ঢাকা, শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৫ ১৪২৭

রিপন দে

প্রকাশিত: ২১:২৭, ১৫ মে ২০২০
আপডেট: ১৫:৪২, ১৬ মে ২০২০

মা-শাশুড়িকে হারিয়েও করোনার যুদ্ধে পিছিয়ে যাননি এই চিকিৎসক

বাংলাদেশে করোনাররোগী ধরা পরার পর মূলত চিকিৎসদের করোনা যুদ্ধ শুরু হলেও অনেকের তা করতে হয়েছে আরও আগে থেকে। যখন চীনে করোনা ধরা পরে তখন থেকেই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে যাদেরকে যুক্ত করা হয় তাদের একজন ডা. রোকসানা ওয়াহিদ রাহী। তিনি মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার এবং মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক আব্দুল ওয়াহিদ ও মৌলভীবাজারের সাবেক নারী সংসদ সদস্য হোসেনে আরা ওয়াহিদ দম্পতির সন্তান।

শুরু থেকেই ছুটে চলেন মৌলভীবাজারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজে বা বিভিন্ন ট্রেনিংসহ নানা কাজে এই ভীতিকর পরিস্থিতিতেও যেতে হয়েছে ঢাকা-সিলেটসহ মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায়, এর মধ্যে হারিয়েছেন তার মা এবং শাশুড়িকে। পরিবারের দুইজন মানুষের মৃত্যুও তার মনোবল নষ্ট করতে পারেনি। কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন এবং করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেও গেছেন তাদের সংস্পর্শে, তাই সময়ে সময়ে নিজেকেও রেখেছেন কোয়ারেন্টাইনে। ছোট দুটি বাচ্চাদের থেকেও থেকেছেন দূরে।

জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে যখন রাতে বাসায় ফিরেন ইচ্ছে থাকলেও যাদের জন্য সারা দিন অস্থির হয়ে থাকেন তাদেরকে ঠিক মত কোলে নিতে পারেননি। মনে অজানা ভয় কাজ করে যদি নিজের অজান্তে বাসায় করোনারভাইরাস নিয়ে যান। মা অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন সিলেটে । রাতে মায়ের কাছে থেকে দিনে আবার ডিউটি করেছেন মৌলভীবাজার এসে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূর থেকে। নিজের করোনা ঝুঁকিতে থাকায় শাশুড়ীর মৃত্যুর সময়েও কাছে যেতে পারেন নি। তবে ডা. রোকশানা ওয়াহিদের কাছে দেশটাই নিজের পরিবার আর নিজের দায়িত্ব পালন করাই ধর্ম।

নিজের এই খারাপ মুহুর্ত এবং কাজের বিষয়ে আই নিউজের সাথে কথা বলেছেন ডা. রোকশানা ওয়াহিদ রাহী। তিনি বলেন, ‘আমার যুদ্ধটা শুরু হয়েছিলো সেই ডিসেম্বর মাস থেকে , চীনের উহানে তখন সংক্রমণ আর মৃত্যুর মিছিল গুনছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বের সকল দেশকে সতর্ক করে দিচ্ছেন এই সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

আমাদের দেশেও শুরু হল করোনা মোকাবেলার প্রস্তুতি। আমাদের স্বাস্থ অধিদপ্তরও কাজ শুরু করলেন। সবকিছুই তখন নতুন করে শুরু করা। আমি তখন একটা ট্রেনিংয়ে ঢাকাতে। সেখানে স্যারদের উদ্বেগ উৎকন্ঠা দেখি, উনারা ট্রেনিংয়ে সময় দিতে পারছিলেন না- অতিথি হিসেবে। কারণ করোনা বিষয়ক মিটিং চলছিলো সব বড় বড় মহলে। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরসহ নানা জায়গায়। তখন সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারেনি কি বিপর্যয় আসছে এবং অনেকের ধারণা ছিল বাংলাদেশে হয়তো করোনা আসবেনা। কিন্তু সিরিয়াসভাবে আমার কাজ শুরু হয়ে গেলো করোনার বিরুদ্ধে।

চিন থেকে ফেরা বেশ কিছু ছাত্রদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত কার্যক্রম শুরু হল। মৌলভীবাজার জেলার স্বাস্হ্য বিভাগের কমিটির ফোকাল পার্সন হিসেবে শুরু হলো আমার যুদ্ধ, প্রতিদিন মিটিং রিপোর্টিং, ভিডিও কনফারেন্স। এর মধ্যে আমাদের জেলার তিনটি স্থল বন্দরে পাঠানো হলো মেডিকেল টিম, তাদের কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং মনিটরিং করার মধ্য দিয়ে কাজের গতি আসল। জেলার ৭ টি উপজেলার মানুষের জন্য তৈরি করা হল আইসোলেশন বেড। রাজনগরে সাধারণ মানুষ আইসোলেসন বেড প্রস্তুতে বাধা দিলো। অনেক ঝামেলার পর সাধারণ মানুষকে বুঝানো গেলো। এর মধ্যে ৯মাস ১০বছর পর্যন্ত দেশের সকল শিশুকে হামে রুবেলা টিকা দেবার বিশাল কাজের দায়িত্ব। যদিও পরে সেটা বাতিল হয় । করোনার বিভিন্ন প্রস্তুতি নিতে নিতেই কেটে যায় সময়। এর মধ্যে আসে পারিবারিক ঝড়।

ফেব্রুয়ারির একেবারে শেষের দিকে আমার আম্মা যিনি বেশ কিছুদিন কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন, উনার শরীর এতো খারাপ হয়ে গেলো। আম্মাকে নিয়ে রাতেই ছুটলাম সিলেট। কিন্তু আম্মার পাশে থাকার কেউ নাই। আমার ভাইবোন থাকেন ইংল্যান্ডে। শুধু ছোট ভাই টা পাশে আব্বা আম্মার, আমার স্বামী নিজেও ডাক্তার। ডাক্তারদের সব ছুটি বাতিল করেছে সরকার। অন্যদিকে আমার এত কাজের চাপ। যদিও আমাদের সিভিল সার্জন স্যার আমাকে বলেছিলেন যতটা পারেন তিনি আমাকে সাহায্য করবেন, আমি যেনো আম্মাকে খেয়াল রাখি। কিন্তু এত কাজ মাথায় থাকলে কি আর বসে থাকা যায়? ছোট দুটি বাচ্চা নিয়ে রাতে মায়ের কাছে থেকেছি, দিনে আবার মৌলভীবাজার এসে কাজ করেছি ।

এর মধ্যে ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়- আমার মা তখনও সিলেটে ভর্তি। রোগী সনাক্ত হবার পর আমাদের কাজের গতি আরও বেড়ে যায। দিনরাতে শ্বাস নেবার সময় নেই। জেলা-উপজেলার পর্যায়ে প্রতিদিন বিভিন্ন মিটিং সমন্বয়য় করাসহ নানা কাজে চাপে কিছুই আর খেয়াল করতে পারছিনা। অন্যদিকে প্রবাস থেকে ভাইবোন আসতে পারছেন না। এর মধ্যে প্রতিদিন শতশত বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হচ্ছে। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় কল আসতে থাকে- উনি বের হয়ে গেছেন, সে কোয়ারেন্টাইন মানছেনা। ছুটে যেতে হয়েছে প্রতিটি ফোনে।

এদিকে আমার আম্মুর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু আমি সময় দিতে পারছিনা। একদিন সন্ধ্যায় আম্মুর অবস্থা খুব খারাপ শুনে সোজা চলে যাই সিলেট হাসপাতালে। গিয়ে দেখি সবার মাঝেই আতংক। আইসিইউ জরুরি, কিন্তু যে হাসপাতালে ছিলেন সেখানে আইসিইউ’তে উনারা ১ঘন্টা ডায়ালাইসিস করে বন্ধ করে দিলেন। করোনা সন্দেহে ভর্তি রাখতে চাইলেন না। কোন জ্বর কাশি ছিলো না। বারবার বলি আমার আম্মা কোন বিদেশ ফেরতের সংস্পর্শেও যাননি। উনারা তাতেও রাজি হলেন না।

পরে প্রাক্তন স্বাস্হ্য বিভাগ সিলেটের ডিডি স্যার দেবপদ রায় ও ওসমানি মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু স্যার আমাদের সাহায্য করেছিলেন। তবুও ডায়ালাইসিস করাতে পারবো না। তাই রাত ৩টায় আমরা আম্মাকে নিয়ে চলে আসি মৌলভীবাজার। পরের দিন মৌলভীবাজার হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করানো হয়। কিন্তু আমি কাছে যেতে পারিনি। কারণ আমি অনেকের সাথে মিশতেছি প্রতি মুহুর্তে । এদিকে নিজের ডিউটি। স্বামী ডাক্তার, তিনিও ডিউটিতে। বাচ্চারা বাসায় একা।

আম্মু অসুস্থ কিন্তু এর মধ্যে খবর আসে ট্রেনিং নিয়ে ঢাকা যেতে হবে। করোনা বিষয়ক প্রশিক্ষণে যেতে হল ঢাকা। অসুস্থ আম্মার কাছে বাচ্চাদের রাখতাম। ডিউটি থেকে ফিরে আম্মুর বাসায় গিয়ে গোসল দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় ফিরতাম যেদিন মনে হত একটু নিরাপদ আছি। যেদিন মনে মনে সন্দেহ হত- সেদিন একাই থাকতাম বাচ্চাদের ছাড়া। যদিও এটা নিজেকে একটু শান্তনা দেওয়া। কারণ একদিনে করোনার উপস্থিতি আসেনা। কিন্তু কি করব আমার বাচ্চাদের ছাড়া আমি থাকতে পারতাম না। এরই মধ্যে ৬ এপ্রিল সেদিন ডিজি স্যারের সাথে ভিডিও কনফারেন্স শেষে স্যারের সাথে রাজনগরের করোনা রোগীর বাড়ি লকডাউন এসব পরিদর্শনে যাওয়ার কথা , তখনই ফোন আসে ডায়ালাইসিস শেষ মুহুর্তে আম্মার শরীর খারাপ দৌঁড়ে যাই । এর পরের মুহুর্ত আর কিছুই বলতে পারবনা। আম্মা বিদায় নিলেন চিরদিনের মত। কিন্তু আফসোস আম্মার পাশে একদিন ভাল করে বসতেও পারিনি।

যেনো করোনা সংক্রমণ না হয় তাই কাছে গেলেও নিরাপদ দুরুত্বে থাকতাম । এর পরের ২সপ্তাহ কিছুই করার শক্তি পাইনি ,তবু মোবাইলে চিকিৎসা সেবা দেয়া, অফিসের কাজ যতোটুকু পারি করেছি। বাদ দিতে পারিনি। পরিবারের সবাই যখন ভেঙ্গে পড়েছেন, এর মধ্যে আমি অফিস শুরু করি, যাদের সংস্পর্শে আসি তাদের মধ্যে দুজনের পজিটিভ আসে। চলে গেলাম কোয়ারেন্টাইনে। আম্মু নেই। কার কাছে বাচ্চাদের রাখব তাদের বাবাও করোনার আইসোলেশন ইউনিটে ডিউটি করেন। ঝুঁকি নিয়ে নিজের কাছেই রাখতে হল। যখন নিজেকে করোনার ঝুঁকিতে তখন বাচ্চাদের পাশে রাখা একটি মায়ের জন্য কি যে কষ্টের এটা সহজে বুঝানো যাবেনা। কিন্তু বিকল্প ছিল আমার শাশুড়ির কাছে রাখা। বিপদ যখন আসে সবদিকেই আসে।

আমার শাশুড়িও অসুস্থ হয়ে গেলেন। এদিকে আবার স্বামীর দুই ভাই ও বিদেশে থাকেন। আর কেউ নেই শাশুড়ির কাছে যাবার- আমরা দুজন ছাড়া। আব্বুকে দেখতে যেতে পারছিনা সংক্রমণ যদি হয় সেই ভয়ে। আমার স্বামীর হাসপাতালে ডাক্তারসহ ৮ জনের করোনা পজেটিভ আসল। এর মানে আমাদের পরিবারের সবাই এখন ঝুঁকিতে। এতো মানসিক চাপ নিতে পারছিলাম না। সব কিছু শুন্য লাগছিল। এর মধ্যে শাশুডড়ির ডায়াবেটিস বেড়ে প্রেসার বেড়ে শরীর খারাপ করে গুরুত অসুস্থ। তাই সিলেটের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমরা স্যাম্পল পাঠাই, কিন্তু আমাদের দুজনেরই কাছে যাওয়া নিষেধ। আমার নিজেরও শরীর খারাপ হয়ে যায়।

জীবনের এমন খারাপ সময় কখনো আসেনি। আমরা আমাদের সবার নমুনা পরীক্ষার করব সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ এই সময়ে আম্মুর (শাশুড়ির) থেকে দূরে থাকা যায়না। রিপোর্ট নেগেটিভ আসলে কাছে যাব সেই অপেক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে তিনি মারা গেলেন । পরিবারের দুইজন মা- এভাবে ১ মাসের ব্যবধানে চলে গেলেন। একটু পাশে থাকতে পারিনি । আমার স্বামীকে জীবনে এতটা ভেঙে পড়তে দেখিনি। বাচ্চারা দাদু, নানীদে নিয়ে বিলাপ করতে থাকল । আমার মনে হয়েছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় আমার জন্যই অপেক্ষা করেছিলো এই করোনাকালে। নিজেকে আর সামলাতে পারছিলাম না। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুইজন পাশাপাশি চুপচাপ বসে থাকি কেউ কাউকে কিছু বলিনা। কে কাকে শান্তনা দেবে এই কঠিন সময়ে তাই নীরবতাই আমাদের সব। এর মধ্যে আরও ৮ ডাক্তার নার্সের রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে । আতঙ্ক থেকে বের হতে পারছিনা। আবারও নমুনা পাঠানো হয়েছে জানিনা কি আসবে। যদি নেগেটিভ আসে আব্বুকে দেখতে যাব। এই মুহুর্তে আর কিছুই বলতে পারছিনা। শুধু মানুষের কাছে দোয়া চাই এবং এটা বলতে চাই- যত সময় জীবিত আছি আমি করোনার এই যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে যাবনা।

 ডা. রাহীর বিষয়ে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. তওহীদ আহমদ আইনিউজকে বলেন, ‘সে খুবই দায়িত্ববান এবং কাজ প্রিয় মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে সে কঠিন মুহুর্ত কাটাচ্ছে। একটার পর একটা বিপদ তার পেছনে লেগেই আছে। মা –শাশুড়িকে হারিয়েছে। এর মধ্যে নিজেও অসুস্থ ছিল। কিন্তু কাজের প্রতি যে দায়িত্ববান থাকে- তাকে জাতির এই কঠিন সময়ে দেখেছি একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধার মত। যখনই যে কাজ দেওয়া হয় সে সুন্দর করে সঠিক সময়ে করে ফেলে। তার জন্য আল্লার কাছে দোয়া করছি এই কঠিন মুহুর্তে সে যেনো মানসিক শক্তি পায়।’

 

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়