ঢাকা, সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৬ ১৪২৭

স্বপন নাথ

প্রকাশিত: ০১:৪৩, ৭ আগস্ট ২০২০
আপডেট: ০২:২১, ৭ আগস্ট ২০২০

হ্যারিসন রোডের আলো আঁধারি

মনরে কৃষি কাজ জানোনা...
এমন মানবজমিন রইল পতিত
আবাদ করলে ফলতো সোনা।।

অতি তুচ্ছ বিষয়ও শিল্প সাহিত্যর প্রাণভোমরা হয়ে ওঠে; তা দেখালেন কবি একরাম আলি। তিনি রামপ্রসাদের সুরে চাষাবাদ জানেন বলেই, তা সম্ভব হয়েছে। তাঁর মেসজীবনের অভিজ্ঞতায় তৈরি হলো হ্যারিসন রোড (২০২০)-এর কথামালা। নামকরণ দেখে ভাবিনি এমন চমৎকার গদ্যের একটি বই হতে পারে। পাঠ করতে বসে আর বিরতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমন আনন্দময় বই হবে প্রথমে না ভাবলেও অবশেষে এর স্বীকৃতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। যে কোনও পাঠক ভাবতেই পারেন- বইটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। বিষয়কে আবিষ্ট করে তোলার যে মুনশিয়ানা, তা-ই পাঠককে ধরে রাখে। কখনও তিনি নিজেও বলেন, চাই লেখকের নিজস্ব ভাষা।তা না হলে লেখা হয় না। আমরা লক্ষ করি হ্যারিসন রোডে বিচিত্র জীবনের বিচিত্র রঙ।

প্রসঙ্গত,১৯৫০ সালের ১ জুলাই পশ্চিমবাংলার বীরভূমে জন্মগ্রহণ করেন কবি একরাম আলি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামে, যৌবনে কলকাতায়। এখন স্থিত হয়েছেন কলকাতানগরেই। তিনি মূলত কবি হিসেবে অধিক পরিচিত। তবে গদ্যেও চমৎকার শিল্পী, তা স্বীকার করতে হয়।

কবি একরাম আলির অন্য রচনাগুলো হলো:  কাব্য : অতিজীবিত (১৯৮৩), ঘনকৃষ্ণ আলো (১৯৮৮), আঁধারতরঙ্গ (১৯৯১), বাণরাজপুর (২০০০), একরাম আলির কবিতা (২০০১), একরাম আলি-র শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৮), প্রলয়কথা (২০০৯), আঁধার পরিধি (২০০৯), বাউটির কবিতা (২০১৪), কবিতা সংগ্রহ (২০১৭), বিপন্ন গ্রন্থিপুঞ্জ(২০১৭)। গদ্য : মুসলমান বাঙালির লোকাচার (২০০৬), অ্যাপোলোর পাখি (২০০৮) এবং স্মৃতিকথা : ধুলোপায়ে (২০১৫)। জীবনীগ্রন্থ : অতীশ দীপঙ্কর (১৯৯৭), উপন্যাস :দিগন্তেরএকটুআগে(২০১৫)।

হ্যারিসন রোড, মেসজীবনের সংশ্লিষ্টতা মিলিয়ে এ যেন এক আত্ম-আবিষ্কারের নিকষিত নির্যাস। নিজেকে ও নিজের ছায়াকে খোঁজ করতে যাওয়া। অবশেষে সুফি-সাধকদের আলোকেই তাঁর নিজস্ব সংলাপ।‘মানুষের সেরা আবিষ্কার হয়তো-বা ঈশ্বর।এবং আত্মা। ঈশ্বর এবং আত্মার সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য নয়, মানুষই সেই গূঢ় কথাটি সামনে এনে খুঁটিয়ে দেখতে চেয়েছে।… অনেকের মতো আমিও সর্বস্ব ঘেঁটে আমার আত্মাকে খুঁজে পাইনি। কিন্তু আত্মা না-থাকলে আত্ম যে থেকে যায়।… এই আত্মকে পেয়েছি আমি পেয়েছি ব্যক্তি-আমিতে।’ [দেশ: ১১১]

তাঁর পাঠকৃতির ভেতরে প্রবেশ করে দেখি এসব তো আমাদেরই কথা। আমরা তো ফিরেও তাকাইনি অবহেলারদিকে। তবে কীভাবে এসব নিয়েই তিনি গড়ে তোলেন তাঁর পাঠকৃতি। ওখানেই লেখক একরাম আলির কৃতিত্ব। বস্তুত, এ-বইকলকাতা নগরস্থ হ্যারিসন রোডের বহুস্বরিত অবয়বেরই ভাষ্য। সামান্য বিষয়কে তিনি হৃদয়জ করেছেন ভাষার বুননে। গ্রন্থিত ৩২টি চূর্ণ শিরোনামায় বিভিন্ন তাল-লয়ের জীবন ও ঘটনার বিস্তার। অঙ্গীকৃত হয়েছে অনেক কিছু। মূলত, জীবনকে দেখার তাঁর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। এগুলো আমরা প্রতিদিনই এড়িয়ে যাই। তাঁর চোখ এড়ায়নি। প্রথমত, মেস জীবন এবং এর সাথে জড়ানো স্মৃতিগুলো মনে হবে বেদরকারি। একরাম আলি যেভাবে ভেবেছেন, স্মৃতিচারণ করেছেন, তাতে কাল ও বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেস, মেসের সামাজিকতা এবং খানাখন্দকে গড়াগড়ি দিয়ে হয়ে ওঠাজীবন, ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, মেস সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা:

(ক) ‘সত্তর দশকে মেস ছিল জবরদস্ত এক প্রতিষ্ঠান। অন্তত কলকাতায়। যেমন স্কুল, জেলখানা, হাসপাতাল বা ধর্মশালা।…ইংরেজি এই শব্দটির সমান বয়সী পাথর থাকলেও দুনিয়ার কোথাও গাছ থাকার সম্ভাবনা বেশ কম। কিন্তু ইংরেজি বা অন্য আধুনিক ভাষাগুলো তো বলতে গেলে বহু ভাষার ল্যাজাসমষ্টি। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এদের নানা রকমের মুড়ো আজও নড়ছে নানা ভাষার জলাশয়ে। যেমন : mess ইংরেজি এই পাঁকাল শব্দটি কয়েক শতাব্দী ফরাসি গর্তে মাথা ঢুকিয়ে দিব্যি রয়ে গেছে। প্রাচীন ফরাসিতে সে mess। মানে দাঁড়াচ্ছে- এ পোর্শন অফ ফুড।’  [গোধূলিসন্ধির নৃত্য : ১৫১]

(খ) ‘মেসগুলি ছিল স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, দোকানপাট, ঘিঞ্জি বাজার আর পরিবার-আবদ্ধ কলকাতার মাঝখানে শেষ পর্যন্ত আশ্রয়হীনদের কয়েকটি মুক্ত দ্বীপ যেন।’ [গোধূলিসন্ধির নৃত্য: ১৫৩]

(গ) ‘হ্যারিসন রোড ধরে হাঁটছি। হাতে সস্তার সিগারেট। সস্তা ধোঁয়া। ফুটপাতের এখানে-ওখানে ঘুমন্ত মানুষজন। যে-ঘুম সস্তা-দরে কেনা, সে-ঘুম হুটহাট ভাঙবেই। ফিরছি এমন একটা মেসে, যেখানে মেদিনীপুর শ্রীরামপুর নদীয়া পুরুলিয়া বীরভূম থেকে গত কয়েকবছর কত-যে সমবয়স্করা এসেছে। রাত কাটিয়েছে কেউ। গ্রীষ্মের ছাদ থেকে আড্ডা গড়িয়ে নেমে গেছে ট্রামলাইন পেরিয়ে ওপাশের নীচু আর গভীর রাতের ছাদে। [প্রস্থানপর্ব : ১৩৭]

বলা বাহুল্য যে, তাঁর অসামান্য বর্ণনাভঙ্গি এবং ঈর্ষনীয় গদ্যশৈলী। যা পাঠককে নিয়ে যায় ভিন্ন এক আবেশের বৃত্তে। তাঁর বর্ণনা পড়তে পড়তে কখনও মনে হয়, কবিতা পাঠ করছি কি না। অনন্য গীতল বর্ণনার সুরালোক। মূলত, তাঁর রচনায় বাইরে গদ্য, ভেতরে কবিতা। এমন গদ্য নির্মাণ, তিনি কবি বলেই সম্ভব হয়েছে। মাঝে মাঝে ইঙ্গিতময় ভাষা আমাদের ভাবায়।তাঁর গদ্যে অসামান্যউপমা, রূপক ও চিত্রকল্পের নির্মিতিতে অবাক হতে হয়। তবে দুর্বোধ্য নয়। ভাষার পেলবতা ছাপিয়ে যায় হ্যারিসন রোডের আগা-পাঁচতলা। কত সহজ, তবে নিগূঢ় কথা। এ প্রসঙ্গে দু-একটি অংশ উপস্থাপন করা যেতে পারে।

(ক) ‘রাতের অনেক নীচে যেখানে লতাগুল্ম, অচেনা রাতপোকারা ঘুরে বেড়ায়, সেখানে অগ্নিপীঠে বসে আছে এক রাতমাসি। কানে কানপাশা, নাকে ভারী নথ। ঝলকানি মেরে অনবরত সে উসকায়। ফিসফিসিয়ে বলে- আরেকটু আরেকটু জাগো। অপেক্ষা করো ‘ [অতিথি : ৮৬]

(খ) ‘এক সময় জঙ্গল ফুরিয়ে এল। বিকেলও। আমাদের চড়াই ভাঙাও শেষ। সামনে মালভূমির মতো উঁচুনীচু প্রান্তর। সেই প্রান্তরে ভাস্কর্যের মতো একেকটা গাছ। শাল, মহুয়া, পলাশ। সূর্যাস্তের আগে হাজার হাজার টিয়ার চঞ্চলতা। শুরু হল পাইনের বন। আর তার ফাঁকে বনদপ্তরের নতুন বাংলো।’ [পুরুল্যা পুরুলিয়া: ৯৬]

(গ) ‘রাত অনেক। বারান্দায় দাঁড়ালে ড্রিল ক্লাসের মতো সারবন্দী রাস্তার আলো। মাঝেমধ্যে গাড়ির হেডলাইট। …মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণি তাই আলোতে বিশ্বাস করেনি। প্রকৃতি মূলত অন্ধকার। তার বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষ অগণন নক্ষত্রের উসকানিতে আলোকে মহীয়ান করেছে।…কিন্তু সংশয়ের আগুন এসে গ্রাস করলে? যেদিন কেউ দাবি করে- আলো তারই, স্বত্বাধিকারী সে একা, ডানার নরম-রঙিন পালক সেদিন পুড়ে ছাই হয়ে যায়।’ [গোলদিঘি: ১২০-১২১]

আমি ব্যক্তি-পাঠক এ জন্য হ্যারিসন রোড-এর মোহে আসক্ত হয়ে পড়ি। হ্যারিসন রোড পাঠকের সাথে প্রেম তৈরি করে নেয়। মনে হয় আমরাও এ হ্যারিসন রোডের বাসিন্দা। কীভাবে যে তৈরি হলো এ হ্যারিসন রোড-এর লেখাগুলো। এ নিয়ে লেখক তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন। এছাড়াও বইয়ের প্রথম ফ্ল্যাপে যা বলা হয়েছে।

‘গ্রাম থেকে পড়তে-আসা এক তরুণ কবির আশ্রয় হল কলকাতার এক মেস। গত শতকের সত্তরের দশক তখন। নানারকমের ছাত্র, কেরানি আর অফিসবাবুদের আস্তানা সেই মেস। মেসের একেক চরিত্রের একেক স্বপ্ন। …প্রকৃতপক্ষে এ–গ্রন্থ সত্তর দশকের বাংলা কবিতাসমাজের চিত্রসমষ্টি। হাওড়া স্টেশন আর শিয়ালদার সংযোগকারী রাস্তা যেমন হ্যারিসন রোড, তেমনই সেই সময়ের মেস আর বাংলা সাহিত্যসমাজের সংযোগ ঘটিয়েছে আশ্চর্য গদ্যে লেখা এই স্মৃতি-আলেখ্যটি- হ্যারিসন রোড।’

আমরা পাঠক হিসেবে তা-ই মনে করি। মেস জীবনের শত স্বপ্নকে নিয়ে লেখক বুনেছেন মালা। এর সাথে সংযোজিত হয়েছে বহুবর্ণিল জীবনের কথকতা। আছে হ্যারিসন রোডের গলি-ঘুপচির প্রচ্ছন্ন কাহিনি। বোঝা যায়, যেখানে তিনিশুধু মেসের একজন আবাসিক সদস্যছিলেন না, ছিলেন নিবিষ্ট দর্শক ও পাঠক। এমন গভীর দৃষ্টি না থাকলেবিভিন্ন ধরন, চরিত্রের জীবনকে পরখ করা সম্ভব হত না। তিনি জীবনের সূক্ষ্মতাকে পাঠ করেছেন। সেখানে বসবাসের বদৌলতে পরিচয় ঘটে নানা মনীষী, খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সাথে। সবকিছু তাঁকে বিস্মিত করেছে। এ বিস্ময়, বেদনা ও কষ্টের মধ্যে আনন্দময় প্রাণশক্তি, যা-কিছু, তিনি প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে বিবেচনা করেন। ‘জন্ম মৃত্যু বিবাহ বিচ্ছেদ বন্ধুত্ব মনখারাপ আর তুচ্ছ কোনো উপলক্ষ্যে হইহই উচ্ছ্বাস- একটা ঘরের চার দেওয়ালে এত কিছু আঁটিয়ে নিতে এবং ঘর ফাটিয়ে মুক্ত হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে পারা যে সম্ভব, ধারণার বাইরে ছিল। সমস্ত প্রতিবন্ধকতা এখানে ভূত। নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার অদম্য এক উৎসাহ। আমাদের বাড়ির ছাদে ছোট্ট হলেও হলেও জেদি অশ্বত্থ গাছটার মতো। বারবার কেটে ফেলা  হত, বারবার চারা গাছটায় পাতা গজাত। কী যে প্রাণশক্তি। [বকুলবাগান : ৭৮]

কলকাতা জীবন, মেস বানাগরিক জীবনের উৎপাত তাঁকে আহত করেছে কখনও কখনও। তবে সবই তো জীবনের এড়িয়ে না-যাওয়ার উপকরণ। এসব উপকরণ তাঁর জীবনাভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে জমেনি শুধু, সক্রিয় রয়েছে এখনও। কারণ, তাঁর লক্ষ ছিলো ভিন্নতর, যা সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মেলে না। অর্থাৎ, তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো জীবনের অতল সন্ধান। যেক্ষেত্রে জীবনের কত বিচিত্র তল বিদ্যমান। তাঁর ইচ্ছা ছিল এমনই- : ‘এই শহরে আমি শুধু ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসিনি, আসিনি কফি হাউসের টানে। এমনকী কলকাতা-নামের কোনো আজব শহরেও আসতে চাইনি। এসেছিলাম এক বিরাট নগরীর বিলুপ্ত আর বহমান ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো পড়তে, যে-নগরীর রাস্তায় পৃথিবীর অতীত আর বর্তমান নগরসমষ্টির ধুলো মিলেমিশে আছে।‘ [একতলা, দোতলা, তিনতলা: ২৭]

বস্তুত, এ যান্ত্রিক নগরেও একরাম আলি সাধারণ মানুষের জীবন কামনা করেছেন। তবে তা যেন রুচি ও নান্দনিক আবহে পূর্ণ হয়। এ-চাওয়া তাঁর ব্যক্তিগত হলেও তা সামষ্টিক স্বপ্নেরই অংশ। আমরা জীবনকেবৈষয়িক গণ্ডির বাইরে রাখতে পারি না। যে বৃত্তে নান্দনিকতা, শিল্পবোধ অনুপস্থিত। তবুও এ বৈষয়িক ধারাপাতের সাথে সৌন্দর্যবোধের সমন্বয় হলে জীবন হয় সতেজ ও আনন্দময়। ফলে, চেয়েছেন সহমর্মী মানুষের সঙ্গ। অন্তত যাতে সাধনার জীবন লব্ধ হয়। যাদের সাথে প্রকৃতি, সৃজন, মনন ভাবনা ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করা যায়। কেননা মহৎ সাহিত্যের প্রভাবে নিজেরও ভূমি নির্মাণ করা সম্ভব। এমন সংবেদনা তাঁর চেতনায় লক্ষ করি : ‘তাই, এমন কোনো ভূখণ্ডে থাকতে চেয়েছিলাম- যত গরিব আর অবহেলিত হোক না কেন সে-ভূখণ্ড, কবিতার ধারাবাহিকতা থাকবে সেখানে। থাকবে এমন দু-চারটে উপন্যাস।’ [কলকাতার কিহোতে: ১১৯]

দীর্ঘ পরিভ্রমণের পর স্বীয় দৃষ্টিতে কলকাতা মহানগরের এক ছবি আঁকেন একরাম আলি। এটাকে বলা যায় তাঁর অভিজ্ঞতার সারাংশ। এ ছাড়াও তাঁর সমকালকে দেখে তিনি আগামীর কলকাতা সম্পর্কেও ভাবেন। একইসাথে উত্তর কলকাতার রসিকতাও তোলে আনেন- ‘কলকাত্তামে বহোত বঙ্গালি হো গায়া।’ যে বিষয়ে সকলেই ওয়াকিবহাল, কিন্তু সচেতন নয়। মূলত, উপনিবেশে গড়ে ওঠা আর উপনিবেশোত্তর কলকাতাকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। অবশেষে প্রশ্ন জাগে তিনি কি তাহলে মোহভ্রষ্ট হয়েছেন?তবে এসব ক্রোধ নয়, নিতান্ত বেদনার কথা। হয়তো জমাটবাধা কষ্ট, মেঘাচ্ছন্ন হৃদয়ে তিনি বলেন,- ‘…সেদিন দূরে নয়, যেদিন পর্দা সরিয়ে দেখতে হবে- কদাকার, হিংস্র নষ্ট এক শহরের ছবি। ধারালো চোখের কোণে রক্তবিন্দু। নিরুপায় তার বুকে সেদিন ছুরি বসিয়ে দিতেই হবে। একটা আর্তনাদ। আশেপাশের রাস্তা থেকে কেউ জানতে চাইবে- কীসের আওয়াজ? তারা ভিতরে ঢুকবে। দেওয়ালের প্রাচীন ছবিটিকে নামাবে। দেখবে, শত দীনতা সত্ত্বেও সেটি ঝলমল করছে। ওদিকে ছুরিবিদ্ধ হয়ে মেঝেয় পড়ে আছে হালের অতিবৃহৎ, কদাকার এক শহর। শুধু ভিক্টোরিয়ার পরিটি তখনও ঘুরছিল। না-হলে কেউ চিনতেই পারত না এই শহরটাকে।’ [কলকাতা: ১৩২]

তিনি কি তাহলে কলকাতায় আউটসাইডার ছিলেন? হ্যাঁ, অংশত তিনি আউটসাইডারই বটে। যে বয়সে তিনি কলকাতা মহানগরে প্রবেশ করেছেন। সে সময় তিনি একেবারেই আনকোরা তরুণ। বিস্ময়ভরা চোখে অবলোকন করেছেন মানুষ, জীবন, রিরংসা, হিংসা, টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব, প্রেম-ভালোবাসা, স্বপ্ন দেখা তারুণ্যএবংঅসংখ্য স্বপ্নের অপমৃত্যু। বড় কঠিন অথচ মায়াময় নগরীর চাকচিক্য। যত কষ্ট হোক এ বেড়ে ওঠার স্মৃতি কখনও বিকৃত হয় না। তাঁর কথনে- ‘মানুষ যে মাটিতে জন্মায়, বেড়ে ওঠে, আছাড় খেয়ে-খেয়ে তার স্মৃতির সুতোগুলো ঝড়ঝাপটায় উড়তে উড়তে ক্রমশ দূরে সরে যায়, ফিরেও আসে কোনো-কোনো নাছোড়বান্দা সুতো- সেইসব স্মৃতি জীবনে আর সঞ্চিত হয় না। কেননা সেইসব ক্ষণস্মৃতিকে পূর্ণতা দিতে সঙ্গে থাকে পৃথিবীর প্রথম বিস্মৃতিগুলো। এই সব বিস্মৃতির পরপারে থাকে কি মায়া? কলকাতায় এসে তবু সেই অসম্ভব চেষ্টা আমার ছিল। বোকার মতো। অচেনা একটা শহরকে কোন উপায়ে আবিষ্কার করতে হয়, যাতে শহরটা হয়ে যাবে নিজের, জানব কী করে! অথচ, আড্ডায় দুনিয়াজোড়া ডায়াগ্রাম ফেলা থাকত সদ্য-বন্ধুদের টেবিলে। ফিল্ম, ভারতীয় এবং পাশ্চাত্ত সঙ্গীত, বিদেশী সাহিত্য, দেশী-বিদেশী রাজনীতি, এমনকী পাতি হিন্দি সিনেমা।’ [দ্য আউটসাইডার: ২৯]

স্মরণীয়, আমরা অনেকেই একসময় মেস আশ্রয়ী ছিলাম। তবে মেসের আবাসিক কোনও ছাত্র বা ব্যক্তিবাস্তবতাকে এভাবে দেখেনি কখনও।নাগরিক জীবনের অনেক স্মৃতিও আমরা পাঠ করি। কিন্তু এভাবে লেখা রোমন্থন এখনও দৃষ্টিগোচর হয়নি। তাঁর নির্মিত বিবরণঅতি টুকরো বিষয় হলেওভাষার শক্তিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে।যেন আবার আমরা হ্যারিসন রোডে তাঁর সাথে ভ্রমণ করছি। একরাম আলি যা দেখেছেন,এর সাথে যুক্ত করে নিয়েছেন নিজেকে।যেভাবে তিনি শুরু করেন, তাঁর দেখা। ‘বিশাল জংশন স্টেশন।… গাঁ-গঞ্জ ঝেঁটিয়ে-আসা ধুলোমলিন ট্রেনটাকে তখন ঘিরে ধরে কুলির দল, রকমারি হকার, দোকান, হাজারো যাত্রী, কালো কোটের ধুরন্ধর টিকিটচেকার, ভিখিরি, রংবেরঙের নানান সাইনবোর্ডের কোনোটাতে বিকটযৌবনার আবক্ষ আবেদন, মুহুর্মুহু ট্রেনের ঘোষণা আর ভারী হাওয়ায় সবকিছুর দলা-পাকানো প্রকাণ্ড একটা শব্দ।’ [চুয়াল্লিশর তিন: ১১]

মেসের ব্যবস্থাপনা যেভাবে থাকে, সেখানেও মেসের মাত্র একটি জানালাই ভরসা। বদ্ধ আবাসনের এ জানালা দিয়েই তিনি দেখেন প্রকৃতি, নাগরিক কোলাহল, আর নগরের সামান্য অংশ। অবশেষে তিনি এ জানালার ভিন্নার্থ আবিষ্কার করেন। এ বদ্ধ চিলোকোঠায় আন্দাজ নয়, তিনি উপলব্ধি করেন হারানো, জমাটবাধা স্বপ্নের পরিণাম। ‘বুঝলাম, জানালা মানে সব সময় আলো-হাওয়া আসার পথ নয়। জানালা কখনও নিরেট দেওয়ালে একটা আয়তনও হতে পারে। দেওয়ালের এই অংশটি খুললেও উলটোদিকে দেওয়ালই দেখা যায়, সঙ্গে গুমরে ওঠে চারকোনা হতাশা।’ [প্রাগুক্ত: ১৪]

লেখায় বাদ পড়েনি মেস ম্যানেজারের যুগপৎ সরল ও জটিল চরিত্র। তাকে অনেককিছু সামলাতে হয়। রান্না, বাজারসহ নানাবিধ কাজ। ম্যানেজারমনযোগ দিয়ে পড়েন আনন্দবাজার পত্রিকা। তার কাছে এ যন এক ধর্মগ্রন্থ। এছাড়া রয়েছে নানা বিষয়ে তারদক্ষতা ও কৃতিত্ব।

একবার একরাম আলি তাঁর গ্রামের বাড়ি থেকে কলকাতায় ফিরছেন। সেদিন হাওড়া স্টেশনে সাক্ষাত হলো জাপানি এক পর্যটকের। তার নাম-মাসায়েকি ইয়ামাশিরো। খুব সাধারণ পোশাকে উপস্থিত কলকাতায়। স্টেশনেই তার সাথে পরিচয়, কথালাপ। সে খুঁজছিলো-এখনে কোনও শস্তা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা যায় কি না। আলাপ, তারপর সঙ্গী হলো লেখকের। সপ্তাহখানেক ছিলো সেখানে তাঁর সাথে। মেসে থেকে-খেয়ে ইয়ামাশিরো অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। তারপর চলে যাবার পালা, যাবে মাদ্রাজ। সে কলকাতায় এসে প্রথমে বলেছে- কিছুই দেখার নেই এখানে। তবে যাবার সময় একরাম আলির হাত ধরে বলেছে- ‘অনেক দেশ সে ঘুরেছে। কিন্তু এমন একটা দেশ যে আছে, জানতই না। শুধু আছে না, দেখবারও আছে অনেক কিছু।… তোমরা। তোমাদের দেশের মানুষ।’ [ইয়ামাশিরো : ২৩]

একটি মেসে বিচিত্র মানুষের সঙ্গ থাকে। থাকে আনাগোনাও। ফলত, মেসসঙ্গী সকল ব্যক্তি প্রসঙ্গে তাঁর বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন চমৎকার। তবে একরাম আলি কোনোভাবেই তাদের মেধা-মনন বা চরিত্র বিশ্লেষণে, মর্যাদায় খাটো করেননি। কত মানুষের কত রকমের যে আচরণ, চলন, বৈশিষ্ট্য। সবার সাথে ওঠবস করতে হয়। তা মেসের এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এরকমই একজন ছিলেন কমলবাবু। যিনি স্বপ্ন দেখেছেন বিপ্লবের, কিন্তু তার সে লোকবলছিলো না। তারা মাত্র দুজন ছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। দলের নাম- বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি। দল ছোটো, কিন্তু স্বপ্ন ছিলো মহত, জনমুক্তির। লেখকভাষ্যে-‘কেউ জানবে না দলটার নামও’।

চলার ফাঁকে তাঁর আড্ডার পরিসর বেড়েছে। কফি হাউসসহ নানা জায়গায়। কলকাতায় বিভিন্ন লেখক-কবিদের সাথে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা, সুসম্পর্ক হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তিনি সাক্ষাৎকারে জানান,- ‘কবিবন্ধু বলে কিছু হয় না। বন্ধু কেউ হতেও পারে। বন্ধুত্বের সম্পর্ক, বলা হয়, দুনিয়ার সেরা সম্পর্ক। হয়তো তা-ই। একটা বয়স পর্যন্ত হয়তো কথাটার সত্যতা রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর সব জল তো আর সমুদ্রের সন্ধান পায় না। আমি পাইনি। হ্যাঁ, দু-একজন শুভার্থী পেয়েছি। দু-একজনই তাঁরা। না পেলে তো মরেই যেতাম। কবিবন্ধু... নাঃ, নেই। এখন বুঝি যে, ছিলও না কোনোদিন। তা হলে কারা ছিল? আমিই-বা ছিলাম কাদের সঙ্গে? ১৯৭৪-এর অক্টোবরে কলকাতা এসে যে মেসটাতে থাকার জায়গা পেয়েছিলাম, সেটা ছিল কফি হাউসের খুবই কাছে। দিনের অনেকটা সময় কেটে যেত কফি হাউসের ধোঁয়ায়। যে টেবিলটায় আমরা বসতাম। সেই টেবিল তখন উপচে পড়ত। তখন মানে ৭৫, ৭৬, ৭৭, ৭৮, ৭৯ সালে। আমার মেসের অদূরে ১৩ সি ঘোষ লেনে পার্থ (প্রতিম কাঞ্জিলাল)’র বাড়ি। একটা সময় প্রায় সারাদিনই কাটত পার্থর সঙ্গে। কফি হাউসে তো বটেই। আর আসত আড্ডায় প্রসূন (বন্দ্যোপাধ্যায়), নিশীথ (ভড়), রণজিৎ (দাশ), সোমক দাস মানে ঘঞ্চু। আরো অনেকে। এখন মনে হয়, সেসব দিন ছিল যতটা না কবিতার, তার চেয়ে বেশি ছিল নেশার।’… হয়তো কবিতারই দিকে![ বাংলা ট্রিবিউন, মার্চ ২৭, ২০১৭ ]

আড্ডায় সঙ্গ পেয়েছেনশঙ্খ ঘোষ, প্রণবেন্দুদাশগুপ্ত, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সৈয়দ শামসুল হক, অমিতাভ চৌধুরী, প্রসূণ, সমরেন্দ্র, মানস রায়চৌধুরী, শ্যামল ঘোষ, শ্যামল গঙ্গেপাধ্যায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, বিষ্ণু সামন্ত, পার্থপ্রতীম, সমরজিৎ সিংহ, লোকেন চক্রবর্তী, জহর সেনগুপ্ত, ইন্দ্রনাথ, মোহিত থেকে অনেকেরই। আড্ডা ভাঙলেও স্মৃতি তো মুছেনি। সাপ্তাহিক আড্ডার দিন ছিলো- রবিবার।লিখেছেন,- ‘অস্থির আর বিশাল হাওড়া স্টেশনের ছোট্ট এক কোণে রবিবারের এই ঘরটি আসলে বড়ো ঘড়ির তলা। চেয়ারে যিনি উপবিষ্ট, সবার কথা শুনছেন, দরকারে বলছেন কিছু কথা, তিনি শঙ্খ ঘোষ নামে পরিচিত হলেও আসলে ওই বড়ো ঘড়িটি, যেটির ডায়ালে তাঁর ধুতি-পাঞ্জাবির শুভ্রতা লেগে আছে।’ [রবিবার: ৫৩]

আড্ডা নিয়ে আছে কত রসালো স্মৃতি। আবার সবকিছু মিলিয়ে রয়েছে তাঁর পথচলা ও উপলব্ধি। ‘চারপাশের অবদমন আর নিষ্ঠুরতা আর অন্তর্লীন নল বেয়ে নাগাড়ে ভিতর-জলের চুইয়ে-পড়াকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা নয় এসব। বরং গ্যালারি-ভর্তি পেতে-রাখা ফাঁদে অবরুদ্ধজনের মশকরা। পরিত্রাণহীন ফাঁদকে অস্বীকার করা। হয়তো মূর্খতা। কিন্তু, সে-মূর্খতা তো ক্ষুদ্রতম গ্রহাণুও করে থাকে অতিকায় বৃহস্পতির গা ঘেঁষে যাওয়ার সময়।’ [প্রেসিডেন্সি থেকে কলাবাগান: ৫৭]

জীবনের প্রাত্যহিক প্রয়োজন বা নিছক সামান্য এক প্রসঙ্গে চলে গেছেন মানবসভ্যতার ইতিহাসে। সে তো লেখকের অসামান্য এক কৃতী। একরাম আলি পাঠককে নিয়ে চলেন তাঁর খনন-কাজে। এই যে উনুন জ্বলছে আর মেসবাড়ির সদস্যরা ক্ষুধা নিবৃত্ত করছেন। রান্নার উনুনের সূত্র ধরে চলে যানআগুনের ব্যবহারযোগ্যতা সন্ধান ও কয়লা খনিতে। গল্পচ্ছলে বলেন,-‘আগুনের জ্বলে-ওঠা একটা প্রাকৃতিক ঘটনা। সৃষ্টির শুরু থেকে ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও-না-কোথাও আগুন জ্বলছে।…কয়লা ঠিক কবে চিনল মানুষ? এই তো সেদিন।… ষোলোশো উনআশি সালে ইলিনয় নদী- এলাকায় কয়লা আবিষ্কার-এর কৃতিত্বটি এক ফরাসি অভিযাত্রীর নামে রেকর্ডভুক্ত হয়ে আছে। খনি থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় এই সেদিন, সতেরোশো আটচল্লিশে। মোটের উপর আড়াইশো বছরের এই জ্বালানিটি এরই মধ্যে পুড়ে পুড়ে নিঃশেষ হওয়ার কথা।’ [বাগবাজার আবিষ্কার: ৬৩-৬৪]

আড্ডা, গল্প, বিবরণে তিনি ভ্রমণ করেন আন্দালুসিয়া, জার্মান, জাপান, আফ্রিকা, ফ্রান্স, ইতালি, স্কটল্যান্ড, সিরিয়া,মধ্যপ্রাচ্য, সোভিয়েতসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। একইসাথে প্রত্ন-ইতিহাসে তাঁর অবিরাম চলমানতা। বলা বাহুল্য যে, ইতিহাসের উপাদান ও ভূগোলকে অনুষঙ্গ হিসেবে জুড়ে দেন ব্যক্তি ও ঘটনার প্রক্ষেপণে।

প্রসঙ্গত, যে স্টেশনে তিনি সবসময় যাতায়াত করতেন। এ স্টেশন শুধু প্রয়োজনের সংযোগস্থল নয়, তাঁর কাছে ভিন্ন কিছু। আমরা জানি স্টেশনই একমাত্র চমৎকার একটি স্থান, যেখানে বিচিত্র ধরনের মানুষের সমাবেশ ঘটে। এবং এমন স্টেশনে সুযোগ থাকলে সহজেই পুরো অঞ্চল ও দেশকে চেনা যায়। তিনি সে শিয়ালদা স্টেশনেরই বর্ণনা দিয়েছেন। শুধু স্থানটি কি এক স্টেশন মাত্র? স্টেশনের সূত্র ধরে তোলে আনেন ’৪৭-এর ভয়াবহ, রক্তাক্ত দেশভাগ ও এর পরিণাম। নির্মোহ তাঁর উপলব্ধি:  ‘এমন স্টেশন দুনিয়ায় ক-টা আছে যার একটা মেইন, অন্যটা সাউথ? তবু শোনা যায়, এটাই নাকি এশিয়ার ব্যস্ততম স্টেশন। কত দুর্নাম এর। নরকের পাশের দেশ যেন। অনবরত গাঁ-গঞ্জ থেকে পিলপিল করে পোকা ঢুকছে তো ঢুকছেই। বেশির ভাগই দেশভাগের পরিণতি।…কিন্তু সেই যে দেশভাগের ঢল, প্লাটফর্মে ভিটেছাড়া আর নিরন্ন পরিবারগুলোর দগদগে চিহ্ন, এত-এত বছর পেরিয়েও শিয়ালদা স্টেশন থেকে কিছুতেই যাবার নয়। আর সেই সুযোগে দু-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া ধড়িবাজদের যেন স্থায়ী ঠিকানা এই শিয়ালদা।’ [রাতের শিয়ালদা, ৬৯-৭০]

আমরা আগেই বলেছি নানা রকমের চরিত্রের সাথে সাক্ষাত ঘটে আমাদের। কত ক্ষতবিক্ষত, পোড়খাওয়া, অঙার হওয়া মানুষকে তিনি দেখেছেন। এর কি আর শেষ আছে, নেই। অসংখ্য মানুষ স্বপ্ন নিয়ে এসেছে এ-যান্ত্রিক শহরে। কেননা, ‘শশ্মানে না-এলে যে শবসাধনা হয় না’। অধিকাংশ স্বপ্ন বাস্তবের মুখ দেখেনি। ফলে, স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে। নীরবে, নির্জনে সেসব স্বপ্নের অপমৃত্যু তিনি দেখেছেন। যেমন, বিজনের গল্প।জলপাইগুড়ি থেকে এসে ডাক্তার হতে চেয়েছেন। কিন্তু এ শহর কখন যে তাকে গিলেছে, তা বিজন নিজেই টের পাননি। লেখকের পর্যবেক্ষণ: ‘কিন্তু বিজন?। কোথায় সে? জানি না। বিজনই জানতে দেয়নি সম্ভবত। নিঃশব্দে, অতি গোপনে, সে হয়তো-বা সেঁধিয়ে গিয়েছিল এই শহরের নিশিগহ্বরে।… যত অন্ধকারেই থাকুক, নগরীর অতিপরাক্রমশালী একটা ছিপ যেন-বা ঘাই মেরে বিজনকে সড়াৎটেনে নিয়েছিল।’ [বিজনের কলকাতা: ৯১]

একদিন সবই ছেড়ে যেতে হয়। এভাবে একরাম আলিকেও অভিজ্ঞতাময়, সুখ-দুঃখের মেস ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। সবাই যেমন যায়।কোনও নিশ্চিতির সন্ধানে নয়। নিছক প্রয়োজনে। এর মধ্যে আমরা লক্ষ করি, হ্যারিসন রোড-এর পাঠকৃতির মাধ্যমে কলকাতা শহর শুধু নয়, পুরো বাংলা অংশত জানা হয়ে যায়। এবং এ-রোড ধরে বিশ্বের নানা ভূগোলে অনায়াসে আমরা প্রবেশ করতে পারি। অবশেষে একরাম আলি বলেন,- ‘মেস থেকে কিন্তু পালানো যায় না। কেউ পালায়নি। মেস ছেড়ে অন্য কোথাও যায়। যায় স্থায়িত্বের সন্ধানে। যেমন কেউ কেউ যায় বাড়ি ছেড়ে। যারা বাড়ি ছাড়ে, তারা চিরতরে ভিটেহারা হয়ে যায়। অস্থায়ীত্বই তাদের ভবিতব্য। আমাকেও মেস ছাড়তে হল একদিন। আটাত্তর সালে। মে-জুন মাসে। কিন্তু কোনো কাজই তো সফলভাবে করতে পারিনি। স্থায়ী ঠিকানা পাইনি। তাই হয়তো-বা প্যারামাউন্ট নামের মেসটি বহুদিন থেকে গেল সঙ্গে। যেমন বীরভূমের বাড়ি।’ [বাড়ি থেকে পালিয়ে: ১৩৬]

হ্যারিসন রোড

একরাম আলি

প্রকাশক : দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

প্রকাশকাল : জানুয়ারি ২০২০

প্রচ্ছদ : শুভেন্দু সরকার

পৃষ্ঠা : ১৬০

মূল্য : ২৫০ টাকা

এখনও তাঁর সঙ্গেই আছে। ফলে, আমরা হ্যারিসন রোড-এ শুধু স্মৃতি পাঠ করি না। পাঠ করি ইতিহাস, আনন্দ-বেদনার, ঘা-খাওয়া জীবন। এখানে কথাশিল্পের উপাদানও সহজলভ্য। এর ভিত্তিতে উপন্যাস ও গল্প নির্মাণ করতে পারেন কোনও শিল্পী। অনেকদিন এমন সহজ ভাষ্যে জীবনের গল্প পড়িনি। বস্তুত, হ্যারিসন রোডের স্মৃতির উত্তাপে অন্তরে সংবেদনা জাগে নিরন্তর।

স্বপন নাথ, লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিক

[email protected]

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়