Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, রোববার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,   মাঘ ১৮ ১৪৩২

রুপম আচার্য্য

প্রকাশিত: ২২:৩৮, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬

বনছায়ার বেগুনি বিস্ময়

রহস্যময় পাখি ‘ভায়োলেট কুক্কু’ বা বেগুনি পাপিয়া

বেগুনি পাপিয়া পাখির ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।

বেগুনি পাপিয়া পাখির ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।

প্রকৃতির রঙিন জগতে কিছু পাখি আছে, যাদের দেখা মেলে খুবই ক্ষণিকের জন্য, অথচ সেই অল্প সময়ের দর্শনেই মনে গেঁথে যায় বিস্ময়। তেমনই এক দুর্লভ ও রহস্যময় পাখি হলো ‘ভায়োলেট কুক্কু’ বাংলায় পরিচিত বেগুনি পাপিয়া নামে। বেগুনি-নীল আভাযুক্ত ঝলমলে পালক আর নিঃশব্দ বিচরণে এই পাখি যেন বনজঙ্গলের গোপন রত্ন।

পরিচয় ও বৈজ্ঞানিক নাম
বেগুনি পাপিয়ার বৈজ্ঞানিক নাম Chrysococcyx xanthorhynchus। এটি কুক্কু বা পাপিয়া গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি ছোট আকারের পাখি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলজুড়ে এর বিচরণ লক্ষ্য করা যায়।

দৃষ্টিনন্দন রূপ
এই পাখির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর রঙ। পুরুষ বেগুনি পাপিয়ার শরীরজুড়ে ধাতব বেগুনি, নীল ও সবুজের ঝিলিক দেখা যায়, যা সূর্যের আলোতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। পেটের দিক সাদা বা হালকা ধূসর, চোখ ও ঠোঁট তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল। স্ত্রী পাখি কিছুটা অনুজ্জ্বল হলেও তার শরীরের নকশা কম মনোমুগ্ধকর নয়।

আবাস ও বিস্তৃতি
বাংলাদেশে বেগুনি পাপিয়া অতিথি বা পরিযায়ী পাখি হিসেবে পরিচিত। সাধারণত পাহাড়ি বনাঞ্চল, চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বন, বড় গাছপালা ঘেরা এলাকা এদের পছন্দের আবাসস্থল। সিলেট, মৌলভীবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বনঘেরা অঞ্চলে খুব ভাগ্যবান হলে এদের দেখা মেলে।

খাদ্যাভ্যাস
বেগুনি পাপিয়া প্রধানত পোকামাকড়ভোজী। শুঁয়োপোকা, গুবরে পোকা, পিঁপড়া ও ছোট কীটপতঙ্গ এদের খাদ্যতালিকার মূল অংশ। গাছের ডালপালা আর পাতার আড়ালে নিঃশব্দে খাদ্য সংগ্রহ করাই এদের স্বভাব।

স্বভাব ও আচরণ
এই পাখি অত্যন্ত নীরব ও লাজুক প্রকৃতির। খুব কমই এদের ডাক শোনা যায়। বেশিরভাগ সময় একা বা জোড়ায় চলাফেরা করে। কুক্কু গোত্রের অন্যান্য সদস্যদের মতো বেগুনি পাপিয়াও পরজীবী প্রজনন পদ্ধতি অনুসরণ করে অর্থাৎ নিজের বাসা না বানিয়ে অন্য ছোট পাখির বাসায় ডিম পাড়ে।

প্রজনন ও জীবনচক্র
প্রজনন মৌসুমে এরা আরও বেশি গোপনীয় হয়ে ওঠে। ডিম পাড়ার পর সেই ডিমের দায়িত্ব নেয় আশ্রয়দাতা পাখি। বাচ্চা ফোটার পর দ্রুত বেড়ে ওঠাই এদের টিকে থাকার কৌশল।

সংরক্ষণ অবস্থা
বিশ্বব্যাপী বেগুনি পাপিয়া বর্তমানে বিপন্ন নয়, তবে বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতে এদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশে যেহেতু এদের উপস্থিতি খুবই সীমিত, তাই স্থানীয়ভাবে এটি একটি দুর্লভ দর্শনীয় পাখি।

প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে গুরুত্ব
পাখিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীরা বেগুনি পাপিয়াকে ‘ড্রিম বার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করেন। এক ঝলক দেখার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বনজঙ্গলে অপেক্ষা করেন অনেকেই। এই পাখির উপস্থিতি কোনো এলাকার জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়।

শেষকথা
বেগুনি পাপিয়া প্রকৃতির সেই নীরব সৌন্দর্য, যাকে খুঁজে পেতে প্রয়োজন ধৈর্য আর ভালোবাসা। বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়লে হয়তো ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের আকাশে-গাছে এই বেগুনি বিস্ময়ের ক্ষণিক ঝিলিক দেখা যাবে।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়