Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, সোমবার   ০২ মার্চ ২০২৬,   ফাল্গুন ১৮ ১৪৩২

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫:৪২, ২৮ নভেম্বর ২০২৩

কমলগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত মহারাসলীলা

মহারাসলীলায় পূর্ণিমা রাতে গোপিনী বেশে নৃত্যরত এক মনিপুরী তরুণী। ছবি- আই নিউজ

মহারাসলীলায় পূর্ণিমা রাতে গোপিনী বেশে নৃত্যরত এক মনিপুরী তরুণী। ছবি- আই নিউজ

বর্ণাঢ্য আয়োজনে তুমুল হৈ চৈ, আনন্দ-উৎসাহে ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল আর গোপিনী নাচ দেখার মধ্য দিয়ে শেষ হলো কমলগঞ্জে মনিপুরী সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ উৎসব মহারাসলীলা। হিন্দু ধর্মের অবতার পুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তার সখি রাধারলীলাকে ঘিরে কার্তিকের পূর্ণিমা তিথিতে ঊষালগ্নে সমাপ্ত হয় রাসের কার্যক্রম। 

কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) ভোরে মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আদমপুরে মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব মহারাসলীলার যবনিকা টাকা হয়। 

প্রতিবারের মতো এবারও রাসোৎসবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার ভক্তবৃন্দসহ দেশী-বিদেশী পর্যটকের ঢল নামে। মনিপুরী সম্প্রদায়ের এ বৃহত্তম উৎসব উপলক্ষে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মনিপুরী তাতঁবস্ত্র প্রদর্শনী ও শিববাজার এলাকায় বিশাল মেলা বসে। সোমবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে কমলগঞ্জের উভয়স্থানে রাখাল নৃত্যের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল রাসলীলা। 

সোমবার দুপুর ১২টা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কমলগঞ্জে হাজির হয়েছিল নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা পেশার হাজারো মানুষ। তাদের পদচারণে সকাল থেকে মুখর হয়ে ওঠে মনিপুরী পল্লি। মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে। 

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়া মন্ডপ প্রাঙ্গণে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী, আদমপুরের মনিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্সসহ আরো দুটি মন্ডপ প্রাঙ্গণে মনিপুরী মী-তৈ সম্প্রদায়ের আয়োজনে হয়েছে মহারাসোৎসব।

রাস উৎসব ঘিরে প্রতিবারের মতো এবারও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। বসেছিল রকমারি আয়োাজনে বিশাল মেলা। উৎসবে যোগ দিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার ভক্ত-অনুরাগী পর্যটক এসেছেন এখানে। ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যবনিকার দিকে এগিয়ে যায় গোপিনীদের নৃত্য, একসময় সূর্যোদয় হলে আসর ভাঙে লীলার। ছবি- আই নিউজ 


মাধবপুর (শিববাজার) জোড়ামন্ডপ প্রাঙ্গনে মনিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের উদ্যোগে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরীরা ১৮১ তম বার্ষিকী উপলক্ষে রাতে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। মহারাসলীলা সেবা সংঘের সভাপতি যোগেশ্বর সিংহের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) দেবজিৎ সিংহ। 

সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ ও নির্মল সিংহ পলাশের সঞ্চালনায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি (অ্যাডমিন এন্ড ফিন্যান্স) সৈয়দ হারুন অর রশীদ, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম, পুলিশ সুপার মো. মনজুর রহমান, পিপিএম (বার), কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়নাল আবেদীন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মাধবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আসিদ আলী, মণিপুরি সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনন্দ মোহন সিনহা প্রমুখ।

অপরদিকে, আদমপুর মনিপুরী মহারাস উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে কমিটির আহবায়ক থৌনাওজম নিরঞ্জন সিংহের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিবকবি সনাতন হামোম এর সঞ্চালনায় আদমপুর মনিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গনে মৈতৈ মনিপুরী সম্প্রদায়ের রাস উৎসবের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মনিপুরী রাসোৎসবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন। 

রাখাল নৃত্যরত মনিপুরী বালকেরা। ছবি- আই নিউজ

রাখাল নৃত্যরত মনিপুরী বালকেরা। ছবি- আই নিউজ


অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব সত্যজিত কর্মকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম, কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়নাল আবেদীন, ভারতের মণিপুর রাজ্যের রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্র কালচারাল ফাউন্ডেশনের ট্রেজারার তখেলম্বম ইরাবত, মুতুয়া মিউজিয়াম এর পরিচালকমুতুয়া বাহাদুর।

মনিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ জানান, মাধবপুর জোড়ামন্ডপ রাসোৎসব সিলেট বিভাগের মধ্যে ব্যতিক্রমী আয়োজন। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার আগমন ঘটে। বর্ণময় শিল্পসমৃদ্ধ বিশ্বনন্দিত মনিপুরী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবে সবার মহামিলন ঘটে। রাত ১২টার দিকে শিববাজারের জোড়াম-পে (পরস্পর সংলগ্ন তিনটি ম-পে) এবং অন্যদিকে তেতইগাঁওয়ে সানা ঠাকুরের ম-পে (বর্তমানে সেখানেও দুটি ভিন্ন মঞ্চে রাস হচ্ছে) শুরু হয় এই উৎসবের মূল পর্ব মহারাস। মনিপুরীদের রাসলীলার অনেক ধরন। নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, বসন্তরাস, মহারাস, বেনিরাস বা দিবারাস। শারদীয় পূর্ণিমা তিথিতে হয় বলে মহারাসকে মণিপুরিরা পূর্ণিমারাসও বলে থাকে।

মনিপুরী অধ্যূষিত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আদমপুরে আশ্বিন মাসের শেষ ভাগেই উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। উপজেলার মণিপুরি সম্প্রদায়ের লোকের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও মেতে ওঠে একদিনের এ আনন্দ উৎসবে।  

May be an image of 6 people and crowd


উল্লেখ্য, মনিপুরীদের প্রধান উৎসব রাসপূর্ণিমা বা রাস উৎসব শরতের পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়। তার আবেদন ধর্মের সীমানা ভেঙে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে কাছে টেনে নিয়েছে। উপজেলার মাধবপুর শিববাজারে মনিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়ের (জোড়াম-পে) ১৮১ তম বছর এবং আদমপুরের তেতইগাঁওয়ে মনিপুরী মৈতৈ সম্প্রদায়ের ৩৮ বছর ধরে মনিপুরীদের রাস উৎসব উদ্যাপিত করে আসছে। রাস উৎসবের দুটি পর্ব। দিনের বেলায় রাখালরাস আর রাতে মহারাস অনুষ্ঠিত হয়।

রাখালরাসের ম-লী বা মঞ্চ মাঠের মাঝখানের ভূমি সমতলে হয়ে থাকে, যাকে ঘিরে বৃত্তাকারে কলাগাছের বেষ্টনী। চারদিকে বসে মেলা। দেশের নানা জায়গা থেকে সওদাগরের দল এই এক দিনের জন্য আগের দিন থেকে এসে পসরা সাজায়। সঙ্গে থাকে মণিপুরিদের পোশাক, হস্তশিল্প, বইপুস্তক। রাখালরাস শেষ হয় গোধূলিবেলায়। কৃষ্ণ তাঁর গোপ সখাদের নিয়ে গরুর পায়ের খুরে রাঙা আলোয় ধূলি ওড়াতে ওড়াতে ঘরে ফিরে আসেন। রাখালরাস শেষেই কিন্তু দিনের মেলা সাঙ্গ হয় না। লোকজনের কেনাকাটা, গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া চলতে থাকে। তারপর উন্মুক্ত মঞ্চে রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলেঅচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হয়, আধুনিক গান-নাচ-নাটক, এসবও বাদ যায় না।

পরম আরাধ্য এক সত্তার সঙ্গে মানুষে প্রেমাকুল আত্মার মিলনকে গীত-নৃত্য-বাদ্য-যন্ত্রসহযোগে প্রকাশ করার এক পরিবেশনা শিল্প রাস। শ্রীমদ্ভাগবত, চৈতন্যদর্শন কিংবা বৈষ্ণবীয় সহজিয়া ধারার দর্শনের সীমা ছাড়িয়ে যা মনিপুরী জনপদের নিজস্ব শিল্প প্রকাশরীতির সঙ্গে মিলেমিশে নতুন এক অবয়ব নিয়েছে। আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যাপিত জীবনের বেদনা ও অনুভূতি যেখানে স্পন্দিত হয়ে ওঠে।

মণিপুরে রাসলীলা প্রবর্তনের একটি গল্প প্রচলিত আছে। মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র যখন কাঞ্চিপুর নামের এক অঞ্চলে বাস করতেন, তখন এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন, শ্রীকৃষ্ণ নিকটবর্তী ভানুমুখ পাহাড়ে কাঁঠালগাছ হয়ে রাজার জন্য অপেক্ষা করছেন। পরদিনই রাজা সেই পাহাড়ে গিয়ে কাঁঠালগাছ খুঁজে পেলেন। গাছটি কেটে রাজধানীতে আনা হলো। রাজধানীর খ্যাতনামা শিল্পীকে রাজা তার স্বপ্নে দেখা কৃষ্ণমূর্তির অনুকরণে কাঠের মূর্তি গড়তে আদেশ দিলেন। এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষেই তিনি ওই বছর অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা পূর্ণিমাতে মহারাসলীলা উৎসব প্রবর্তন করেন। মেয়ে বিম্বাবতীও সেই রাসে অংশ নেন। 

ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭৭৯ সালে। রাসলীলার গানগুলো বিখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা জয়দেব, বিদ্যাপতি, চ-ীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখের পদাবলি থেকে সংগৃহীত। বাংলা, ব্রজবুলি, মৈথিলি ও সংস্কৃত ভাষার পদ সংকলিত হলেও সাম্প্রতিক কালে মনিপুরী ভাষাতেও (বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ) রাসলীলার পদ বা গান রচিত হচ্ছে।

সবশেষে রাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপের আরতি করা হয়। কিন্তু পরমাত্মা কৃষ্ণ তো জীবাত্মা রাধার সঙ্গে চির-একাত্ম হতে পারেন না। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র মতো তার আসা-যাওয়ার লীলা। তাই নিশান্তে কৃষ্ণের বচনানুসারে রাধা ও গোপিণীরা নিজ নিজ গৃহে ফিরে যায়। এই প্রত্যাবর্তন গভীর বেদনাবহ, পরমপুরুষের বিচ্ছেদের সুরে ঘেরা। রাধার চোখের জলে ফেরার সে পথ ধোয়া। রাসলীলায় কৃষ্ণসঙ্গ লাভের এই একটি রাত রাধার জীবনে একটি কালেরই প্রতীক, যার আঁধারে প্রতিটি বৈষ্ণব খুঁজে চলে পরমসত্তাকে অনুভবের স্পন্দন। তার আঁচ নিয়ে ভোরবেলা ভক্তবৃন্দ ফিরতে থাকে নিজ নিজ ঠিকানায়।

আই নিউজ/এইচএ 

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়