Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, বুধবার   ০৮ এপ্রিল ২০২৬,   চৈত্র ২৫ ১৪৩২

ইমরান আল মামুন

প্রকাশিত: ০৫:৪৭, ৮ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে

দেশের আইনি অঙ্গনের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বহুল কাঙ্ক্ষিত বার কাউন্সিল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে সারা দেশের হাজার হাজার আইনজীবী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আগামী তিন বছরের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। নির্বাচন কমিশন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আগামী ১৯ মে দেশজুড়ে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। যারা এই পেশার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কাজ করতে চান, তাদের জন্য এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে প্রস্তুতির তোড়জোড়।

আইনজীবীদের এই শীর্ষ সংগঠনের নির্বাচন নিয়ে প্রতিবারই সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। সাধারণ আইনজীবীরা আশা করছেন, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে এমন এক নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে যারা বার এবং বেঞ্চের মধ্যে সমন্বয় সাধনের পাশাপাশি পেশাগত মানোন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবেন। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের প্রতিটি জেলা বার সমিতিতে শুরু হয়েছে নির্বাচনি আলাপ-আলোচনা।

বার কাউন্সিল নির্বাচনের তারিখ ও বিস্তারিত তফসিল

মঙ্গলবার সরকারের এক বিশেষ গেজেটের মাধ্যমে নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৯ মে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। তবে ভোটের লড়াইয়ে নামার জন্য প্রাথমিক ধাপ অর্থাৎ মনোনয়ন দাখিলের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত।

  • বার কাউন্সিল নির্বাচনের তারিখ ও প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
  • মনোনয়নপত্র দাখিল: ৯ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে ১৬ এপ্রিল বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
  • মনোনয়ন বাছাই: ২৩ এপ্রিল প্রার্থীদের জমা দেওয়া আবেদন যাচাই-বাছাই করা হবে।
  • প্রার্থিতা প্রত্যাহার: ৩০ এপ্রিল বিকেল ৪টার মধ্যে কোনো প্রার্থী চাইলে তার নাম প্রত্যাহার করতে পারবেন।
  • চূড়ান্ত ভোটগ্রহণ: ১৯ মে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

এই কঠোর সময়সূচির মধ্যে প্রতিটি প্রার্থীকে তাদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র বার কাউন্সিল অফিসে সরাসরি দাখিল করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের পর কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না বলে গেজেটে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

১৪টি পদের বিপরীতে বিশাল কর্মযজ্ঞ
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের কাঠামো অনুযায়ী মোট ১৪ জন সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ৭ জন নির্বাচিত হন সাধারণ বা 'জেনারেল সিট' থেকে। বাকি ৭ জন নির্বাচিত হন দেশের সাতটি ভৌগোলিক অঞ্চলের 'গ্রুপ সিট' থেকে। এবারের নির্বাচনেও এই একই পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। জেনারেল সিটে সারা দেশের যেকোনো সনদপ্রাপ্ত আইনজীবী প্রার্থী হতে পারেন। অন্যদিকে, গ্রুপ সিটগুলোতে সংশ্লিষ্ট এলাকার আইনজীবী সমিতির সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।

এই নির্বাচন ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, এটি সরাসরি ভোটাভুটির মাধ্যমে আইনজীবীদের নেতৃত্ব নির্ধারণের সুযোগ দেয়। একজন ভোটার তার নিজের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বার কাউন্সিলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠাতে পারেন। সাধারণ আসনে যারা জয়ী হন, তারা মূলত সারা দেশের আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর গ্রুপ ভিত্তিক আসনগুলো নির্দিষ্ট অঞ্চলের দাবি-দাওয়া ও সমস্যা নিয়ে কথা বলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

কারা ভোটার হতে পারবেন ও ভোটাধিকার প্রয়োগের নিয়ম
বার কাউন্সিল নির্বাচনে ভোটার হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। গেজেট অনুযায়ী, যারা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত এবং বার কাউন্সিল অনুমোদিত কোনো আইনজীবী সমিতির নিয়মিত সদস্য, কেবল তারাই ভোটার হিসেবে গণ্য হবেন। এছাড়া বার কাউন্সিল আইন অনুযায়ী যাদের পেশাগত সনদ দেওয়া হয়েছে, তারাও এই প্রক্রিয়ায় ভোট দিতে পারবেন।

ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে যা প্রত্যেক আইনজীবীর জেনে রাখা জরুরি:

১. সুপ্রিম কোর্ট ও তিন পার্বত্য জেলা: সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি এবং খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলা আইনজীবী সমিতির ভোটাররা জেনারেল সিটের জন্য ৭টি ভোট দিতে পারবেন।
২. অন্যান্য স্থানীয় সমিতি: স্থানীয় বা লোকাল আইনজীবী সমিতির ভোটাররা জেনারেল সিটের জন্য ৭টি এবং তাদের নিজস্ব গ্রুপ সিটের জন্য ১টি ভোট দিতে পারবেন।
৩. লোকাল বারের সংজ্ঞা: নির্বাচনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ছাড়া দেশের বাকি সব আইনজীবী সমিতিকে 'লোকাল' বা স্থানীয় সমিতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

ভোট দেওয়ার এই জটিল কিন্তু গোছানো পদ্ধতিটি নিশ্চিত করে যে, প্রতিটি অঞ্চল থেকে এবং সামগ্রিকভাবে যোগ্য ব্যক্তিরাই যেন নেতৃত্বে আসতে পারেন। আইনজীবীদের পেশাগত অধিকার ও শৃঙ্খলার স্বার্থে এই ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভোটকেন্দ্রের অবস্থান ও বুথ বিন্যাস
নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্য সারা দেশে ব্যাপক সংখ্যক ভোটকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা যেন খুব সহজেই তাদের ভোট দিতে পারেন, সেজন্য জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা বা বিশেষ এলাকায় কেন্দ্র থাকবে।

ভোটকেন্দ্রের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো:

  • বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন।
  • দেশের প্রতিটি জেলা সদরের দেওয়ানি আদালত প্রাঙ্গণ।
  • বাজিতপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, দুর্গাপুর, ভাঙ্গা এবং চিকন্দি দেওয়ানি আদালত।
  • পটিয়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, ফটিকছড়ি এবং সন্দ্বীপ এলাকা।
  • হাতিয়া, নবীনগর এবং পাইকগাছা দেওয়ানি আদালত প্রাঙ্গণ।

এই কেন্দ্রগুলো স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো আইনজীবীদের যাতায়াতের ভোগান্তি কমানো। বিশেষ করে দূরবর্তী উপজেলাগুলোর আইনজীবীরা যেন নিজ এলাকাতেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই বিষয়টি মাথায় রাখা হয়েছে।

নির্বাচনের প্রভাব ও আইনজীবীদের প্রত্যাশা
বার কাউন্সিল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই আইনি মহলে এক ধরনের নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। বার কাউন্সিল মূলত আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সনদ প্রদান থেকে শুরু করে পেশাগত শৃঙ্খলা রক্ষা—সবই এই সংস্থার অধীনে হয়। তাই আইনজীবীদের কাছে এই নির্বাচন শুধু ভোট নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন।

গত কয়েক বছরে আইনজীবীদের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নানা সমস্যা। জুনিয়র আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ, এনরোলমেন্ট পরীক্ষার নিয়মিতকরণ এবং আইনজীবী সুরক্ষা আইনের মতো বিষয়গুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, এবারের নির্বাচনে যারা জয়ী হবেন, তাদের এই চ্যালেঞ্জগুলো গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করতে হবে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে এনরোলমেন্ট পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছেন, তাদের জন্য একটি সুষ্ঠু রোডম্যাপ তৈরি করা নতুন কমিটির প্রধান কাজ হওয়া উচিত।


সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল তার গণতান্ত্রিক গৌরব ধরে রাখবে—এটাই এখন সাধারণ আইনজীবীদের প্রত্যাশা। বার কাউন্সিল নির্বাচনের তারিখ ও তফসিল যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে যথাযথ নিয়ম মেনে ভোট হলে যোগ্য নেতৃত্বই জয়ী হবেন। মনে রাখতে হবে, বার কাউন্সিল শক্তিশালী হওয়া মানেই দেশের বিচার ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের আইনি অধিকার শক্তিশালী হওয়া। আগামী ১৯ মে সারা দেশের আইনজীবীরা এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, যা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করবে।

নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো পরিবর্তন বা বিশেষ আপডেটের জন্য বার কাউন্সিলের অফিসিয়াল নোটিশ বোর্ড এবং নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের দিকে নজর রাখা জরুরি। ভোটারদের উচিত সময়মতো তাদের বকেয়া চাঁদা পরিশোধ করে ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম নিশ্চিত করা, যাতে করে কোনো অবস্থাতেই এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে কেউ বাদ না পড়েন।

Green Tea
সারাবাংলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়