ঢাকা, সোমবার   ১৫ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪৩৩

শ্যামলাল গোঁসাই

প্রকাশিত: ১১:৩৪, ২০ ডিসেম্বর ২০২০
আপডেট: ১৪:৩৮, ২০ ডিসেম্বর ২০২০

মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভয়াবহ ইতিহাসের সাক্ষী মৌলভীবাজার

সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের গণকবরের পাশে নির্মিত ২০ ডিসেম্বর নিহত শহীদদের স্মৃতিফলক। ছবি : আইনিউজ

সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের গণকবরের পাশে নির্মিত ২০ ডিসেম্বর নিহত শহীদদের স্মৃতিফলক। ছবি : আইনিউজ

২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে পূর্ণ বিজয় বাঙালি ইতোমধ্যেই ছিনিয়ে নিয়েছে। দেশব্যাপী আনন্দ উল্লাস করছিলো এই বাংলার মুক্ত মানুষ। সেই আনন্দ ছড়িয়ে পরেছিল সিলেটের ছোট্ট ঐতিহাসিক জেলা মৌলভীবাজারেও। কিন্তু কে জানতো মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভয়াবহ ইতিহাস রচিত হবে এই মৌলভীবাজারেই!

১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ খাতাকলমে পাকিস্তানী দোসরদের থেকে জয় লাভ করে বাংলাদেশ। যুদ্ধ শেষে এর ঠিক চারদিন পরেই মৌলভীবাজারে শহীদ হয়েছিলেন একঝাঁক বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা। এ ঘটনাটিই ১৯৭১ সালের সর্বশেষ ট্রাজেডি এবং এি শহীদরাই সর্বশেষ শহীদ। তাই আজকের এই দিনটিকে মৌলভীবাজারবাসী স্থানীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

যা ঘটেছিলো সেদিন

তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার বিভিন্ন রণাঙ্গন থেকে সেদিন (২০ ডিসেম্বর) সকাল থেকেই দলে দলে ফিরে আসছিলেন বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সবাই এসে জড়ো হচ্ছিলেন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পে। এর মধ্যেই যুদ্ধের ময়দান থেকে ক্যাম্পে চলে এসেছিলেন অনেক মুক্তিযোদ্ধারা।

কেউ ক্যাম্পের ভেতর ঘুমুচ্ছিলেন, কেউ খাওয়া-দাওয়া করছিলেন। কেউ আবার যুদ্ধ বিজয়ের গল্প করছিলেন সতীর্থ যোদ্ধাদের সঙ্গে। তাঁদের অনেকেই রনাঙ্গণ থেকে ফেরত নিয়ে আসা অস্ত্র-গোলাবারুদ-মাইন-ডিনামাইড ইত্যাদি গুছিয়ে রাখছিলেন।

২০ ডিসেম্বর, দুপুরের দিকে সমবেত মুক্তিযোদ্ধারা খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ একটি বিকট শব্দে স্তব্ধ হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের পদচারণায় মুখর প্রাঙ্গণটি। আকষ্মিকভাবে একসাথে একাধিক স্থলমাইন বিষ্ফোরিত হয়েছিল প্রলয়ংকরী বিকট শব্দে। চোখের সামনে নিমিষেই ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়ে যায় মৌলভীবাজার সরকাররি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পটি।

ক্যাম্পে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে শিমুলের তুলার মত উড়ে গিয়েছিল। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, বিদ্যালয়ের চারপাশের এলাকা ও বিদ্যালয়ের বিশাল খেলার মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে মুক্তিসেনাদের ছিন্নভিন্ন মাংসপিন্ড। একটু আগেই যারা খুশিমনে যুদ্ধজয়ের গল্প করছিলেন তারা যেন নিমিষেই একেকটি মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়ে গেলেন!

বিস্ফোরণের পরেও যারা বেঁচেছিলেন তারা সবাই নির্বাক হয়ে যান। চোখের সামনেই সতীর্থদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে যেতে দেখে স্তব্ধ হয়ে যান তারা।

এ দূর্ঘটনায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক হিসেব পাওয়া যায়নি। দূর্ঘটনার সময় ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানরত যেসব মুক্তিযোদ্ধা আহত হলেও বেঁচে গিয়েছিলেন এবং এখনও যারা বেঁচে আছেন, তাদের কয়েকজনের মতে-ওইদিন সকালে ক্যাম্পের বাইরে থাকা বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধাই শহীদ হয়েছিলেন। যদিও এই তথ্যের কোনো সত্যতা নেই অনুমান মাত্র!

ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শহীদদের মধ্যে মাত্র ২৪ জনের নাম পরিচয় জানা গেলেও, অনেক শহীদের নাম পরিচয় আজও অজানা রয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু শহীদের নাম তালিকায় সংযোজন করা হয়নি বলে অভিযোগ ছিল।

তবে, এ ব্যাপারে আর কিছু জানা যায়নি। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন আজও বেঁচে আছেন বুকে নিয়ে সেই মাইন দুর্ঘটনার ভয়াল স্মৃতি। দুর্ঘটনার পরে মুক্তিসেনারা মিলে সারাদিন ধরে খুঁজে খুঁজে জড়ো করেছিলেন তাদেরই সতীর্থদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাংসপিন্ডগুলো।

সেদিন তীব্র বেদনায় ব্যথিত হয়েও মুক্তিযোদ্ধা মির্জা আজিজ আহমদ বেগ নিজেই মাইকিং করে জানাযা ও সৎকার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনের জন্য সবার প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঐদিনই সন্ধ্যায় বিদ্যালয় মাঠের একেবারে পূর্ব-দক্ষিণ কোনে (বর্তমান শহীদ মিনারের পেছনে) মাংসপিন্ডগুলোকে সমাহিত করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে এসব শহীদদের সমাধিস্থলের সম্মুখভাগে নির্মান করা হয় শহীদ মিনার। যেটি মৌলভীবাজারের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এরপর এ শহীদ মিনারের পূর্বদিকে একে একে স্থাপন করা হয় এসব শহীদদের নামাঙ্কিত দুটি স্মৃতিস্তম্ভ।

মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের একেবারে পূর্ব-দক্ষিন কোনে, বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ দুটির পৃষ্ঠদেশে দৃশ্যমান পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা প্রাচীর ঘেরা স্থানটি, স্থলমাইন দুর্ঘটনায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদেরই সমাধি।

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়