Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, সোমবার   ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,   মাঘ ২০ ১৪৩২

রুপম আচার্য্য

প্রকাশিত: ১০:৪৭, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শিল্পের স্বপ্নে ৫০ কোটি টাকা, বাস্তবে বিসিক শিল্পনগরী জঙ্গলে ঢাকা

শ্রীমঙ্গলে গড়ে তোলা বিসিক শিল্পনগরীর বেহাল অবস্থা। ছবি: আই নিউজ

শ্রীমঙ্গলে গড়ে তোলা বিসিক শিল্পনগরীর বেহাল অবস্থা। ছবি: আই নিউজ

চা-সমৃদ্ধ জেলা মৌলভীবাজারের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রীমঙ্গলে গড়ে তোলা বিসিক শিল্পনগরীটি আজ বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নের মুখে। উদ্বোধনের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বিকাশের উদ্দেশ্যে নির্মিত এ শিল্পনগরীতে এখনো শুরু হয়নি কোনো কার্যক্রম। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও শিল্পনগরীটি কার্যত পরিত্যক্ত চারদিকে জঙ্গল, চুরি হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরঞ্জাম এবং বন্ধ সংযোগই যেন বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে থামিয়ে দিয়েছে।

২০১২ সালে শ্রীমঙ্গলের উত্তরসুর এলাকায় ২০ একর জমির ওপর বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরী প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৯ সালে প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক কোয়ার্টার, পাম্প হাউস, গ্যাস সাবস্টেশন, পুকুর ও পিচঢালা সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর কাজ শেষ হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হলেও শিল্প কার্যক্রম শুরু হয়নি আজও।

শিল্পনগরীতে মোট ১২২টি প্লটের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়া কোনো উদ্যোক্তাই এখনো কারখানা নির্মাণ শুরু করেননি। নিরাপত্তার অভাব ও দীর্ঘদিন তদারকির ঘাটতির কারণে গ্যাস সাবস্টেশন ও বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়াই ছিল বিসিক শিল্পনগরীর মূল লক্ষ্য। কিন্তু প্লটের অতিরিক্ত মূল্য ও মৌলিক সুবিধার অনুপস্থিতির কারণে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বিসিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন প্লট খালি থাকায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষদিকে জেলার বাইরের কয়েকজন উদ্যোক্তার নামে ৫৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। শিল্পনগরীতে তিন ধরনের প্লট রয়েছে- এ ক্যাটাগরি: ৬০×১০০ ফুট, বি ক্যাটাগরি: ৪৫×৯০ ফুট, এস ক্যাটাগরি: ৩৮০০-৮১০০ বর্গফুট। ৯৯ বছরের জন্য প্রতি বর্গফুট প্লটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯৯ টাকা ৫১ পয়সা।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, প্রশাসনিক ভবন ছাড়া শিল্পনগরীর অধিকাংশ এলাকায় ঘন জঙ্গল গজিয়েছে। পিচঢালা রাস্তা ফেটে বেরিয়েছে ঘাস ও ঝোপঝাড়। দ্বিতীয় প্রবেশ গেট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় গাছপালায় ঢেকে গেছে। বিদ্যুৎ খুঁটিতে নেই কোনো ট্রান্সফরমার, ভবনের ভেতরে পড়ে আছে কিছু খোলা যন্ত্রাংশ। মিটার ও অন্যান্য অবকাঠামো ঢেকে গেছে লতাপাতায়। এলাকাটি এখন সাপ, বোলতা ও মৌমাছিসহ নানা প্রাণীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। দিনের বেলাতেও একা চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ।

শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল মিয়া বলেন, “এখানকার প্লটের দাম আশপাশের জমির তুলনায় অনেক বেশি। উপরন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ না থাকায় উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বিসিক শিল্পনগরী পূনরায় চালু করতে হলে প্লটের দাম কমাতে হবে, এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ চালু করতে হবে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীতে আমার কারখানা রয়েছে। শ্রীমঙ্গলে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু এখানে প্লটের দাম অত্যধিক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল। তাই ঝুঁকি নিতে চাইনি।”

নৈশপ্রহরী বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, “চারপাশে জঙ্গল হওয়ায় বিশাল এলাকা একা পাহারা দেওয়া অসম্ভব। ট্রান্সফরমার চুরির পর থেকে বিদ্যুৎ নেই। একাধিকবার চোর-ডাকাতের ঝুঁকির মুখে পড়েছি।”

শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. মুনায়েম ওয়ায়েছ জানান, “বিসিক শিল্পনগরী প্রকল্পের নির্মাণকাজ ২০১৯ সালে সম্পন্ন হয়। এরপর ২০২২ সাল থেকে প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৫৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্লটের কোনো উদ্যোক্তাই এখনো কার্যক্রম শুরু করেননি।”

তিনি আরও জানান, “২০২৫ সালে নতুন করে আরও দুটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আরও চারটি প্লট বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পূর্বে বরাদ্দপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারা কাজ শুরু না করায় শিল্পনগরীর বর্তমান এই দুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তবে নতুন যারা প্লট নিচ্ছেন, তাদের কার্যক্রম শুরুর সক্ষমতা ও আগ্রহ যাচাই করেই প্লট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আগে যারা প্লট নিয়েছিলেন, তারা বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কাজ শুরু করতে পারেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।”

বিদ্যুৎ সংযোগ বিষয়ে মুনায়েম ওয়ায়েছ বলেন, “ট্রান্সফরমার চুরির কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পুনঃসংযোগের জন্য পল্লী বিদ্যুৎকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারা কাজ শুরু করলেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হবে।”

প্লটের মূল্য বেশি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিসিক শিল্পনগরী নির্মাণসহ সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে যে ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব-নিকাশ করেই প্লটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে তুলনায় আশপাশের জমির দামের চেয়ে বিসিক শিল্পনগরীর প্লটের দাম কিছুটা বেশি হতে পারে।”

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়