নিজস্ব প্রতিবেদক
পর্যটন ঘিরে নির্বাচনী অঙ্গীকার: প্রত্যাশা আর প্রশ্নে ভোটাররা
ছবি: আই নিউজ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগান, বনভূমি ও ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানের জন্য মৌলভীবাজার জেলা দেশের অন্যতম পর্যটনসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর এখানে বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটে। তবে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিকল্পনার অভাব ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে জেলার পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি।
বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং দর্শনীয় স্থান সংরক্ষণের ঘাটতি পর্যটন শিল্পের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই পর্যটন খাত স্থবির হয়ে পড়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম পর্যটনসমৃদ্ধ এলাকা মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের পর্যটন খাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ‘চায়ের দেশ’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে নির্বাচনী মাঠে থাকা প্রার্থীরা দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
স্থানীয় ভোটারদের প্রত্যাশা নির্বাচনের পর এসব প্রতিশ্রুতি যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাদের মতে, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের প্রকৃতি শুধু দেখার বিষয় নয়, বরং আগলে রাখার দায়িত্বও রয়েছে। সেই দায়িত্ব যিনি নিতে পারবেন, ভোটের বাক্সে মানুষ তাকেই খুঁজছেন।
এই অঞ্চলে বন, টিলা, হাওর ও ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত উন্নয়নের অভাবে পর্যটন খাত নানা সংকটে পড়েছে। কোথাও ভাঙাচোরা সড়ক, কোথাও পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা, আবার কোথাও অব্যবস্থাপনার কারণে সম্ভাবনা হারিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে পর্যটনের কথা। কেউ আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, কেউ পরিবেশ সংরক্ষণের অঙ্গীকার করছেন, আবার কেউ স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলছেন। ফলে চায়ের দেশে নির্বাচনী আলোচনায় এখন প্রকৃতি ও পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই অঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে। তাই এবারের নির্বাচনে পর্যটন খাতকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন এই অঞ্চলের ভোটাররা।
প্রবীণ এক বাসিন্দা বলেন, “এই এলাকায় বহু সরকার এসেছে-গেছে। প্রতিশ্রুতি অনেক শুনেছি। কিন্তু চা-বাগান আর বন রক্ষা করে পর্যটন গড়ে তোলার কাজ এখনো বাস্তবে তেমন দেখা যায়নি।”
অন্যদিকে তরুণদের ভাষ্য, পরিকল্পিতভাবে পর্যটন গড়ে উঠলে স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তখন কাজের সন্ধানে বাইরে যেতে হবে না।
মৌলভীবাজার-৪ আসনে এনসিপির প্রীতম দাশ, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জরিফ হোসেন, বাসদের মো. আবুল হাসান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া, বিএনপির মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং খেলাফত মজলিসের শেখ নুরে আলম হামিদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই আসনটি শ্রীমঙ্গল পৌরসভা, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন, কমলগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন এবং কমলগঞ্জ পৌরসভা নিয়ে গঠিত। আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৬ হাজার ২০২ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৬৮৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২ জন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি অনেক শোনা যায়। আমরা চাই, যিনি নির্বাচিত হবেন তিনি যেন সত্যিই পর্যটন খাতকে অগ্রাধিকার দেন।”
শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের গাড়িচালক জয়নুল মিয়া বলেন, “পর্যটক ঠিকভাবে এলে আমাদের সংসার চলে। প্রতিশ্রুতি নয়, নির্বাচনের পর বাস্তব কাজ দেখতে চাই।”
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী রুপম আচার্য্য বলেন, “পর্যটন উন্নয়নের নামে যেন প্রকৃতি ধ্বংস না হয় এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এই অঞ্চলের বন ও চা-বাগানই মূল আকর্ষণ। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন হলে পর্যটন বাড়বে না, বরং পরিবেশের ক্ষতি হবে। স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে টেকসই পর্যটন পরিকল্পনা জরুরি।”
পরিবেশকর্মী সালাউদ্দীন শুভ বলেন, “নির্বাচনের সময় পর্যটনের কথা শোনা গেলেও ভোটের পর সেই আলোচনা হারিয়ে যায়। অথচ এই এলাকার পর্যটনের মূল শক্তি তার প্রকৃতি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও বন উজাড়ে সেই প্রকৃতি আজ হুমকির মুখে।”
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ইকো ট্যুর গাইড সাজু মারছিয়াং বলেন, “শ্রীমঙ্গলকে ‘চায়ের দেশ’ বলা হলেও পর্যটন খাত এখনো অবহেলিত। পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি আমাদের পরিচয়ের অংশ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিচয় রক্ষা সম্ভব নয়।”
কমলগঞ্জ সুজনের সাধারণ সম্পাদক নির্মল এস পলাশ বলেন, “শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সরকারি উদ্যোগ খুব সীমিত। আমরা চাই, প্রার্থীরা নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটন খাতকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তুলবেন।”
নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরাও পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশ বলেন, নির্বাচিত হলে চা-শ্রমিক ও খাসি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং হাওর-টিলা অঞ্চলের সড়ক উন্নয়নে কাজ করবেন।
বাসদের প্রার্থী মো. আবুল হাসান পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত উন্নয়নের পাশাপাশি চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ভূমির মালিকানা ও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির কথা বলছেন।
বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী জানান, নির্বাচিত হলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে তার প্রধান অগ্রাধিকার।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া বলেন, পর্যটন ও বিনিয়োগ বাড়াতে সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়নের পাশাপাশি শমসেরনগর বিমানবন্দর চালুকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দেন তিনি।
ইএন/এসএইচএ
- দুলাভাইয়ের ধর্ষণের শিকার শ্যালিকা
- মৌলভীবাজারের রাজনগরে
আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বিধবা রুবির বিউটি পার্লার - `প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে আমাদের ধোকা দেওয়া হচ্ছে`
- রাখাল নৃত্যের মধ্য দিয়ে কমলগঞ্জে রাস উৎসব শুরু
- কমলগঞ্জে মাদকবিরোধী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত
- মেয়ের বাড়িতে ইফতার: সিলেটি প্রথার বিলুপ্তি চায় নতুন প্রজন্ম
- দেশের চতুর্থ ধনী বিভাগ সিলেট
- অবশেষে ক্লাস করার অনুমতি পেল শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম
- শ্রীমঙ্গল টু কাতারে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালি নেটওয়ার্ক
মৌলভীবাজারে অনলাইন জুয়ায় রাতারাতি কোটিপতি সাগর - এসএসসির ফলাফলে বিভাগে ৩য় স্থানে মৌলভীবাজার

























