ঢাকা, শুক্রবার   ১২ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ২৯ ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:১৫, ২ জুন ২০২১
আপডেট: ১০:৪৮, ৩ জুন ২০২১

করোনা মহামারীতে ভারতে বাড়ছে এতিমের সংখ্যা

বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। মহামারির ভয়াবহ সময় পার করছে ভারত। এমন সময়ে দেশটিতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এতিমের সংখ্যা।

৫ বছরের শিশু প্রথম তার ১০ মাস বয়সি ভাই আয়ুশকে নিয়ে বাবা-মায়ের জন্য পথ চেয়ে বসে আছে। কিন্তু তাদের কেউ-ই আর আসে না। বাব-মার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তারা। কিন্তু শিশুটি জানেই না করোনা নামের প্রাণঘাতী ভাইরাস তাদের এতিম করে গেছে। গত এপ্রিলে তারা বাবাকে হারায়। তার কিছু দিন পর মারা যান তাদের মা-ও।

স্বজনরা শিশুদের এখন সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছেন, বাবা-মা কাজের জন্য বাইরে গেছেন। শিগগিরই কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসবেন।

বর্তমানে প্রথম ও তার ভাই আয়ুশ তাদের দাদির কাছে থাকে। এতিমদের নিয়ে কাজ করা দিল্লিভিত্তিক একটি এনজিও এ শিশুদের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে।

ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে ১২ বছরের সোনিয়া ও তার ভাই ৭ বছরের অমিতের সঙ্গে। গত বছর জুনে ভারতে করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ের সময় সোনিয়া-অমিতের বাবা মারা যান। আর কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে এবছর এপ্রিলে মারা যান মা। বর্তমানে তাদেরকে দেখাশোনা করছেন দাদী।

এরকম একটি বা দুটি ঘটনা নয় বরং ভারতজুড়ে বহু শিশুকে এই দুর্ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারী তাদের বাবা-মা দুজনকেই কেড়ে নিয়ে তাদেরকে এতিম করে দিচ্ছে।

ভারতের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি সম্প্রতি এক টুইটে জানান, গত ১ এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত ভারতে অন্তত ৫৭৭টি শিশুর বাবা-মা উভয়ই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

যদিও বিশেষজ্ঞদের ধারনা, এমন শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এতিম হয়ে পড়া এসব শিশুদের সহায়তার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি তহবিল ঘোষণা করেছেন। যে তহবিল থেকে প্রতিটি শিশুকে প্রায় ১০ লাখ রুপি দেয়া হবে। যেটা তারা ১৮ থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত উপবৃত্তির মত পাবে।

ভারতে শিশু দত্তক আইন খুবই কঠিন। সেখানে প্রতিটি রাজ্যে শিশু সুরক্ষা এবং কল্যাণের জন্য একটি কমিশন আছে। কমিশন থেকে প্রতিটি জেলায় কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। যারা দত্তক নেয়া শিশুদের ভালো মন্দের খোঁজ খবর রাখেন। এছাড়া, নানা এনজিও থেকেও কমিশনকে শিশুদের খোঁজ খবর রাখার বিষয়ে এবং কোনও শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে কিনা তার খোঁজ রাখা হয়।

ভারতে জাতীয় পর্যায়ে একটি পোর্টাল আছে যেখানে লোকজন শিশু দত্তক গ্রহণের আগ্রহের কথা জানিয়ে নাম নিবন্ধন করেন। রাজ্যের শিশু কল্যাণ কমিটি পূর্ণ খোঁজখবর নেয়ার পর ‘একটি শিশুকে আইনগতভাবে দত্তক নেয়ার অনুমতি দেয়’।

তবে করোনার কারণে এতিমদের দত্তক নেয়ার হার আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ২০১৯ সালে ভারত থেকে ৬৬ হাজার শিশুকে দত্তক নেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ২০২০ সালে এ সংখা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩৫১ জনে।

‘দিল্লি কমিশন ফর প্রোটেকশন অব চাইল্ড রাইটস’ এর প্রধান অনুরাগ কুণ্ডু বলেন, ভারতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়ে পড়া শিশুদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।

ভারতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন যেমন প্রচুর মানুষ হাসপাতালের শয্যা, অক্সিজেন বা ওষুধ চেয়ে নানা পোস্ট দিচ্ছেন। তেমন কোভিডে বাবা-মা হারা এতিম শিশুদের দত্তক নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েও অনেকে পোস্ট দিচ্ছেন।

কিন্তু এভাবে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি শিশুদের ছবি ও ফোন নম্বর পোস্ট করার ফলে ওই সব শিশুর মানবপাচারকারীদের হাতে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন কুণ্ডু।

তিনি বলেন, তার দল ফেইসবুকে এমন একটি পাতা খুঁজে পেয়েছে যারা অর্থের বিনিময়ে শিশুদের দত্তক দেয়ার প্রস্তাব করছে।

‘আমার একজন কর্মী ওই ফেইসবুক পাতায় দেয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে তারা একটি শিশুর জন্য প্রায় পাঁচ লাখ রুপি চায়। আমরা পুলিশের কাছে ওই গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছি।’

এতিম হয়ে পড়া ওইসব শিশুকে শিশুশ্রম বা যৌনকর্মে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে ভারতজুড়ে অসংখ্য শিশু এখন এতিম হয়ে দুর্বিসহ জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

আইনিউজ/এসডিপি 

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়