ঢাকা, সোমবার   ১৫ জুন ২০২৬,   আষাঢ় ১ ১৪৩৩

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২:৫৩, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০
আপডেট: ২৩:০৩, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা: সেই ব্যথা আজও কাঁদায় হিমেন্দ্র শেখরকে

মুক্তিযোদ্ধা হিমেন্দ্র শেখর

মুক্তিযোদ্ধা হিমেন্দ্র শেখর

একাত্তরের রৌদ্রোজ্জ্বল একটি দিনে কলেজের বই কিনে কুলাউড়া থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন টগবগে যুবক হিমেন্দ্র। পথিমধ্যে রাস্তায় আটকে ফেলে পাকবাহিনী। তারা জিপ ধাক্কানোর কাজে নিয়োজিত করেন তাকে।  তখন দুইজন পাকসেনার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের নিয়ে মনু নদীতে ঝাঁপ দেন। এরপর নদী পার হয়ে বাড়িতে যান।

পরদিন কলেজে গিয়ে হিমেন্দ্র দেখেন কলেজে কোনো ছাত্র নেই। ফেরার পথে কুলাউড়ার নবাব আলী সাফদার খানের সাথে দেখা হলে তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার বাড়িতে যান।

সেই স্মৃতিচারণ করেন হিমেন্দ্র শেখর দত্ত বলেন, রাজা সাহেবের বাড়িতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার সিকন্দর আলীর নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ দেই। মার্চের দশ তারিখের দিকে ট্রেনিংয়ে যোগ দেই।  বাড়িতে গিয়ে দেখি দশ বারো জন ট্রেনিং নিচ্ছেন সেটা দেখে আমারও ইচ্ছা জাগলো। পাক সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠকদের প্রতিরোধের ঘোষণা দিল, এরপর আমরা একটু সতর্ক অবস্থানে চলে যাই।

তিনি বলেন, রাজা সাহেব মুক্তিযুদ্ধের জন্য যে পরিশ্রম করেছেন তা অতুলনীয়,অথচ কেউ একজন কোনদিন তার নাম মুখে নেয়নি। রাজা সাহেবের বাড়িতে প্রশিক্ষণ নেয়া আমরা আটাশ জন নিরাপত্তার জন্য ভারতের কৈলাশহরে চলে যাই। কৈলাশহর বিমানবন্দরের উত্তর পাশেই তাদের বাড়ি ছিল সেখানে আমরা অবস্থান নেই।

সেখানে দশ-বারোদিন থাকার পর লোহগড়া ট্রেনিং সেন্টারে চলে যাই। সেখানে উচ্চতর ট্রেনিং দেই। সেখানে ২১ দিন ট্রেনিং নেই। প্রথম যুদ্ধে অংশ নেই শমশেরনগরে, এরপর কুলাউড়ায়। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আসেন তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বাংলোতে সেখানে আমাদের সব সেক্টরের ম্যাপ বুঝিয়ে দেন। সেখানে আমাদের নিয়ে তিনি মিটিংও করেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এপ্রিলের প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নবাব আলী সাফদার খান ও কমান্ডার মানিক চৌধুরীর নেতৃত্বে ভারতীয় বাহিনী শেরপুরে যায়।

হিমেন্দ্র শেখর বলেন, প্রথম বোম মৌলভীবাজারের ব্রিজে লাগিয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেই। শমসেরনগর বিমানবন্দর থেকে যাতে পাকসেনারা মৌলভীবাজার ঢুকতে না পারে সেজন্য চৈত্রঘাটের ব্রিজটিও উড়িয়ে দেই। এরপর থেকে পাকসেনারা বিমান থেকে নেমে অন্য কোন উপজেলার যেতে পারে নি।

হাইল হাওর দিয়ে পাক বাহিনীর খাদ্যের জাহাজ যেত। আমরা পরিকল্পনা করি যে, এই রুটির জাহাজ উড়িয়ে দিতে। ভূমি জরিপ জানায় সহজে দুই দিকে দুইটি আট্রিলারি ফিট করি। জাহাজ আসা মাত্রই দুই দিক থেকে আট্রিলারির আঘাতে জাহাজ ডুবে যায়।

পরে জুড়ির লাঠিটিলায় মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। তারা সেখান থেকে সরে চলে আসে জুড়ির দক্ষিণ দিকে। এখানে তারা বড় বড় বাংকার তৈরী করে, যার কারণে তাদের সরানো সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে বিমান হামলা করে তাদের বাংকারসহ সব উড়িয়ে দেয়া হয়। প্রায় একশ পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করে।

আহত হওয়ার স্মৃতিতে তিনি বলেন, পাহাড়ের খাজে দুইজন পাক সেনা দেখতে পাই। দেখতে পাওয়ায় আমরা গুলি করি। একজন সাথে সাথেই মরে যায়। আরেকজনের মৃত্যু হয়েছে কি না দেখতে গেলে সে আমার উপর গুলি চালায়। পরে তাকে গুলি করলে সে মারা যায়।

এরপর আমার সঙ্গীরা আমাকে আহত দেখে উদ্ধার করে। রাজা সাহেব চিকিৎসা করান, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বিদেশে পাঠিয়ে পায়ের অপারেশন করার ব্যবস্থা করেন। আঘাত পাওয়া পা আজও পীড়া দেয়। জীবনের শেষ মুহুর্তে আমার এখন ইচ্ছা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সাথে দেখা করার।

আইনিউজ/ওমর ফারুক নাঈম

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়