আলমগীর শাহরিয়ার
আপডেট: ২০:১৯, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ধর্ম, পোশাক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাজনীতি
মা-বাবার সাথে জাইমা রহমান। ছবি: সংগৃহীত
গ্রাম গঞ্জ তো বটেই এমনকি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যন্ত বোরকা হিজাব চাপিয়ে দেবার একটা আফগানি-ইরানি তোড়জোড় চলছে। এই শতাব্দীর প্রমথ দিকে আমরা যখন স্কুল কলেজে পড়তাম আমাদের কোনও সহপাঠিনীর মুখ ঢাকা দেখিনি। স্কুল ড্রেস পরেই তারা স্কুলে যেত। বোরকা পরত হাতে গোনা দু একজন। নেকাবে মুখঢাকা কাউকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি ক্রমশই যেন বদলে যেতে লাগল। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এখন আর আলাদা করে চেনা যায় না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই জুমাদের উত্থানকালে তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান অকস্মাৎ যেন আপাদমস্তক বাঙালি আধুনিক শিক্ষিত রুচিশীল সমাজের প্রতিনিধি হয়ে দেশের রাজনীতির মাঠে অনেকটা নীরবে সরব হলেন।
তার পরিবার লালবিপ্লব কিংবা রাজাকারদের জোট রাজনীতির সুদীর্ঘ সময়ের শরীক হয়েও এদের ভণ্ডামি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনাচরণকে স্পর্শ করেনি। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী দাদী খালেদা জিয়ার শোকসভায়ও চুল খোলা জাইমাকে দেখা গেছে। এটাই তাঁর সাবলীল জীবনবোধ।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার সময় থেকে জাইমাকে গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী দেখছে। জাইমা রহমানরা যখন ফিরছিলেন তখন প্লেনে তাঁর পাশে একটা বই ছিল খেয়াল করবার মত। সেটি ছিল The Penguin book of Bengali Short Stories. প্রখ্যাত ভারতীয় অনুবাদক অরুণাভ সিনহা সম্পাদিত ও অনূদিত বাংলা ছোটগল্পের বই এটি। এতে রবীন্দ্রনাথের 'জীবিত ও মৃত', পরশুরামের 'পরশ পাথর', শরৎচন্দ্রের 'অভাগীর স্বর্গ', মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'প্রাগৈতিহাসিক', বিভূতিভূষণের 'দ্রবময়ীর কাশীবাস', নরেন্দ্রনাথ মিত্রের 'রস', সুবোধ ঘোষের 'অযান্ত্রিক', জীবনানন্দ দাশের 'নারী', প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'জনৈক কাপুরুষের কাহিনি', সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারত', সমরেশ বসুর 'আদাব', সত্যজিৎ রায়ের 'পিকুর ডায়েরি', শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হেঁয়ালি ছন্দ', আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'রেইনকোট', সেলিনা হোসেনের 'মৃত্যুর নীলপদ্ম', শহীদুল জহিরের 'আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই', হুমায়ূন আহমেদের 'খেলা', সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের 'অস্ত্র', শাহীন আখতারের 'বাড়ি', সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'সাহানা অথবা শামীম' প্রভৃতি ছোটগল্পের ইংরেজি অনুবাদ সংকলিত হয়েছে।
বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি জানতে হলে এরকম লেখকদের হৃদয়ে ধারণ করার কোনো বিকল্প নেই। জাইমার সে প্রচেষ্টা আন্তরিক বলে মনে হয়েছে। ভালো লেগেছে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাবা মায়ের সন্তান মাত্রই জানেন বাংলা ভাষাটা শেখানো কতোটা কঠিন। সেখানে জাইমা সুন্দর বাংলা বলেন। এই তরুণীর বাচনভঙ্গী দারুণ। নিজের মাতৃভাষাকে অবহেলা করে প্রচ্ছন্ন গৌরব করে বলা আমার ছেলের বা মেয়ের বাংলাটা ঠিক আসে না কিংবা ভুলে গেছে এমনটা মনে হয়নি।
সন্দেহ নেই এই প্রযুক্তিপ্লাবনের সময়ে জাইমাকে অনেক তরুণীরা অনুসরণ করবে। নির্বাচন আসলে আমাদের দেশে ধর্মকার্ড খেলা একটা পুরনো সংস্কৃতি। পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দক্ষিণাঞ্চলের সকল আলেমরা দাঁড়িয়েছিলেন ফতোয়া নিয়ে। তবু বাঙালি জাতীয়তাবাদী নবজাগরণে জেগে ওঠা তরুণ শেখ মুজিবের বিজয় রুখতে পারেননি। কিন্তু সেই বঙ্গবন্ধুর নামে স্লোগান দেওয়া দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ুয়া গুপ্ত সারজিস, হান্নান, পাটোয়ারী, হাসনাতরা তাদের বেশভূষা বদলে ফেলেছিল। যেন মৌসুমী ধর্মব্যবসায়ী হয়ে ওঠেছিলেন তারা। পরনে পাঞ্জাবি, মাথায় সারাক্ষণ টুপি পরে ভোট চাইছেন। এটা স্রেফ ভণ্ডামি। এমনকি নারীবিদ্বেষী হেফাজতিদের প্রোগ্রামেও গেছেন হাসনাতরা।
জাইমা রহমান এখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তার পরিবার লালবিপ্লব কিংবা রাজাকারদের জোট রাজনীতির সুদীর্ঘ সময়ের শরীক হয়েও এদের ভণ্ডামি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনাচরণকে স্পর্শ করেনি। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী দাদী খালেদা জিয়ার শোকসভায়ও চুল খোলা জাইমাকে দেখা গেছে। এটাই তাঁর সাবলীল জীবনবোধ। জাইমার মাতৃকুল সিলেটের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত একটি পরিবার। ঈর্ষণীয় ও খুবই গৌরবময় যাদের শিক্ষা দীক্ষার ইতিহাস।
তার রাজনীতির সমর্থক না হয়েও এ কথা বলতে দ্বিধা নেই—বিলেতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি এই মেয়েটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভবিষ্যতে তিনি কোন পথে হাঁটবেন, কোন রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করে নিজেকে কিভাবে তুলে ধরবেন, কাদের সঙ্গী হবেন সেটা জানি না। তবে এ মুহুর্তে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও সামাজিক স্বাধীনতা নিয়ে যে কোনো রকমের নোংরামির প্রতিবাদ জানিয়ে রাখছি। একই সঙ্গে আমরা যেন নিকট অতীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় কিংবা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের কন্যাকে নিয়ে নোংরামির কথাও ভুলে না যাই।
রাজনৈতিক বিশ্বাসের দূরত্ব ও চিন্তার ভিন্নতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু আমরা যেন পরমতসহিষ্ণুতা ও সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতায় বিশ্বাস করি। বোরকার পাশাপাশি কেউ শাড়ি, টিপ কিংবা জিন্স ফতোয়া পরেও যেন রাস্তাঘাটে কারও কটূক্তির শিকার না হয়। মনে রাখি—মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা আধুনিক সমাজের অন্যতম প্রধান শর্ত। মানুষের এই স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করলে জঙ্গল বেঁচে নিতে পারেন, সভ্য সমাজ না। চর্যাপদ থেকে ময়মনসিংহ গীতিকা, ইউসুফ-জুলেখা থেকে পদ্মাবতী রচনাসমৃদ্ধ দেশে, পির, ফকির, আউল বাউল লালন হাসনের দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের স্থান কোনদিনই হবে না বলেই বিশ্বাস করি।
আলমগীর শাহরিয়ার, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবি ও লেখক
ইএন/এসএইচএ
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ

























