Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,   মাঘ ২১ ১৪৩২

রুপম আচার্য্য

প্রকাশিত: ১৭:২৪, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নীরবতার আড়ালে এক বিষধর বিস্ময় লজ্জাবতী বানর

লজ্জাবতী বানরের ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।

লজ্জাবতী বানরের ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।

নীরব, ধীরগতির চলাফেরা আর বিস্ময়ভরা বড় বড় চোখ দেখতে যেন শিশুসুলভ নিরীহ প্রাণী। কিন্তু এই চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক বিরল বৈশিষ্ট্য। নাম তার লজ্জাবতী বানর, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত Slow Loris নামে। বৈজ্ঞানিক নাম Nycticebus। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে বসবাসকারী এই নিশাচর প্রাইমেট বর্তমানে বিলুপ্তির মারাত্মক ঝুঁকিতে।

বাসস্থান ও বিস্তৃতি
লজ্জাবতী বানর মূলত ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের উষ্ণমণ্ডলীয় চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বনে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এদের উপস্থিতি সীমিত বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে।

শারীরিক গঠন ও স্বভাব
প্রায় ২০-৩৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের এই বানরের ওজন সাধারণত ৬০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজির মধ্যে। ধীরগতির চলাফেরা, গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে থাকা আর রাতে সক্রিয় হওয়ার কারণে এরা সহজে চোখে পড়ে না। দিনের বেলায় গাছের ফাঁকফোকরেই কাটে তাদের বেশিরভাগ সময়।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় লজ্জাবতী বানর পৃথিবীর একমাত্র বিষধর প্রাইমেট। কনুইয়ের কাছে থাকা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত বিষ লালা’র সঙ্গে মিশে দাঁতের মাধ্যমে শিকার বা শত্রুর শরীরে প্রবেশ করে। আত্মরক্ষায় এটি ভয়ংকর অস্ত্র।

খাদ্যাভ্যাস
এরা সর্বভুক হলেও খাদ্যতালিকায় প্রধানত থাকে ফল, গাছের রস, পোকামাকড়, ছোট সরীসৃপ ও পাখির ডিম। গাছের গায়ে ক্ষত করে রস সংগ্রহ করা এদের একটি বিশেষ আচরণ।

প্রজনন ও জীবনচক্র
লজ্জাবতী বানর ধীরে বংশবিস্তার করে। স্ত্রী বানর সাধারণত একবারে একটি মাত্র শাবক জন্ম দেয়। গর্ভকাল প্রায় ৬ মাস। শাবক মায়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় থাকে, যা প্রজাতির টিকে থাকার গতি আরও ধীর করে তোলে।

বিলুপ্তির কারণ
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN)-এর তালিকায় লজ্জাবতী বানর বিপন্ন (Endangered) হিসেবে চিহ্নিত। বন উজাড়, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য এবং পোষা প্রাণী হিসেবে পাচার এই তিনটি প্রধান কারণ এদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “কিউট” ভিডিও ছড়িয়ে পড়াও এই অবৈধ বাণিজ্যকে উসকে দিচ্ছে।

সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণে বনভূমি রক্ষা, আইন প্রয়োগ জোরদার এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এই প্রাণী শুধু বনজ বাস্তুতন্ত্রের অংশ নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শেষ কথা
নীরব চোখে তাকিয়ে থাকা লজ্জাবতী বানর প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি যাকে আমরা হারাতে বসেছি আমাদেরই অবহেলায়। এখনই যদি উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই রহস্যময় প্রাণীকে শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখবে।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়