ঢাকা, রোববার ০৯ আগস্ট ২০২৬,   শ্রাবণ ২৫ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:৫১, ৯ আগস্ট ২০২৬

স্ক্রিন ছেড়ে বইয়ে ফিরছে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষার্থীরা

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

টিফিনের বিরতিতে শ্রেণিকক্ষে বসে কয়েকজন শিক্ষার্থী। কারও হাতে সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে, কারও হাতে জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম। কেউ আবার পড়ছে জুল ভার্নের অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ। স্কুলের টিফিন সময়ে হালকা নাশতা শেষে যেখানে খেলাধুলা ও আড্ডায় মেতে ওঠার কথা, সেখানে অবসর সময়টুকু বই পড়েই কাটাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় এমনই চিত্র। শুধু এ বিদ্যালয় নয়, উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত বইপড়া উৎসবে অংশ নিচ্ছে।

পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, ইতিহাস ও বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন এ উদ্যোগ নিয়েছে। উৎসবের সমন্বয় সহযোগী হিসেবে রয়েছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব এবং পাঠ সহযোগী হিসেবে রয়েছে উত্তরণ।

শিক্ষকদের মতে, এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার একটি কার্যকর উদ্যোগ। একটি-দুটি বই পড়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস ও বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

১৪টি বই নিয়ে পাঠের আয়োজন
আয়োজকরা জানান, ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব-২০২৬-এ ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি (পাস) ও অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের ১৪টি বই নির্বাচন করা হয়েছে।

নির্ধারিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনের আবিষ্কারের নেশায়, ড. এ. পি. জে. আবদুল কালামের উইংস অব ফায়ার, শাহেদ আলীর জিবরাইলের ডানা, জুল ভার্নের অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ, হুমায়ুন আজাদের লাল নীল দীপাবলী বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী, জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন, কাজী নজরুল ইসলামের মরু-ভাস্কর ও মৃত্যুক্ষুধা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাশিয়ার চিঠি, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে, জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন, আনোয়ার পাশার রাইফেল, রোটি, আওরাত এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক।

এ ছাড়া উন্মুক্ত বিভাগের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের রাজবন্দীর জবানবন্দী।

তিন ধাপে প্রতিযোগিতা

নির্ধারিত বই পড়ে তিন ধাপে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের পাঠকদের জন্যও রাখা হয়েছে উন্মুক্ত বিভাগ।

উৎসবের প্রথম ধাপের নাম ‘মুকুল পর্ব’। এতে উপজেলার ৩৮টি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে। প্রতিটি শ্রেণির জন্য দুটি করে বই নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে একটি বই বেছে নিয়ে পড়ছে।

আগামী ১৭ আগস্ট নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে মুকুল পর্বের পরীক্ষা। প্রতিটি শ্রেণি থেকে সেরা ১০ জন শিক্ষার্থী দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল পর্বে’ অংশ নেবে। এই পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৩০ ও ৩১ আগস্ট।

পরে প্রতিটি শ্রেণির সেরা তিনজন শিক্ষার্থী উপজেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত ধাপ ‘ফল পর্বে’ অংশ নেবে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে এ পর্ব। চূড়ান্ত পর্বে প্রতিটি শ্রেণির সেরা পাঠকদের জন্য রয়েছে ল্যাপটপ, বই, ক্রেস্টসহ বিভিন্ন পুরস্কার।

‘বই পড়ে বিশ্বের নানা দেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে’

ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রেদোয়ান চৌধুরী বলেন, “এবারের বইপড়া উৎসবে আমাদের জন্য মুহম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন’ বইটি নির্ধারণ করা হয়েছে। বইটি পড়ে প্রায় ৫০ বছর আগের ইংল্যান্ডের সমাজ, মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। এ ধরনের বই শুধু তথ্য দেয় না, বিশ্বের নানা দেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহও তৈরি করে।”

আরেক শিক্ষার্থী কেয়া চন্দ বলেন, “বই পড়তে এখন ভালোই লাগে। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বইয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। আমার জন্য নির্ধারিত বইটি পড়েছি। যেহেতু এই বইয়ের ওপর প্রতিযোগিতা, তাই বারবার পড়ছি। সহপাঠীদের সঙ্গে বইয়ের গল্প নিয়েও কথা বলছি। এখন থেকে স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে নিয়মিত পড়ব।”

‘মোবাইলের কারণে কমেছে বই পড়ার প্রবণতা’

ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অয়ন চৌধুরী বলেন, “আমি ১৯৯৬ সাল থেকে শিক্ষকতা করছি। তখন শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই নিত। এখন লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, কিন্তু বই নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। এর অন্যতম কারণ মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ।”

তিনি বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনছে। এখন তারা নির্ধারিত বইয়ের পাশাপাশি লাইব্রেরিতে এসে অন্য বইও খুঁজছে। এটি বই পড়ার সংস্কৃতি ফিরে আসার একটি ইতিবাচক লক্ষণ।”

অয়ন চৌধুরী আরও বলেন, “এখনো অনেক অভিভাবকের ধারণা, পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়লে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। বাস্তবে সাহিত্য ও অন্যান্য সৃজনশীল বই পড়লে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, ভাষা ও বিশ্লেষণক্ষমতা বাড়ে, যা সৃজনশীল পরীক্ষাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”

‘এটি শুধু প্রতিযোগিতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ’

শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসবের প্রধান সমন্বয়ক ও শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসবের নির্বাহী পরিচালক দেবাশীষ দাশ বলেন, “মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। সেই বাস্তবতা থেকেই ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ প্রতিপাদ্যে এ আয়োজন। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ২০ মিনিট হলেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও বিশ্বসাহিত্যের বই পড়ুক।”

তিনি বলেন, “এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। আমরা চাই, তারা বই পড়ে নিজের মতো করে ভাবুক, আলোচনা করুক এবং বইয়ের সমালোচনা লিখুক। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় শ্রীমঙ্গলে বই পড়াকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে চাই।”

‘তরুণদের আবার বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনতে চাই’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “এ বছর শ্রীমঙ্গলের ৩৮টি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ‘বই পড়ি, মন গড়ি’ প্রতিপাদ্যে বইপড়া উৎসব আয়োজন করেছি। আমাদের লক্ষ্য পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।”

তিনি বলেন, “সে উদ্দেশ্যেই আমরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করছি। শুরু থেকেই তারা উৎসবটি উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। তারা বই কিনছে, পড়ছে, পাঠচক্র গড়ে তুলছে এবং বই বিনিময় করছে।”

ইউএনও আরও বলেন, “বর্তমান সময়ে তরুণদের বড় একটি অংশ স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়েছে। আমরা চাই, তারা আবার বইয়ের জগতে ফিরে আসুক। একটি-দুটি বই হয়তো কাউকে বদলে দেবে না, কিন্তু নিয়মিত পড়ার অভ্যাস একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে। জ্ঞান হোক শক্তি, পাঠ হোক সংস্কৃতি, এই বিশ্বাস থেকেই আমরা শ্রীমঙ্গলে বই পড়াকে একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে চাই।”

ইএন/এসএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়