ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৮

মোহাম্মদ আসিফ চৌধুরী

প্রকাশিত: ১৭:৪৮, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ১৯:৪৪, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১

এক পিশাচের নির্মমতা ও একজন দেবদূতের গল্প

পপি রাণী দাস

পপি রাণী দাস

পানির গ্লাসে ছিল টলটলে এসিড। স্বামী তাকে পানির বদলে এসিড পান করতে দেয়। পপি তা জানতো না। অসুস্থ পপি শুধু পানি চেয়েছিল স্বামীর কাছে। এক গ্লাস পানি ভেবেই এসিড পান করে পপি।

তারপর তার গলা, খাদ্যনালী ও পাকস্থলী পুড়ে গলে গিয়েছিল। দীর্ঘ সাত বছর বাংলাদেশের এসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের হসপিটালে চিকিৎসা চলছিল তার। খেতে পারতো না, গিলতে পারতো না কোনো খাবার। তাই বাইরে থেকেই রাবারের নলের সাহায্যে তরল খাবার শরীরে ঢোকাতো সে।

জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি সময়ে, ২০০৯ সালে স্বামীর হাতে এসিড পান করে দগ্ধ হয়ে অনেক যন্ত্রণা সয়ে অনেকগুলো বছর হাসপাতালে আশাহীন জীবন কাটানোর পর শুরু এক নতুন অধ্যায়। 

২০১৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশে আগুনে পোড়া নারীদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য ঢাকা সফর করেছিলেন কানাডার টরন্টোর প্লাস্টিক সার্জন ডা. টনি জং। ডা. টনি প্রমিজ করেছিলেন পপির কাছে যে কানাডা ফিরে গিয়ে তিনি অবশ্যই পপিকে কানাডাতে নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। 

সেই থেকে শুরু। ডা. টনি জং কানাডা ফিরে গিয়ে শুরু করেন পপির জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ। জনে জনে গিয়ে এসিডে পপির পুড়ে যাওয়ার গল্প বলেন। কাজ হয়। একটি বছরের চেষ্টার পর পপি রাণী দাস কানাডার টরন্টোর পিয়ারসন এয়ারপোর্টে নামলেন ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ। ইতোমধ্যো ডা. টনি গঠন করলেন পপি ফান্ড। এক মাসের মধ্যেই টরন্টোর কয়েকটি ধনী পরিবারসহ অন্যান্য ডোনারের ডোনেশন সংগ্রহ হয় মোট সাত লক্ষ মার্কিন ডলার। 

জার্মানির মিউনিখের অ্যানেস্থেসিস্ট ডা. ইনজি হ্যাসেলস্টেইনার ও তার বোনের প্রচেষ্টায় সংগ্রহ হয় সাতাশ হাজার ইউরো। পপির থাকার বন্দোবস্তে এগিয়ে আসেন কানাডার বাংলাদেশ কমিউনিটির মহৎপ্রাণ মানুষেরা। সেই সাথে টরন্টো জেনারেল হসপিটালের মেডিকেল টিমের স্পেশালিস্ট ডাক্তার ও অ্যানেস্থেসিস্ট সবাই তাদের ফি পুরোটাই ফ্রি করে দেন। 

পপির অপারেশনের জন্য টরন্টো জেনারেল হাসাপাতালের অপারেশন থিয়েটার অফ টাইমের জন্য ব্যবহার করারও অনুমতি দেয়া হয় যাতে কানাডার অন্যান্য নিয়মিত রোগীদেরও অপারেশন সেবার ব্যাঘাত না ঘটে। আর অপারেশনও সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেয়া হয় পপির জন্য।

ডা. জিলবার্ট ও ডা. গোল্ডস্টেইনের তত্ত্বাবধানে পপির বাম বাহুর চামড়া থেকে নতুন কোষ উৎপন্ন করে নতুন করে খাদ্যনালী, পাকস্থলী, শ্বাসনালী পুন:নির্মাণ করা হয়। যুগান্তকারী সাফল্য আসে। কিছুদিনের মধ্যেই পপি খাবার গিলে খেতে পারে। ডাক্তাররা আশাবাদী হয়ে উঠেন এই ভেবে যে, এসিড গিলে খাবার পরে পপির ভেতরের সব পুড়ে যাবার পরও সে বাঁচলো এবং তার পুড়ে যাওয়া অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো সেরে উঠলো।

ঠিক দশ মাস পর ঐ বছরেরই ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ পপি ও তার মা অজন্তা রাণী দাসকে টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল টিম বিদায় জানান। আবেগঘন অনুষ্ঠানে সবার মধ্যমনি পপি রাণী দাস।

বাংলাদেশের হাজারো লাখো দূর্ভাগা মেয়েদের একজন পপি রাণী দাস। বিয়ের পর যৌতুকের দাবিতে স্বামী তাকে পানির বদলে এসিড পান করায়। পপির যে জীবন শুরু হলো কানাডার টরন্টোর সার্জন টনি জং ও ডা. জিলবার্ট -ডা. গোল্ডস্টেইনের ম্যাজিক্যাল চিকিৎসায় সেই জীবনের বাকিটা পপি বাংলাদেশের এসিড আক্রান্ত, নিপীড়িত অসহায় মেয়েদের জন্য কাজ করে উৎসর্গ করতে চায়।

আর সার্জন টনি জং নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। পপির জন্য যে ফান্ড গঠন করা হয়েছিল ইউনিভার্সিটি হেলথ নেটওয়ার্কের সেটি আজ পারমানেন্টলি “ইউএচএন হেলপ” ফান্ড। অফিসিয়ালি ফান্ডটির নাম তাই হলেও পপিকে সারিয়ে তুলেছেন যে সমস্ত মহান মানুষেরা তাঁরা ভালবেসে এই ফান্ডটিকে বলছেন “পপি ফান্ড”। যে ফান্ডটি আজীবন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের জীবন মৃত্যুর সাথে লড়াই করা জটিল জটিল রোগীদের জন্য কাজ করবে। 

মূল তথ্যসূত্র ও ছবি: টরন্টো স্টার  

Green Tea
সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়