ঢাকা, সোমবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৪ ১৪২৭

শ্যামলাল গোঁসাই

প্রকাশিত: ১৬:০১, ২ জানুয়ারি ২০২১
আপডেট: ১৬:১৯, ২ জানুয়ারি ২০২১

বিউটি বোর্ডিংয়ের পরতে পরতে লেগে আছে মানুষগুলোর স্মৃতি

ছবি: অনলাইন

ছবি: অনলাইন

বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য এবং মুক্তির সংগ্রাম সবকিছুর সাথে জড়িয়ে আছে বিউটি বোর্ডিং। কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিকর্মীসহ অনেক ঐতিহ্য আর মানুষের স্মৃতি নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা বিউটি বোর্ডিং তাই এক ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসের নাম।

ঢাকার পুরনো অংশের বাংলা বাজারে ১নং শ্রীশদাস লেনের বিউটি বোর্ডিং অতীতে নিঃসন্তান এক জমিদারের বাড়ি ছিলো। পরে সেখানেই ভারত ভাগের পূর্বে গড়ে ওঠে ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকা। যেখানে কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা ছাপা হয়।

কিন্তু দেশ ভাগের পরে পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়ায় বাড়িটি আবারও খালি হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র সাহা এবং নলিনী মোহন সাহা নামের দুই ভাই এই বাড়িতে বোর্ডিং ব্যবসা শুরু করেন। প্রফুল্ল বাবুর বড় মেয়ে বিউটির নামে নাম দেওয়া হয় বোর্ডিংয়ের। সেই থেকে যাত্রা শুরু করে বিউটি বোর্ডিং।

এই বাড়িতে গড়ে ওঠা 'সোনার বাংলা' পত্রিকায় কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা ছাপা হয়।

শুরুতেই পত্রিকা অফিস থাকায় বিউটি বোর্ডিং এর যাত্রার সূচনা থেকে সেখানে কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ আর সাংস্কৃতিক কর্মীদের আনাগোনা ছিলো। ধীরে ধীরে এই জায়গাটিই হয়ে যায়স সকল সৃজনশীল মানুষদের আড্ডার প্রধান জায়গা। বিউটি বোর্ডিং-ও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে থাকে আমাদের ইতিহাসে।

বিউটি বোর্ডিংয়ের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় দেশের সকল হামবড়া সাহিত্যিকদের মিলনকেন্দ্র ছিলো এই জায়গাটি। কে আসেন নি এই বিউটি বোর্ডিংয়ে।

এখানে যারা আড্ডার আসরে আসতেন এদের মধ্যে কবি শামসুর রাহমান, রণেশ দাশগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়া মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাস, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, ইমরুল চৌধুরী, সাদেক খান, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শফিক রেহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুর হক, জুয়েল আইচ প্রমুখ।

বিউটি বোর্ডিংয়ে খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকরা এখন আর না আসলেও ভোজনরসিক এবং ইতিহাস সন্ধানী মানুষজন একটু খানি সময় পেলেই চলে আসেন এখানে

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই ঐতিহাসিক স্থানে এসেছিলেন পল্লীকবি জসিমউদ্দীন ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতে দিতেই অনেকের কলম হয়ে বেরিয়ে আসত বিখ্যাত কোনো লেখা বা কোনো মহৎ পরিকল্পনা। অনেকেই তাদের জীবনের সেরা অনেক লেখা লিখেছেন এই আড্ডায় বসে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে আড্ডা জমানোর জন্য প্রথম পদক্ষেপ নেন কবি বেলাল চৌধুরী ও শহীদ কাদরী। এরপর একে একে আসেন আরো অনেকে। এই আড্ডায় বসেই সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন তার বিখ্যাত সাহিত্যকর্মগুলো, যার মধ্যে অন্যতম আরণ্যক, অনুপম দিন, এক মহিলার ছবি, কয়েকটি মানুষের সোনালী ছবি, জনক ও কালো কফিন, সীমানা ছাড়িয়ে ও রক্ত গোলাপ। চলচ্চিত্র পরিচালক আব্দুল জব্বার খান এখানে বসেই লিখেছিলেন বিখ্যাত প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর স্ক্রিপ্ট। ‘কাঁচের দেয়াল’-এর স্ক্রিপ্ট, সমর দাসের বহু বিখ্যাত গানের সুর এখানে বসেই করা। বিভিন্ন সময়ে এখানে আরো এসেছেন খালেদ চৌধুরী, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, নির্মলেন্দু গুণ, ব্রজেন দাসসহ অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব।

প্রগতিশীল লেখকদের নিয়মিত আড্ডার জের ধরে বিউটি বোর্ডিং একাত্তরে হায়েনাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরের দৃষ্টিতে পড়ে যায় এটি। প্রগতিশীলদের হত্যা করতে প্রতিক্রিয়াশীল এই চক্র একাত্তরের ২৮ মার্চ সকাল ১০টার কিছু পর হঠাৎ অভিযান চালায় এখানে। বোর্ডিংয়ের মালিক প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা, সন্তোষ কুমার দাস, হেমন্ত কুমার সাহা, অহিন্দ চৌধুরী শংকর, প্রভাত চন্দ্র সাহা, নির্মল রায় খোকা বাবু, হারাধন বর্মণ, প্রেমলাল সাহা, কেশব দেউ আগরওয়ালা, শামস ইরানী, যোসেফ কোরায়া, শীতল কুমার দাস, অখিল চক্রবর্তী, সাধন চন্দ্র রায়, সুখরঞ্জন দে, ক্ষিতীশ চন্দ্র দে, নূর মোহাম্মদ মোল্লাসহ ১৭ জনকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা।

পরে রাজাকারদের দখলে চলে যায় এটি। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় এটি বন্ধ থাকে। যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রহ্লাদ সাহার দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহা দেশে ফিরে বিউটি বোর্ডিং পুনরায় চালু করেন।

বিউটি বোর্ডিংয়ের ঐতিহ্য মনে করিয়ে দিতে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বোর্ডিংটির জরাজীর্ণ দোতলা ভবনটি। এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বিখ্যাত মানুষগুলোর স্মৃতি। লেগে আছে তাদের স্মৃতিময় স্পর্শ।

কালের সাক্ষী বিউটি বোর্ডিং আজও দাঁড়িয়ে আছে অতীত স্মৃতির স্পর্শ নিয়ে

তবে বিউটি বোর্ডিং আছে কিন্তু সেখানে প্রাণস্পন্দন আর নেই। কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণা আজ আর নেই। এখন আর জমে উঠে না সরস আড্ডা।

বর্তমানে বাংলাবাজার থেকে বইয়ের ব্যবসা অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে থাকায় এখানে লোকজন কমে যাচ্ছে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানে লোকজনের সমাগম তুলনামূলক বেশি হয়। তার পরও পুরানো স্মৃতি ধরে রাখতে বোর্ডিংটি চালু রয়েছে।

বিউটি বোর্ডিংয়ে এখন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের আড্ডা বা পদচারণ নেই। এ অবস্থায় বিউটি বোর্ডিংয়ের ঐতিহ্য ধরে রাখাটাও হয়ে পড়ে ভাবনার বিষয়। এ অবস্থায় ১৯৯৫ সালে ইমরুল চৌধুরী গড়ে তোলেন ‘বিউটি বোর্ডিং সুধী সংঘ’। তারই তত্ত্বাবধানে ১৯৯৮ সালে ৬০ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের মাধ্যমে ২০০০ সাল থেকে সম্মাননা দেওয়া শুরু হয়। ইতিমধ্যে সম্মাননাপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, কবি রফিক আজাদসহ বেশ কয়েকজন সাহিত্যিক।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়