায় রচিত বইয়ের বর্ণনার সূত্র ধরে মারসাওনছড়া  বা হাওনছড়া (শাওনছড়া) এর উপকণ্ঠে ৭ম বা ৮ম শতাব্দীর মন্দির পাওয়া অসম্ভব কিছু নয় উল্লেখ রয়েছে।

জফির সেতু সম্পাদিত তাম্রশাসনে শ্রীমহট্টে উল্লেখ রয়েছে- 

বাংলার বর্ম বা সেনরাজারা, ত্রিপুরার রাজারা, উত্তর শ্রীহট্ট  বা গৌড়ের গোবিন্দকেশব প্রভৃতি রাজারা হিন্দুধর্মাবলম্বী ছিলেন। তাঁহারা নবব্রাক্ষণ্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁহারা যাগ, যজ্ঞ, মন্দিরাদি প্রতিষ্ঠা করতেন।

এতে আবারও প্রমাণ হয়ে যেতে পারে  চৌতলী পরগনায় ( বর্তমানে চৌতলী মৌজায়) শাওন ছড়ার উপকণ্ঠে  প্রাচীন বটবৃক্ষেরর পশ্চিম পাশে
তাম্রশাসনে  শ্রীহট্টের ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,  কোনও বিশিষ্ট দেবতার মন্দির প্রতিষ্ঠা ক্রমে দেবতার বলিচরুসত্রের জন্য তৎসৎশ্লিষ্ট পূজক, পাচক, মোহান্ত, পাঠক, পণ্ডিত ইত্যাদি নানা কর্মের নিমিত্ত মন্দির সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বহুতর ব্রাহ্মণ স্থাপনের উদাহরণ খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ-অষ্টম শতাব্দীর পূর্বাঞ্চল বহু তাম্রশাসন দৃষ্ট হয়।  যেমন, লোকনাথের  ত্রিপুরা তাম্রশাসন, মরুণ্ডনাথের কালাপুর ( শ্রীহট্ট) তাম্রশাসন... ইত্যাদি। এতে বুঝা যায়, কালাপুরে আবিস্কৃত ও উদ্ধারকৃত তাম্রশাসনে আলোকে এ অঞ্চলের সেই সময়ের মন্দিরের অবস্থান রয়েছে।

তাম্রশাসনে শ্রীহট্ট বইয়ের ৫৮ পৃষ্ঠায় কমলাকান্ত গুপ্ত বলেন, পালবংশীয় ধর্মপালদেবের খালিমপুর তাম্রশাসনে উক্ত আছে যে, তদীয় রাজত্বকালে শুভস্থলীতে নন্ননারায়ণ (অন্ততনারায়ণ হইতে পারে) দেবতার একটি মন্দির রয়েছে, মহা-সামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মা কর্তৃক নির্মিত হয়।

এই অংশের সাথে কালাপুরের তাম্রশাসনের একটি মিল বা সাদৃশ্যকল্পনা করা যায়, খালিমপুরে শুভস্থলী আর কালাপুরের তাম্রশাসনে চৌস্থলী বা চৌতলা এবং চৌতলী পরগনায় একটি নারায়ণ ছড়া স্থানের নাম রয়েছে। বইটির ৭১ পৃষ্ঠায় বলা আছে ভাটেরার দ্বিতীয় তাম্রশাসন মতে দুইটি সুুউচ্চ মন্দিরের বর্ণনা পাওয়া যায়। যা কালাপুর তাম্রশাসন পাঠে এর প্রযোজনীয়তা তৈরী করে থাকে।

এ ব্যাপারে কবি ও গবেষক নৃপেন্দ্র লাল দাশ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কালাপুরে আবিস্কৃত তাম্রশাসনের সাথে স্থানীয় প্রাচীনতম স্থানের যোগসূত্র বিচার বিশ্লেষণ ইতিহাসের নতুন পাঠ তৈরী করতে পারে। একই সুরে কথা বলেছেন, প্রাবন্ধিক, স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধ গবেষক দীপেন্দ্র ভট্টাচার্য্য। তিনি বলেন, কালের সাথে স্থানের নাম গুরুপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

লোক গবেষক ও প্রাবন্ধিক আহমদ সিরাজ জানান, ইতিহাস নানা ভাবেই বিনির্মাণ হয়ে থাকে, হয়তো এর মাধ্যমে নতুন কিছু বের হয়ে আসতে পারে।

ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ব  অনুসন্ধানি ম. কলিম উল্লাহ এর মতে, মরুণ্ডুনাথ সামন্ত রাজা ছিলেন বলে তিনি মনে করেন না। তারমতে মরুণ্ডুনাথ ভট্টারক ব্রাহ্মণ ছিলেন। যিনি পূজা নেন তিনি পূজা দিতে পারেন না।

তিনি জানান, মরুণ্ডুনাথ সামন্ত নয় ভট্টারক ছিলেন সেই হিসেবের তুলনায় কালাপুর এলাকায় বৌদ্ধমঠ হবার সম্ভবনা দেখেন তিনি। তবে মন্দিরের সম্ভবনাও আমলে থাকে তার।

এই প্রতিবেদন তৈরীকালে ম.কলিম উল্লাহ প্রতিদিন একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে চলছেন প্রতিবেদকের সাথে।

এ ব্যাপারে এলাকার স্থান পরিদর্শন করে গেছেন হবিগঞ্জের লোক গবেষক, লোকায়ত, গবেষণা কাগজের সম্পাদক গৌতম কুমার দাশ। তিনি এ ব্যাপারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলছেন এটাই হতে পারে ১৩শত বছরের প্রাচীন মন্দিরের ঐতিহাসিক স্থান।

এ ব্যাপারে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে অন্তত ৫০ জনের সাথে কথা হয়েছে প্রতিবেদকের। যাদের অধিকাংশের বয়স ৫০ উর্দ্ধে এবং ৭০ বছর পর্যন্তু তাদের দাবী এটা একটি বাংলা ইট ভাটা ছিলো। কিন্তু বাংলা ইট ভাটার দাবির স্বপক্ষে বাংলা ইটভাটার মালিক কে ছিলো? এর উত্তর কেউ দিতে পারেনি, সেই ইটভাটা থেকে কার মূলবাড়ি তৈরী হয়েছে এর প্রমাণ কেউ দিতে পারেন-নি।

তবে অধিকাংশের মতে গত ৪০থেকে ৫০ বছরে ৪০-৫০ হাজার ইট এলাকার লোকজন নিয়ে গিয়েছেন নিজেদের প্রযোজনে। এরমধ্যে সেই ইটের ছবি তুলতে চাইলে অনেকেই জানান তারা ইটের ওপর সিমেন্টের পলেস্তা দিয়ে ফেলেছেন।

এ ব্যাপারে সিলেট-চট্টগ্রামের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আতিউর রহমান জানান, বর্ণনামতে তথ্যের উপর ভিত্তি করে তারা যথা সম্ভব দ্রুত জরিপ কাজ করবেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুমিল্লার আঞ্চলিক পরিচালক, এ কে এম সাইফুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারিভাবে আসতে দেরি হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দ্রুত সেই এলাকা পরিদর্শন আসবেন এবং সবাইকে বিস্তারিত জানাবেন।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান এ ব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উদ্যোগ নিতে পারে বলে জানান।

আইনিউজ/জাবেদ ভুইয়া/এসডি

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ