রুপম আচার্য্য
রহস্যময় অরণ্যবাসী কাঠ ময়ূর
নিভৃত বনভূমির নীরব সৌন্দর্যের প্রতীক
কাঠ ময়ূরের ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।
ঘন সবুজ অরণ্যের ছায়াঘেরা পথে হঠাৎ চোখে পড়ে গেলে যে পাখিটি মুহূর্তেই থমকে যেতে বাধ্য করে, সে হলো গ্রে পিকক-ফিজ্যান্ট, বাংলায় পরিচিত কাঠ ময়ূর নামে। ময়ূরের মতো রাজকীয় ভঙ্গি, কিন্তু আচরণে নিঃশব্দ ও লাজুক এই বৈশিষ্ট্যই কাঠ ময়ূরকে আলাদা করে চেনায়।
পরিচয় ও বৈজ্ঞানিক নাম
কাঠ ময়ূরের বৈজ্ঞানিক নাম Polyplectron bicalcaratum। এটি ফিজ্যান্ট বা বনমুরগি গোত্রভুক্ত একটি পাখি। ইংরেজিতে একে বলা হয় Grey peacock-pheasant। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে এদের বিচরণ, যার মধ্যে বাংলাদেশও একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসভূমি।
গঠন ও বৈশিষ্ট্য
কাঠ ময়ূরের শরীর ধূসর-বাদামি রঙের হলেও পালকে ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য চকচকে চোখের মতো নকশা, যা অনেকটা ময়ূরের পালকের স্মৃতি জাগায়। পুরুষ কাঠ ময়ূরের পালক তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয় ও নকশাবহুল। মাথায় ছোট ঝুঁটির মতো পালক, তীক্ষ্ণ চোখ আর শক্ত পা সব মিলিয়ে এক অনন্য সৌন্দর্য।
এর দৈর্ঘ্য সাধারণত ৫০-৬০ সেন্টিমিটার। পূর্ণাঙ্গ ময়ূরের মতো বিশাল লেজ না থাকলেও, ডানার পালক মেলে ধরলে এদের সৌন্দর্য সত্যিই নজরকাড়া।
আবাস ও বিস্তৃতি
বাংলাদেশে কাঠ ময়ূর মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দেখা যায়। ঘন চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বন এদের প্রিয় আবাস। মাটির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে বলে এরা বেশিরভাগ সময় ঝোপঝাড়ের আড়ালেই থাকে।
আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস
কাঠ ময়ূর অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির পাখি। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই দ্রুত ঝোপে বা বনের গভীরে লুকিয়ে পড়ে। সাধারণত একা বা জোড়ায় জোড়ায় চলাফেরা করে।
খাদ্য হিসেবে এরা পোকামাকড়, কেঁচো, শামুক, ফল, বীজ ও ঝরে পড়া পাতার নিচে থাকা ছোট প্রাণী খেয়ে থাকে। মাটিতে খাদ্য খোঁজাই এদের প্রধান অভ্যাস।
প্রজনন ও জীবনচক্র
প্রজনন মৌসুমে পুরুষ কাঠ ময়ূর ডানা মেলে নাচের ভঙ্গিতে স্ত্রী পাখিকে আকর্ষণ করে। ডানার ‘চোখের’ মতো নকশা তখন সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। স্ত্রী কাঠ ময়ূর সাধারণত মাটিতে পাতার আড়ালে বাসা তৈরি করে ২-৩টি ডিম পাড়ে।
সংরক্ষণ অবস্থা
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) কাঠ ময়ূরকে Near Threatened বা প্রায় বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বন উজাড়, অবৈধ শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসই এদের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কাঠ ময়ূর সংরক্ষিত প্রাণী হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে হুমকি পুরোপুরি কাটেনি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ কাঠ ময়ূর
কাঠ ময়ূর শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি বনজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ ও বনভূমির প্রাকৃতিক চক্রে এদের অবদান অনস্বীকার্য।
শেষ কথা
নিভৃত বনভূমির এই নীরব বাসিন্দা কাঠ ময়ূর আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য অংশ। এদের টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সচেতনতা, সংরক্ষিত বন রক্ষা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ। না হলে একদিন হয়তো এই রহস্যময় সৌন্দর্য শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
ইএন/,এসএইচএ
- কেএফসির মালিকের জীবন কাহিনী
- প্রজাপতি: আশ্চর্য এই প্রাণীর সবার ভাগ্যে মিলন জোটে না!
- বিশ্বের অদ্ভুত কিছু গাছের ছবি
- মা-শাশুড়িকে হারিয়েও করোনার যুদ্ধে পিছিয়ে যাননি এই চিকিৎসক
- যেখানে এক কাপ চা পুরো একটি পত্রিকার সমান!
- তিন রঙের পদ্মফুলের দেখা মিলবে এই বিলে
- সোনার দাম এত কেন : কোন দেশের সোনা ভালো?
- রহস্যময় গ্রামটি লাখো পাখির সুইসাইড স্পট
- ২০২৩ সালে পৃথিবীর শক্তিশালী ১০টি দেশ!
- ঢাকার মাঠ মাতানো বিদেশি ফুটবলাররা

























