ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১০ ১৪৩৩

রুপম আচার্য্য

প্রকাশিত: ১০:৫২, ১২ আগস্ট ২০২৬
আপডেট: ১৫:৪৫, ১২ আগস্ট ২০২৬

গাছের বাকলে জীবনের গল্প বলে পাকড়া কাঠঠোকরা

খোকন থৌনাওজামের ক্যামেরায় গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় ধরা দিল একটি কাঠঠোকরা।

খোকন থৌনাওজামের ক্যামেরায় গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় ধরা দিল একটি কাঠঠোকরা।

সবুজ অরণ্যের নীরবতায় হঠাৎ ঠকঠক শব্দ। শব্দের উৎস খুঁজতে চোখ গেলে দেখা যায়, গাছের কাণ্ড কিংবা ডালে এক ছোট্ট পাখি ঠোঁট দিয়ে অনবরত আঘাত করছে। কখনো কাণ্ড বেয়ে ওপরে উঠছে, কখনো ডালের নিচে ঝুলে পড়ছে। গাছের বাকলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পোকামাকড়ের সন্ধানে তার এই নিরন্তর কর্মযজ্ঞ।

প্রকৃতির নীরব কারিগর Fulvous-breasted Woodpecker

​​​​ছবিতে ধরা পড়া এমনই এক ব্যতিক্রমী মুহূর্তের পাখিটি পাকড়া কাঠঠোকরা, ইংরেজিতে Fulvous-breasted Woodpecker। এর বৈজ্ঞানিক নাম Dendrocopos macei। পাখিটি কাঠঠোকরা গোত্রের (Picidae) একটি মাঝারি আকারের প্রজাতি, যা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত।

রঙে-রূপে আলাদা পরিচয়

পাকড়া কাঠঠোকরার শরীরের ওপরের অংশ প্রধানত কালো, যার ওপর সাদা দাগ ও আড়াআড়ি রেখা রয়েছে। বুক ও পেটের অংশে দেখা যায় হলদে-বাদামি বা ফালভাস রঙ, আর লেজের নিচের অংশে লালচে আভা থাকে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই পাখিটিকে অন্যান্য কয়েকটি কাঠঠোকরা থেকে আলাদা করে চেনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

পুরুষ ও স্ত্রী পাখির মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। সাধারণভাবে পুরুষের মাথার মুকুটে লাল রঙ থাকে, আর স্ত্রী পাখির মাথার মুকুট কালচে। তবে মাঠপর্যায়ে পাখি শনাক্ত করতে শুধু একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর না করে শরীরের সামগ্রিক গঠন, পালকের নকশা ও বিস্তৃতি বিবেচনা করা হয়।

ঠোঁটই যেন তার হাতিয়ার
কাঠঠোকরার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ঠোঁট। পাকড়া কাঠঠোকরাও গাছের বাকল ও কাণ্ডে ঠোকর মেরে ভেতরে থাকা পোকামাকড়ের সন্ধান করে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এদের খাদ্যতালিকায় পোকামাকড়, কীটপতঙ্গের লার্ভা, পিঁপড়া, উইপোকা, ঘাসফড়িং, বিটলসহ নানা ছোট প্রাণী থাকে। সুযোগ পেলে ফল ও বেরিও খেতে পারে।

গাছের কাণ্ড, ডাল ও পাতার আশপাশে এরা খাবার খোঁজে। কখনো আবার মাটিতেও নেমে আসে, বিশেষ করে পিঁপড়া বা উইপোকার মতো খাবারের সন্ধানে। ফলে পাখিটির খাদ্যাভ্যাস শুধু তার নিজের জীবনধারণেই ভূমিকা রাখে না, বন ও বৃক্ষভিত্তিক বাস্তুতন্ত্রে পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।

উল্টো হয়ে ঝুলতেও পারে অনায়াসে
খোকন থৌনাওজামের তোলা ছবিটিতে পাখিটিকে একটি ডালের নিচে মাথা নিচের দিকে রেখে ঝুলতে দেখা যায়। কাঠঠোকরাদের পায়ের গঠন ও শক্ত নখর গাছের কাণ্ড ও ডাল আঁকড়ে ধরার উপযোগী। এ কারণে তারা গাছের গায়ে উল্লম্বভাবে চলাফেরা করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডালের নিচের অংশেও খাবারের সন্ধান চালাতে পারে।

ছবির এই মুহূর্তটি তাই শুধু নান্দনিক নয়, পাখিটির স্বাভাবিক অভিযোজন ও খাদ্য অনুসন্ধানের দক্ষতারও একটি চমৎকার উদাহরণ।

গাছই তার খাদ্যভাণ্ডার, আবার গাছেই বাসা
পাকড়া কাঠঠোকরা সাধারণত বন, উন্মুক্ত বনভূমি, আর্দ্র নিম্নভূমির বন, পাহাড়ি বন এবং গাছপালায় সমৃদ্ধ বিভিন্ন আবাসস্থলে দেখা যায়। মানুষের বসতির কাছাকাছি বড় গাছ থাকা গ্রামীণ এলাকা, বাগান ও কৃষিজমির আশপাশেও এদের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে।

কাঠঠোকরাদের জীবনে পুরোনো ও মৃত গাছেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পাকড়া কাঠঠোকরা গাছের কাণ্ড বা ডালে নিজেরাই গর্ত তৈরি করে বাসা বানাতে পারে। বাংলাদেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিচালিত এক গবেষণায় এ প্রজাতিকে গাছের গর্তে বাসা করা পাখিদের মধ্যে পাওয়া গেছে এবং বাসার গর্ত নিয়ে অন্যান্য পাখির সঙ্গে প্রতিযোগিতার ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে এদের প্রজনন মৌসুম সাধারণত বছরের শুরুর দিক থেকে বসন্তকাল পর্যন্ত বিস্তৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাসার গর্তে কয়েকটি সাদা ডিম পাড়ে এবং বাবা-মা উভয়েই ডিমে তা দেওয়া ও বাচ্চার যত্নে অংশ নেয়।

বাংলাদেশের পরিচিত এক আবাসিক পাখি
বাংলাদেশের পাখির তালিকায় পাকড়া কাঠঠোকরার অবস্থান বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত। দেশের সাম্প্রতিক আইইউসিএন রেড লিস্টেও Dendrocopos macei-কে বাংলাদেশে Least Concern (LC) বা ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বৈশ্বিকভাবেও প্রজাতিটির সংরক্ষণ অবস্থা Least Concern।

তবে ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ মানেই যে পাখিটির আবাসস্থল নিরাপদ, এমন নয়। পুরোনো গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলা, বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাওয়া এবং কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে পোকাভুক পাখিদের খাদ্যভাণ্ডার ও আবাসস্থলে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে কাঠঠোকরাদের জন্য বড়, পুরোনো ও মৃতপ্রায় গাছ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব গাছে পোকামাকড় পাওয়া যায় এবং একই সঙ্গে বাসা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নরম বা ফাঁপা অংশও তৈরি হয়। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু বন রক্ষা নয়, প্রাকৃতিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো গাছ সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতির ছোট্ট এক কর্মী
পাকড়া কাঠঠোকরাকে হয়তো অনেকেই সাধারণ একটি পাখি হিসেবে দেখেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, গাছের কাণ্ডে তার প্রতিটি ঠোকর প্রকৃতির একটি বড় প্রক্রিয়ার অংশ।

সে পোকামাকড় খুঁজে বেড়ায়, গাছের গায়ে গর্ত তৈরি করে, সেই গর্ত কখনো তার নিজের বাসা হয়, আবার পরবর্তী সময়ে অন্য পাখির আশ্রয়ও হতে পারে। অর্থাৎ একটি কাঠঠোকরার উপস্থিতি একটি গাছের সঙ্গে বহু প্রাণীর সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

সবুজের ভেতরে তাই পাকড়া কাঠঠোকরার ঠকঠক শব্দ কেবল একটি পাখির ডাক বা খাদ্য অনুসন্ধানের শব্দ নয়। এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রের চলমানতারও বার্তা।

খোকন থৌনাওজামের ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবিটি সেই অদৃশ্য গল্পেরই এক মুহূর্তকে সামনে নিয়ে এসেছে। ডালের নিচে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা ছোট্ট পাখিটি যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য অনেক সময় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার স্বাভাবিক আচরণের মধ্যেই।

ছবি: খোকন থৌনাওজাম, বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়