Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, শুক্রবার   ০২ জানুয়ারি ২০২৬,   পৌষ ১৯ ১৪৩২

সংগ্রাম দত্ত

প্রকাশিত: ২১:১৭, ২ জানুয়ারি ২০২৬

এম এ আলী স্মরণে

একটি নির্ভীক কলম, একটি নিষ্ঠ রাজনীতি ও এক অভিভাবকতুল্য মানুষ

ন্যাপ নেতা ও প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ আব্দুল আলী (এম এ আলী)।

ন্যাপ নেতা ও প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ আব্দুল আলী (এম এ আলী)।

ন্যাপ নেতা ও প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ আব্দুল আলী সবার কাছে যিনি এম এ আলী নামে পরিচিত, তিনি আর নেই। তাঁর প্রয়াণে শ্রীমঙ্গলসহ মৌলভীবাজার জেলার রাজনৈতিক, সাংবাদিক ও সামাজিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবার নয়। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন রাজনীতি মানেই ছিল আদর্শ আর সাংবাদিকতা মানেই ছিল সাহস।

ছাত্রজীবনে মৌলভীবাজার কলেজে অধ্যয়নকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। পরবর্তী সময়ে ন্যাপ (মোজাফফর) রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে তিনি নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নব্বই-পরবর্তী সময়ে শ্রীমঙ্গল থানা ন্যাপের সভাপতি হিসেবে তিনি যে নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আজও অনেকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

আশির দশকের শেষভাগে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। সে সময় আমার পিতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি ছিল রাজনীতি ও সাংবাদিকতার এক অঘোষিত কেন্দ্র। এম এ আলী প্রায় প্রতিদিনই সেখানে এসে দীর্ঘ সময় কাটাতেন আলোচনা, বিতর্ক, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আর সংবাদ লেখায়। আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও কঠিন, কী নিদারুণ শ্রম ও ধৈর্যের সঙ্গে তিনি পত্রিকার প্যাডে হাতে লিখে রিপোর্ট তৈরি করতেন এবং ডাকযোগে পত্রিকা অফিসে পাঠাতেন। সংবাদ সংগ্রহ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, সময়সাপেক্ষ এবং সাহসের পরীক্ষা তবু তিনি পিছু হটেননি।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের স্টেশন রোডে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পেছনের ছোট একটি কক্ষে ন্যাপ (মোজাফফর)-এর নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে তাঁর নিয়মিত আড্ডা ও বৈঠক হতো। দলকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে চিন্তায় তিনি সদা ব্যস্ত থাকতেন। তিনি বুঝতেন, সময়ের সঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তবু আদর্শের প্রতি আবেগ ও বিশ্বাস থেকেই তিনি সবাইকে উৎসাহ দিয়ে রাজনীতির মাঠে রাখার চেষ্টা করতেন। এই জায়গাতেই এম এ আলী ছিলেন আলাদা। তিনি জানতেন সীমাবদ্ধতা, তবু ছাড় দেননি মূল্যবোধে।
সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুপরিচিত ও সম্মানিত মুখ। 

দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক সমাচার-এ দীর্ঘদিন শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করেছেন। তিনি শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সমিতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির শ্রীমঙ্গল থানা শাখার সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

নব্বই দশকের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে। পেশিশক্তি, কালো টাকা, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রভাব সব মিলিয়ে ন্যাপসহ বাম রাজনীতি ক্রমান্বয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবু এম এ আলী রাজনীতি, সমাজ ও সাংবাদিকতা এই তিনটি ক্ষেত্রেই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।

২০০০ সালের পর শ্রীমঙ্গল শহরের শ্যামলী আবাসিক এলাকায় তাঁর বাসভবনের সামনের একটি কক্ষে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজের বসার জায়গা, যা পরিণত হয়েছিল এক প্রকার সামাজিক ও রাজনৈতিক মিলনকেন্দ্রে। সেখানে তিনি শুভাকাঙ্ক্ষী, নেতাকর্মী ও সহকর্মীদের নিয়ে সময় কাটাতেন, আলোচনা করতেন সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে। এলাকাবাসীর কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকতুল্য মুরব্বি। বিচার-আচার থেকে শুরু করে নানান সামাজিক সমস্যার সমাধানে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও দায়িত্ববান। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বড় ছেলে ও কন্যাকে ইংল্যান্ডে এবং ছোট ছেলেকে আমেরিকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেন। এসব সিদ্ধান্তের পেছনেও ছিল তাঁর দূরদর্শিতা ও পিতৃস্নেহ।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লেও তাঁর মনোবল ছিল অটুট। একসময়ের সুস্বাস্থ্যবান মানুষটিকে ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে দেখা ছিল বেদনাদায়ক। ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে অতীতের সেই দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে আন্দোলন, সংগ্রাম, হাতে লেখা রিপোর্ট, রাজনৈতিক বৈঠক আর এক নিষ্ঠ মানুষকে ঘিরে থাকা অসংখ্য স্মৃতি।

এম এ আলী ছিলেন কেবল একজন রাজনীতিক বা সাংবাদিক নন, তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি আদর্শের ধারক। তাঁর প্রয়াণে আমরা হারালাম এক নির্ভীক কলম, এক নীতিবান রাজনীতিক এবং সমাজের এক বিশ্বস্ত অভিভাবককে। স্মৃতিতে, কর্মে ও আদর্শে তিনি বেঁচে থাকবেন দীর্ঘদিন।

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়