মোহাম্মদ মকিস মনসুর
অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা
১০ জানুয়ারি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন
ছবি: সংগৃহীত
“তোমার আগমনে এলো পূর্ণতা” রক্তে কেনা বাঙালির স্বাধীনতার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ১০ জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের পুনর্জন্ম।
কারাগারের অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার আলো
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর নয় মাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকতে হয়। প্রতিটি মুহূর্তে তাঁকে গুনতে হয়েছে মৃত্যুর প্রহর। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর নির্দেশনাকে অনুসরণ করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ জনগণ ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত সংগ্রামে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে।
বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাঙালিদের আন্দোলন ও প্রচারণার ফলে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ৬৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে চিঠি দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি ইউরোপের পাঁচটি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের মাধ্যমে বিশ্বজনমত বাংলাদেশের পক্ষে আনতে সক্ষম হন। এর ফলেই পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
লন্ডনে বঙ্গবন্ধু
নয় মাস ১৪ দিন কারাভোগের পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুক্তি পান। একটি পাকিস্তান সামরিক বিমানে তাঁকে গোপনে লন্ডনে পাঠানো হয়। বিমানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ড. কামাল হোসেন ও তাঁর পরিবার।
৮ জানুয়ারি সকালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ঘোষণা আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে আসছেন। হিথরো বিমানবন্দরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হয়। ব্রিটিশ ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান স্যার ইয়ার মাদারল্যান্ড বঙ্গবন্ধুকে জানান, ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করছে।
লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলে অবস্থানকালে সাংবাদিকদের সামনে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি এখানে এক মুহূর্তও থাকতে চাই না। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ একটি অবিসংবাদিত বাস্তবতা এবং শিগগিরই জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য আবেদন করা হবে।
বিশ্বনেতাদের সম্মান
বঙ্গবন্ধুর আগমনের সংবাদ পেয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে তাঁকে সাক্ষাৎ দিতে ছুটে আসেন। নজিরবিহীন সম্মান জানিয়ে তিনি নিজে কার্যালয়ের বাইরে এসে বঙ্গবন্ধুর গাড়ির দরজা খুলে দেন। এ সময় হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে লন্ডনের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে।
ঢাকায় ফেরা: ইতিহাসের মহান মুহূর্ত
লন্ডন থেকে ঢাকা ফেরার পথে বিমানটি দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করে। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে বীরোচিত সংবর্ধনা জানান।
অবশেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পণ করেন। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা ও সংবর্ধনায় অভিষিক্ত হন তিনি।
রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সমাবেশে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমার জীবনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই স্বাধীনতা কোনো দিন নষ্ট হতে দেওয়া হবে না।”
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু
১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত প্রথম সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, শরণার্থী পুনর্বাসন এবং প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার মতো কঠিন দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ শতাধিক দেশের স্বীকৃতি লাভ করে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হয়।
আজকের প্রেক্ষাপট ও দায়বদ্ধতা
আজকের বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার ও ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা চলছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচিন্তার বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি নন; তিনি একটি আদর্শ, একটি জাতির আত্মপরিচয়।
১০ জানুয়ারি তাই শুধু স্মরণ নয়, এটি প্রতিজ্ঞার দিন। ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সত্যকে সমুন্নত রাখার দিন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষণমুক্ত, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার দীপ্ত শপথের দিন।
উপসংহার
কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি প্রতিবছরের মতো এ বছরও গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পালন করছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। আজকের এই দিনে জাতির পিতার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শপথ নিচ্ছি বাংলাদেশ চিরজীবী হবে, মানবতা জয়ী হবে।
ইএন/এসএইচএ
- কেএফসির মালিকের জীবন কাহিনী
- প্রজাপতি: আশ্চর্য এই প্রাণীর সবার ভাগ্যে মিলন জোটে না!
- বিশ্বের অদ্ভুত কিছু গাছের ছবি
- মা-শাশুড়িকে হারিয়েও করোনার যুদ্ধে পিছিয়ে যাননি এই চিকিৎসক
- যেখানে এক কাপ চা পুরো একটি পত্রিকার সমান!
- তিন রঙের পদ্মফুলের দেখা মিলবে এই বিলে
- সোনার দাম এত কেন : কোন দেশের সোনা ভালো?
- রহস্যময় গ্রামটি লাখো পাখির সুইসাইড স্পট
- ২০২৩ সালে পৃথিবীর শক্তিশালী ১০টি দেশ!
- বায়েজিদ বোস্তামি: মাতৃভক্তির এক অনন্য উদাহরণ

























