মায়মুন শরীফ রাইয়ান
ধর্মের কার্ড, গুজবের রাজনীতি ও ব্যালটের লড়াই
মায়মুন শরীফ রাইয়ান, লেখক- সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড মডেল কলেজ
গণতন্ত্র কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি, যেখানে জনকল্যাণ এবং জনগণের শক্তিই চূড়ান্ত নির্ণায়ক। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক ও অপরিহার্য উপাদান হলো ভোটাধিকার। ভোটাধিকার রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার এক মৌলিক সামাজিক চুক্তি, যার মাধ্যমে জনগণ নির্ধারণ করে কে শাসন করবে, কীভাবে শাসন করবে এবং কোন মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হবে। ভোট কেবল তাই প্রতিনিধি নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিকের সম্মতি, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির সাংবিধানিক হাতিয়ার। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনে বাংলাদেশে এই হাতিয়ার কার্যত ভোঁতা হয়ে পড়েছে। নির্বাচন থাকলেও আস্থা নেই, ভোটকেন্দ্র থাকলেও ভোটার অনুপস্থিত, জনগণ থাকলেও জনমতের গুরুত্ব উপেক্ষিত- গত দুই দশক ধরে এটাই ছিল বাস্তব চিত্র। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচনী পরিবেশ যেহেতু নানা সংকটে জর্জরিত, সেহেতু এবারের ভোট ও নির্বাচন কেবল সাধারণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ পথনির্ধারণের কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
ভোটাধিকার ছাড়া নাগরিকত্ব একটি অসম্পূর্ণ ধারণা। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে, আর সেই সম্মতির একমাত্র সাংবিধানিক প্রকাশ হলো নির্বাচন। ভোটের মাধ্যমেই নাগরিক রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু জবাবদিহি স্থায়ী। স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের গণবিস্ফোরণ- সব আন্দোলনের মূল প্রেরণা ছিল রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। অতএব ভোটাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামের মৌলিক চেতনাকেই অস্বীকার করা।
গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ- নির্বাচন, প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহি- একটি ছাড়া অন্যটি কার্যকর হতে পারে না। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে সংসদ প্রতিনিধিত্বশীল হয় না, আর সংসদ দুর্বল হলে নির্বাহী ক্ষমতা জবাবদিহির বাইরে চলে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এই কাঠামোগত সংকটই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ফলে ভোটাধিকার কেবল ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকার বিষয় নয়; এটি নির্বাচনকে কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক করে তোলার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। সংবিধানে সংরক্ষিত এই অধিকার নাগরিককে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ দেয় এবং নাগরিকের মতামতকে নীতি ও সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করে। কিন্তু যখন নির্বাচনী পরিবেশ ভয়, বিভাজন, গুজব, অপতথ্য ও ধর্মের অপব্যবহারে আক্রান্ত হয়, তখন ভোটাধিকার তার প্রকৃত অর্থ হারিয়ে ফেলে।
রাজনীতি ও ধর্মের সংযোগ নতুন নয়; বিশ্বের বহু দেশেই রাজনৈতিক শক্তি ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে জনগণের পরিচয় ও অনুভূতিকে স্পর্শ করে। কিন্তু ধর্ম যখন রাজনৈতিক লাভ, বিভাজন ও গুজব ছড়ানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ হুমকি সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলে গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ‘ধর্মীয় দায়িত্ব’, ‘বিশ্বাস রক্ষা’ বা ‘জান্নাতের নিশ্চয়তা’- এ ধরনের স্লোগানে ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা যেমন বাড়ছে, তেমনি মসজিদ, ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সমাবেশকে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশে পরিণত করা হচ্ছে। এতে জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ম যখন ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন ভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়ালে চলে যায় এবং ভোটাধিকার বিভাজনের হাতিয়ারে রূপ নেয়। এতে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে এবং সামগ্রিকভাবে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, ধর্মীয় উত্তেজনা ও তথ্যভিত্তিক বিভ্রান্তি নির্বাচনী সিদ্ধান্ত তথা জনমতকে বিকৃত করে। ধর্মের পবিত্রতাকে ব্যবহার করে বিভাজন সৃষ্টি এবং ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা আসলে ফ্যাসিবাদী প্রবণতারই প্রকাশ।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নির্বাচনী আলোচনায় অপতথ্য ও গুজবের ভূমিকা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এমনকি কিছু গণমাধ্যমে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও ভুল তথ্য ছড়ানোর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে ভূয়া ফটোকার্ড এবং কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা বিভ্রান্তিকর ভিডিও প্রচার হচ্ছে। এটা শুধু প্রতিপক্ষ দলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে না; সমগ্র নির্বাচন পদ্ধতিকে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়। নির্বাচনী প্রচারণায় তুলে ধরা হয় এমন দাবি যা বাস্তবে ভিত্তিহীন, অথবা উগ্র ধর্মীয় বা সামাজিক চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে তৈরি যা নির্বিচারে বিতর্ক ও বিভাজন সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে দলগুলোর জনকল্যাণমূলক কর্মসুচির আলোচনা হারিয়ে যায়, গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ভিত্তি ধ্বংসের পথে যায় এবং ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে আসে।
ভোট দেওয়া আবেগের বিষয় নয়; এটি একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি দলের নীতি, আদর্শ, ইতিহাস ও সক্ষমতা বিবেচনা করা অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর আলোকে অনেকেই এবার বিএনপিকে ভোট দেওয়া যুক্তিসঙ্গত মনে করেন। নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির আপসহীন অবস্থান, ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন ও অসীম ত্যাগ, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, খাতভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সংস্কারমূলক প্রস্তাব দলটির রাজনৈতিক অবস্থানকে আলাদা গুরুত্ব দেয়। সেই সাথে তারেক রহমানের সহনশীল মনোভাব, বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
বিএনপিকে ভোট দেওয়া মানে তাই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এটি ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের পক্ষে ভোট, যেখানে নির্বাচন হবে প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বাসযোগ্য। এটি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে ভোট, যেখানে বিরুদ্ধ মতকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে নয়, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে এটি প্রতিহিংসামুক্ত ও মধ্যপন্থার রাজনীতির পক্ষে ভোট, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতি থাকবে না।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একমুখী ক্ষমতা, একদলীয় আধিপত্য কিংবা মতাদর্শিক উগ্রতা কখনোই স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ, শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ। বিএনপিকে ভোট দেওয়া সেই কাঠামো পুনর্গঠনের পক্ষে একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশকে যদি একটি কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে হয়, তাহলে ভোটের মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রচিন্তার পক্ষে অবস্থান নেওয়াই হবে নাগরিকের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা। এই বিবেচনায় বিএনপিকে ভোট দেওয়া রাজনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত, গণতান্ত্রিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
ভোট হলো নাগরিকের সবচেয়ে শক্তিশালী অথচ শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র যার মাধ্যমে একজন সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। এই অস্ত্র প্রয়োগের সুযোগ যখন সীমিত বা কেড়ে নেওয়া হয়, তখন ধীরে ধীরে অন্য সব অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে। ভোটাধিকার দুর্বল হলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক একমুখী হয়ে যায়, যেখানে শাসক জবাবদিহির উর্ধ্বে উঠে যায় এবং নাগরিক কেবল শাসনের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবারের ভোট তাই কেবল একটি সরকার নির্বাচন করার প্রক্রিয়া নয়; এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য পুন:প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়েছে, সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং নির্বাহী ক্ষমতা প্রায় অবারিত রূপ ধারণ করেছে। এই বাস্তবতায় ভোট দেওয়া মানে কেবল ব্যালট বাক্সে একটি চিহ্ন দেওয়া নয়; বরং এটি রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া যে ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকেই আসে এবং জনগণের কাছেই ফিরে যেতে হয়।
লেখক- সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড মডেল কলেজ
ইএন/এসএইচএ
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ

























