Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,   ফাল্গুন ৭ ১৪৩২

সংগ্রাম দত্ত

প্রকাশিত: ১৮:০০, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের প্রথম শহীদ মিনার: স্মৃতি, সংগ্রাম ও ইতিহাসের প্রতীক

শ্রীমঙ্গলের প্রথম শহীদ মিনার: স্মৃতি, সংগ্রাম ও ইতিহাসের প্রতীক। ছবি: আই নিউজ

শ্রীমঙ্গলের প্রথম শহীদ মিনার: স্মৃতি, সংগ্রাম ও ইতিহাসের প্রতীক। ছবি: আই নিউজ

১৯৬৯ সালের শ্রীমঙ্গল। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তখন উত্তাল। পাকিস্তান শাসনের অধীনে বাংলার মানুষ তাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষায় প্রতিনিয়ত আন্দোলন করে যাচ্ছিল। সেই সময়ে পূর্ব বাংলায় শহীদ মিনারের নির্মাণের প্রেক্ষাপট এবং গুরুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শ্রীমঙ্গল শহরের পৌরসভা মাঠে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ সেই ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

শ্রীমঙ্গলের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু হয়। ঢাকায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র সমাজের সংগঠন, ক্লাস বর্জন এবং ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে শ্রীমঙ্গলেও ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ছাত্র এবং নেতৃবৃন্দ শহরে পোস্টারিং, মিছিল ও জনসভা আয়োজন করে আন্দোলনকে তীব্র রূপ দেন। শহরের সমস্ত ধর্ম, বয়স ও পেশার মানুষ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথে ছাত্রদের রক্তে রাঙা সেই দিনটি বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতির একটি কেন্দ্রীয় দিক। শ্রীমঙ্গলের ছাত্র সমাজও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে শহরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিভিন্ন প্রতিবাদমূলক কার্যক্রম চালানো হয়। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই সংগ্রাম ও স্মৃতিকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শহরের কয়েকজন কৃতিসন্তান ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নেতার প্রচেষ্টায় পৌরসভা মাঠে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়।

শহীদ মিনারের প্রতিষ্ঠায় মূলভাবে ছিলেন ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান, (১৯৬৩ সালের বালিশিরা পাহাড় আন্দোলনে শহীদ সালিকের ফুফাত ভাই ও স্থানীয় সামাজিক নেতা), ন্যাপ নেতা সাইয়িদ মুজিবুর রহমান ও সৈয়দ মুয়ীজুর রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ ইলিয়াস ও মোঃ আলতাফুর রহমান চৌধুরী, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম,  বিশিষ্ট টি প্লান্টার মোখলেছুর রহমান। তারা একত্র হয়ে মুসলিম লীগের বিরোধ সত্ত্বেও ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে পৌরসভা মাঠে শহীদ মিনারের ভিত্তি স্থাপন করেন। মিনারটি মূলত রক্তে রঙা ছাত্র-নেতা ও আন্দোলনকারীদের স্মৃতিকে সমর্পিত করে নির্মিত হয়।

১৯৫৭ সালের ন্যাপ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সারা শ্রীমঙ্গলে মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া ও রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর নেতৃত্বে সাংগঠনিক ভিত্তির উপর একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা রূপ নেয়। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস, ডাঃ মোঃ আব্দুল আলী এবং এনডিএফ ছেড়ে আসা মোঃ আলতাফুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শ্রীমঙ্গল থানা কমিটি গঠিত হয়। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের নেতৃবৃন্দ কখনো একযোগে কখনো পৃথক পৃথকভাবে এলাকায় আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করেন।

শহীদ মিনারটি স্থানীয় পর্যায়ে সরল উপকরণ ও জনশ্রমের মাধ্যমে নির্মিত হয়। এটি শহরের কেন্দ্রীয় পৌরসভা মাঠে স্থাপন করা হয়, যাতে প্রতিটি শহরবাসী সহজে স্মৃতিসৌধটি দর্শন করতে পারে। মিনারটির সামনে পুষ্পস্তবক অর্পণের জন্য একটি বেদি তৈরি করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রতিবার ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, জাতীয় দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস এবং বিজয় দিবসে সমস্ত শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সংগঠন এই বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

শ্রীমঙ্গল শহরের এই প্রথম শহীদ মিনার কেবল একটি স্থাপনা নয়। এটি ছিল সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও বাঙালির মাতৃভাষার প্রতি অসম্পূর্ণ ভালোবাসার প্রতীক। শহীদ মিনারটি শহরের মানুষকে একত্রিত করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি সচেতন করে তুলেছে। শ্রীমঙ্গল শহরের শহীদ মিনার রক্তে রাঙা সেই আন্দোলনকে স্থানীয় ইতিহাসে চিহ্নিত করেছে। এটি আজও শহরের সাংস্কৃতিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়