ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২,   আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

ওমর ফারুক নাঈম, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ২০:৩১, ১৮ মে ২০২২
আপডেট: ২০:৪০, ১৮ মে ২০২২

কুলাউড়ায় গ্রামবাসীর আতঙ্ক বালুদস্যু 

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজিপুর ইউনিয়নের কটারকোনা গ্রামের লুতফুন বেগম। এগারো বছর বয়সি ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। বাড়ির পাশে নদীতে বন্ধুদের সাথে খেলা করতে গিয়েছিলো ছেলে মারজান। আর বাড়ি ফেরেনি। বালুমহালের ড্রেজার মেশিন দিয়ে খনন করা গর্তে পরে মারা যায় শিশু মারজান। এরপর আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে পারেন নি লুতফুন বেগম। 

একসময়ের খড় স্রোতা মনু নদীর তীরবর্তী গ্রাম কটারকোনা। এই গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের আতঙ্ক এখন বালু মহাল। দীর্ঘ একযুগ ধরে নদীগর্ভ থেকে উচ্চ শব্দযুক্ত ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সড়ক, সেতু, নদীবাঁধ, ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি। একসময়ে আশির্বাদ নদী এখন মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্ভোগ। এই বালু সিন্ডিকেটে প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকার কারণে বারবার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে কোন সুফল পাচ্ছেন না গ্রামবাসী। 

সরেজমিনে কটারকোনা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় গ্রামের সড়কে যাতে ট্রাক প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বাঁশ দিয়ে আটকে দিয়েছেন লোকজন। বালু বুঝাই ট্রাক চলাচলের কারণে নদী বাঁধের উপর নির্মিত সড়ক ভেঙে গেছে। যা এখন মানুষের চলাচলে অনুপযোগী। নদীর বাঁধে দেখা দিয়েছে ছোট-বড় গর্ত। দিনরাত অনবরত চলা নদীর ড্রেজার মেশিনের কম্পন আর বায়ূদুষণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেকে। কারো ঘরে দেখা দিয়েছে ফাঁটল। আবার কারো কৃষি জমি বেঙে চলে গেছে নদীতে। পাশ্বেই অবস্থিত নয়াবাজার কৃষ্ণচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। সেখানেও শিক্ষার্থীরা শব্দদূষণের কারণে ঠিকমতো ক্লাস করতে পারেন না। 

সুমন আহমদ বলেন, আমরা গ্রামবাসীর দাবী এই বালু উত্তোলন বন্ধ হোক। এই ব্রিজের খুব কাছ থেকেই বালু তুলা হচ্ছে। যার কারণে ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। 

সুফিয়ান মিয়া বলেন, আমাদের এলাকা থেকে তারা জোরপূর্বক বালু তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের সাথে কথা বলতে গেলে বলে চাঁদাবাজীর মামলা দিবে। ধুলাবালুতে অতিষ্ঠ আমরা। আমার ঘরের সাথেই মেশিন। দিনরাত মেশিনের শব্দের কারণে ঘরে বসা যায় না। 

জুলেখা বেগম বলেন, আমাদের বাচ্চা কাচ্চা চলাচল করতে পারেন না। সবদিকেই আমরা সমস্যাগ্রস্থ। মেশিন রাতেও চলে দিনেও চলে। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চব্বিশ ঘন্টাই যায়। 

আব্দুল গফফার বলেন, আমরা রাস্তাঘাটে চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলিছি। মেয়েরা স্কুলে মাদ্রাসায় যেতে পারেন না। বালুমহালের শ্রমিকরা ইভটিজিং করেন। গাড়ির ড্রাইভাররা মেয়েদের তাচ্ছিল্ল করে। গাড়ি ধাক্কা দিয়ে মানুষদের ফেলে দেয়। বাড়িঘরে বসবাসের অবস্থা এখন আর নেই। 

সুলতান মিয়া বলেন, গত ত্রিশ বছর আমাদের গ্রামের রাস্তায় কোন সংস্কার কাজ হয়নি। এই বালু তুলার কারণে এলাকার শিশুরাও মারা গেছে। তারা যা মনে চায় তাই করছে। কেউ অসুস্থ হলে যে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাবো সেই সুযোগটাও নেই। পুলিশ প্রশাসন নিয়ে ড্রেজার মেশিনে আগুনও ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদের থাকানো যায় না। কদিন পরেই আবার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করে দেয়। 

তালেব আলী বলেন, মেশিনের শব্দে ও কম্পনে আর ঘরে ফেঁটে গেছে। আমার ঘরে পিছনে বালু স্তুপ করে রাখায় সব গাছ মরে গেছে। তারা কোন নিষেধ মানতে চায় না বরং আমাকে আরো হুমকি দেয় মেরে নদীতে ফেলে দিবে। স্কুল-কলেজ, মাদরাসাগামী ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ ভোগান্তিতে এ পথ চলতে হয়। 

ময়মুন বেগম বলেন, আমার ভাতিজি তার ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি এসেছিলো। বাচ্চাটা নদীতে খেলা করতে গিয়েছিলো। বালুর স্তুপের গর্তে পরে মারা যায়। আমাদের এলাকার মানুষ এই বালুর কারণে অতিষ্ঠ। বড়  বড় গাড়ির কারণে মানুষ রাস্তায় চলাচল করতে পারেন না। 

হাজিপুরের কটারকোনা গ্রামের ইউপি সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান রুমেল বলেন, আমি এই রাস্তা দিয়ে দিয়ে যখন নিজেই যাই তখন অনেক কষ্ট হয়। একজন রোগী নিয়েও চলাচল করা কঠিন হয়ে যায়। বালু মহাল আসলে প্রশাসনিক ব্যাপার। সরকার কিভাবে এটা লিজ দিয়েছে সেটা প্রশাসনই ভালো বলতে পারবে। 

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, আমি বিষয়টা সম্পর্কে অবগত আছি। আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করবো। জনগণের যাতে দুর্ভোগ লাগব হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।

আইনিউজ/এমজিএম

 

আইনিউজ ভিডিও 

মৌলভীবাজারে ট্যুরিস্ট বাস চালু

যেসব দেশে যেতে বাংলাদেশিদের লাগবে না ভিসা

সাজেক: কখন-কীভাবে যাবেন, কী করবেন? জেনে নিন বিস্তারিত

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়