ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

দীপংকর মোহান্ত

প্রকাশিত: ১৩:২৮, ১৭ নভেম্বর ২০২১
আপডেট: ১৪:৩৭, ১৭ নভেম্বর ২০২১

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা

স্বজনদের লন্ডনী আয়ে বেড়েছে অল্পশিক্ষিত বেকার

প্রবাসী আয় বাড়লেও এই আয় দিয়ে কেউ-ই উচ্চ শিক্ষার প্রসার ঘটাতে কিংবা ভারী শিল্প কারখানা গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়নি। প্রবাসী ধনীরাও উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। তবে তারা ধর্মীয় কাজে কিংবা কোনো উৎসবে টাকা দিতে কসুর করেনি। ‘লন্ডনী সাব’রা [সাহেব] নিজের আত্মীয় স্বজনকে- বিশেষত পরিবার-পরিজনকে/ বৈবাহিকসূত্রে ইংলেন্ড নিতে আগ্রহী ছিলেন। ফলে অসংখ্য পরিবার বিদেশী টাকার ওপর নির্ভর হয়ে শিক্ষা ও কাজকর্মকে গৌণ মনে করেছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মৌলভীবাজারের অবদান অনস্বীকার্য। ২৬শে মার্চের পর-ই সিলেট-মৌলভীবাজারের সংযোগস্থল অর্থাৎ শেরপুর অঞ্চলে জন-যুদ্ধ পাকসেনাদের পরাস্ত হয়। সীমান্তবর্তী মৌলভীবাজার জেলায় পাক সেনারা অসংখ্য গণহত্যা করে ছিল। আবার গৌরবজনক অনেক সম্মুখ যুদ্ধে পাকদের কোমরও ভেঙে যায়। যেমন সর্ববৃহৎ যুদ্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধলাই যুদ্ধ [কমলগঞ্জ, যেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শহিদ হয়েছিলেন], দিলকুশা চা বাগান যুদ্ধ, কামুদপুর যুদ্ধ, শমসেরনগর বিমান ঘাঁটির যুদ্ধ ইত্যাদি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা নিয়ে আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব

বাংলায় ইংরেজি শিক্ষা প্রসারকালে মৌলভীবাজারে ‘আধুনিক শিক্ষা’ জমে ওঠেনি। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ ‘ফিরিঙ্গ শিক্ষা’ মূল্যায়ন করেছিল। ‘না-পাকী’ শিক্ষায় মুসলমানদের আগ্রহ ছিল না। আবার হিন্দুদের মনে-মনে ‘খিরিস্টান’ হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। ফলে টোল ও মাদ্রাসা শিক্ষার ধারা দীর্ঘকাল বজায় থাকে। মৌলভীবাজারের রাজনগরে টোলের সংখ্যা বেশি থাকে। অবশ্য শিক্ষা ক্ষেত্রে মৌলভীবাজার ঐতিহ্য, ইতিহাসও কম আলোকিত নয়। আধুনিক শিক্ষার উষাকালে রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রাম থেকে গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য [১৯৭৭-১৯৫৯] নবদ্বীপে সংস্কৃত ভাষায় পড়াশুনা করেও কলকাতার উদয় বেলা অর্থাৎ নবজাগৃতিকালে রাজা রামমোহন রায়ের দক্ষিণহস্ত হয়ে ওঠেছিলেন। তিনি ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠীর মুখপত্র ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকা ও পরে নিজের ‘সম্বাদ ভাস্কর’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। অতঃপর এই গ্রাম থেকে সিপাহি বিদ্রোহের পর আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার পথ ধরে এগিয়ে যান হরকিঙ্কর দাস [১৮৪৮-১৯৩৩]। তিনি ফারসি শিখে দেখেছিলেন যে, ইংরেজি শিক্ষা ছাড়া রোজগারের উপায় নেই। সেকালে তিনি সিলেট শহরে গিয়ে রেভারেন্ড প্রাইস সাহেবের [১৮২০-১৮৬৯] কাছে ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন।

হরকিঙ্কর দাস মহোদয় মৌলভীবাজার জেলায় আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে নিরলস কাজ করে গেছেন। ১৮৮২ সালে মাত্র আধুনিক শিক্ষার হাইস্কুলের সূচনা ঘটে। মেয়েদের শিক্ষার জন্য ১৯০৩ সালে বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। নানা কারণে এই জনপদ শিক্ষায় পিছিয়ে থাকে। পাশের ত্রিপুরা থেকেও তখন এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কম ছিল। এই জেলায় প্রথম কলেজ স্থাপিত হয় ১৯৫৬ সালে। স্বাধীনতার আগে জেলায় মাত্র দুটি কলেজ ছিল। ফলে উচ্চশিক্ষা ধীরলয় লক্ষণীয়।

মৌলভীবাজারে জনসংখ্যার অনুপাতে অঢেল কৃষিজমি উদ্বৃত্ত থাকায় মানুষজন গৃহমুখি হয়ে সুখে-ই থাকে। কৃষি আয়ের কারণে মানুষের পেট ভরত ঠিকই; কিন্তু প্রান্তিকজনের অভাব ছিল বিস্তর। তবে ব্রিটিশের শেষ দিকে কয়েকজন কলকাতায় গিয়ে ব্যবসা করতে দেখা গেছে। তখন জাহাজে করে লন্ডন যাওয়া সাধারণের সাহসের মধ্যে চলে আসে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূচনায় শমসেরনগর বিমান ঘাঁটি তৈরির সময় স্থানীয় কিছু লোকজন কৃষি ছাড়া ভিন্ন পেশা গ্রহণে আগ্রহী হয়। এ জেলার অনেক লোক গেল শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ইংলন্ডের ‘রাণির ভাউচারে’ ঝুঁকি নিয়ে লন্ডন যাওয়ার যায়। ক্রমে ‘লন্ডনী রোজী’/আয় এ অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ও বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। আশির দশকে নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের সহজে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া শুরু করে।

প্রবাসী আয় নির্ভর একটি সমাজও গড়ে ওঠে। গ্রামীণ মানুষের জীবন-যাত্রায়ও ভোগ-বিলাশ বাড়তে থাকে। কিন্তু এই আয় দিয়ে কেউ-ই উচ্চ শিক্ষার প্রসার ঘটাতে কিংবা ভারী শিল্প কারখানা গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়নি। প্রবাসী ধনীরাও উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। তবে তারা ধর্মীয় কাজে কিংবা কোনো উৎসবে টাকা দিতে কসুর করেনি। ‘লন্ডনী সাব’রা [সাহেব] নিজের আত্মীয় স্বজনকে- বিশেষত পরিবার-পরিজনকে/ বৈবাহিকসূত্রে ইংলেন্ড নিতে আগ্রহী ছিলেন। ফলে অসংখ্য পরিবার বিদেশী টাকার ওপর নির্ভর হয়ে শিক্ষা ও কাজকর্মকে গৌণ মনে করেছে। অসংখ্য তরুণ ‘লন্ডন’ যাওয়ার নীল স্বপ্নজালে জড়িয়ে পড়ে আবার হতাশার সাগরে সাঁতারও দিয়েছে।

কিন্তু চাকরি গ্রহণ করতে বা হাতে কলমে কাজ শিখতে তারা অনীহা দেখায়। স্থানীয় পর্যায়ে পর-অর্থনির্ভর জীবনযাত্রা ব্যাপক হারে দেখা যায়। অর্থে পরিবারের মান বাড়লেও শিল্প-প্রতিষ্ঠান না থাকায় অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য দেখা যায়নি- বরং অল্পশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে; আবার কৃষিতেও মন বসাতে পারেনি তারা। অনেকে বিত্ত-বেসাত বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে সুখের আশায় গেলেও অকালে কপালে ভাঁজ পড়েছে। স্থানীয় শ্রমের বাজার ও চাকরির বাজার গ্রহণ করেছে অন্য জেলার মানুষ [নানা পরিচয়ে]। যে কারণে স্থানীক বেকারত্ব বেড়েছে অধিক মাত্রায়।

মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়- প্রশাসনিক কারণে মৌলভীবাজার আদিকাল থেকে ‘শ্রীহট্ট মণ্ডলে’ যুক্ত ছিল। অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেট জেলা সংলগ্ন মৌলভীবাজার সর্বদা যুক্ত থাকে সিলেটের প্রশাসনিক ইউনিটে। এককালে মৌলভীবাজারের কিছু অংশ ত্রিপুরা রাজার অধীনে ছিল। আজকের মৌলভীবাজার ১৮৮২ সালে ‘শ্রীহট্ট’ জেলা হতে ‘দক্ষিণ শ্রীহট্ট’ মহকুমা নাম ধরে যাত্রা করেছিল। ১৯৬০ সালে নামাকরণ হয় ‘মৌলভীবাজার মহকুমা’। ১৯৮৪ সালে ‘মৌলভীবাজার জেলা’ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে জেলার আয়তন ২,৭৯৯.৩৯ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারী হিসেবে জেলার লোক সংখ্যা ১৯,৯৯,০৬২ জন। শিক্ষার হার ৫১.১%।

একুশ শতকে বিশ্বায়নের প্রভাব মৌলভীবাজারের সনাতনী কৃষি পদ্ধতি ও প্রবাসী আয় নির্ভর অর্থনীতির অনেকটা ধাক্কা খায়। যে কারণে জীবনধারা বদলাতে শুরু করে এবং যুবকদের মধ্যে বিভিন্ন পেশা গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এতকাল এ জেলা থেকে বহির্জগতে কেবল চা ও আগর বিদেশে রপ্তানির একমাত্র খাত ছিল। ক্রমে তার সাথে যুক্ত হতে থাকে স্থানীয় উৎপাদিত ‘নাগা-মরিচ’, ‘খাসিয়া পান’, মাছ, কুচিয়া [মাছ জাতীয়], লেবু ও রাবার তৈরির প্রাথমিক উপাদান ইত্যাদি রপ্তানি। এভাবে নতুন আয়ের দ্বার উন্মোচিত হতে থাকে।

মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য, ইতিহাস যদি আমরা দেখি, সেখানেও দেখা যাবে গুরুত্বপুর্ণ তথ্য। শতাব্দীর সূচনায় রাজমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি, কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন, ডকোরেটার্স, রান্নার পাচক হওয়া ইত্যাদি পেশা ও কাজে মানুষ জড়াতে থাকে। কুমিল্লার লোকজন নিয়ে আসে নার্সারি ব্যবসা। স্থানীয়ভাবে মাল্টা ফল ও আনারস উৎপাদন চোখে পড়ার মতো হয়ে যায়। বড়বড় মৎস খামার গড়ে ওঠে। তার পাশাপাশি ছোট পুঁজি দিয়ে ডেইরি ফার্ম কিংবা পেল্টি ফার্ম করার দিকে জন-আগ্রহ বাড়তে থাকে। আবার কাঠ জাতীয় গাছ বৃক্ষ লাগিয়ে বিক্রি করার দিকে অনেক ঝুঁকেন। কিছু নার্সারি গড়ে ওঠায় সনাতনী কৃষি থেকে বের হওয়ার পথ সৃষ্টি হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে ‘কলের লাঙ্গল’ ও ধান ‘মাড়ায়ের কল’ গ্রামে চলে আসে। এগুলো এই জেলার জন্য নতুন ব্যবসা। 

মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্য, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়- একটা সময় কৃষিকাজ থেকে মানুষ দ্রুত সটকে পড়ে। গ্রামীণ যুবকরা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়ার ফলে এককালের কৃষিজমিতে চাষাবাদ কমে যায়। আগের একফসলি বা দুই ফসলি ধানী জমিকে তিন ফসলী করার উদ্যোগ অনেক জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে চাউল ও সজ্বি কিনে খাওয়ার সংখ্যা গ্রামে বাড়ছে।

চলবে...

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

 দীপংকর মোহান্ত, লেখক ও গবেষক।

  • আইনিউজে এই লেখাটি ধারাবাহিকভাবে চলবে। এতে উঠে আসবে মৌলভীবাজারের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিসহ আড়ালে পড়ে যাওয়া বিভিন্ন তথ্য। প্রতি শুক্রবার এই লেখাটির এক পর্ব আইনিউজে প্রকাশ করা হবে। কালের প্রবাহে চাপা পড়ে যাওয়া এই স্বয়ংসম্পূর্ণ তথ্য জানতে থাকুন আইনিউজের সঙ্গেই।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়