ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

কাজী এ আজাদ

প্রকাশিত: ২১:২৪, ১২ নভেম্বর ২০২১

সালিম আলী : দ্যা বার্ডম্যান অব ইন্ডিয়া

সালিম আলী

সালিম আলী

‘ছোটবেলায়ই মামার কাছ থেকে একটি এয়ারগান উপহার পান। সেটা দিয়ে নানা ধরনের পাখি শিকার করে বেড়াতেন। তো একদিন একটু চড়ুই শিকার করে সেটা হাতে নিয়ে দেখেন তার গলায় হলদে দাগ, যা অন্য চড়ুইয়ের মাঝে দেখেননি। দৌড়ে মামার কাছে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন এই পাখিটা হালাল কিনা। ’

সত্যজিৎ রায়  ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমার একটা দৃশ্যের জন্য একটি বিশেষ নামের পাখি খুঁজছিলেন। এক বৃদ্ধ এসে সত্যজিৎ রায়কে বললেন, আপনি আসলে কোন পাখি খুঁজছেন। 

সত্যজিৎ রায় বললেন, পাখির নাম হিমালয়ান বার্ড। 

বৃদ্ধ বললেন, ওই নামের কোনো পাখি নেই। 
সত্যজিৎ রায় বললেন, আছে।

বৃদ্ধ  বললেন, আমি বলছি নেই এবং অবশ্যই নেই।

সত্যজিৎ রায় বৃদ্ধের দিকে তাকালেন। মুখে সাদা সাদা দাড়ি, গালটা ভাঙা, শরীরে দুই পয়সার শ্রী নেই। দেখলে মনে হয় পাগল। সত্যজিৎ রায় বিরক্ত হয়ে সহকারীকে বললেন,  এই বুড়োকে সরিয়ে দাও। 

সহকারী বুড়ো লোকটিকে শুধু সরিয়ে দিলেন না, গাড়িতে তুলে দিলেন। তারপর সত্যজিৎ রায়ের কাছে এসে বললেন, বুড়োটাকে সরিয়ে দিয়েছি।

এর কিছুক্ষণ পর সহকারী পরিচালক হন্তদন্ত হয়ে সত্যজিৎ রায়ের রুমে ঢুকে বললেন, ভারতবর্ষের খ্যাতিমান পক্ষীবিশারদ সালিম আলী  আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি কোথায়?

সত্যজিৎ রায় বললেন, দেখতে কেমন?

বুড়ো, মুখে দাড়ি, গালটা ভাঙা।

সত্যজিৎ রায় লজ্জায় মাথাটা নিচু করে বললেন, তাকে তো পাগল মনে করে তাড়িয়ে দিয়েছি। কী লজ্জা!

ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ পক্ষী বিশারদ ড. সালিম আলী

ড. সালিম আলীকে এক বাক্যে মান্য করা হয় ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ পক্ষী বিশারদ হিসেবে। সালিম আলীর জন্ম ১৮৯৬ সালের ১২ নভেম্বর। ছোটবেলায় পিতামাতা হারিয়ে মামার আশ্রয়ে লালিত পালিত হতে থাকেন। মামা আমিরুদ্দিন ছিলেন নামকরা শিকারী। ছোটবেলায়ই মামার কাছ থেকে একটি এয়ারগান উপহার পান। সেটা দিয়ে নানা ধরনের পাখি শিকার করে বেড়াতেন। তো একদিন একটু চড়ুই শিকার করে সেটা হাতে নিয়ে দেখেন তার গলায় হলদে দাগ, যা অন্য চড়ুইয়ের মাঝে দেখেননি। দৌড়ে মামার কাছে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন এই পাখিটা হালাল কিনা। মামা নিজেও চিনতে পারেননি। তাকে পাঠিয়ে দেন বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সেক্রেটারি ওয়াল্টার স্যামুয়েল মিলার্ডের কাছে। মিলার্ড তাকে পাখিটির আসল পরিচয় বলে দেন। মিলার্ড সালিম আলীকে তার সংগ্রহে থাকা বিভিন্ন ধরনের পাখির স্টাফ করা দেহ দেখান। সোসাইটির ভিতরে দেওয়াল জুড়ে মাউন্ট করা জীবজন্তু, শো কেসে সাজানো প্রজাপতি ও পাখির ডিম, দেওয়ালে টাঙানো চিতাবাঘ-বাঘের মাথার খুলি প্রথম বার এই সব দেখে সলিমের ছোট্ট মনে একরাশ বিস্ময় তৈরি হয়। তৈরি হয় কৌতূহল। সেই কৌতূহলই সালিমের জীবন বদলে দিয়েছিল। 

শিক্ষা জীবন স্থগিত রেখে ১৯১৪ সালে সালিম বার্মায় পাড়ি জমান পারিবারিক ব্যবসার প্রয়োজনে। সেখানে কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে বাগানে পাখি দেখে সময় কাটাতেন। বিভিন্ন পাখির খুঁটিনাটির বর্ণনা নোটবুকে লিখে রাখতেন। ১৯১৭ সালে আবার ভারতে ফেরত আসেন অসমাপ্ত পড়াশোনা শেষ করতে। ১৯১৮ সালে বিয়ে করেন তাহমিনাকে।

এরপর তিনি জার্মানি চলে যান৷ সেখান থেকে ১৯৩০ সালে ফেরত এসে পাখি পর্যবেক্ষণ আর গবেষণায় লেগে যান। সাথে ছিলেন স্ত্রী তাহমিনা। সলিম আলীর পূর্বে সারা পৃথিবীতে পাখি বিষয়ক অধ্যয়ন ছিল মূলত চামড়া ছাড়িয়ে স্টাফ করে রাখা ও তার বৈজ্ঞানিক নাম, শরীরের মাপ, পালকের রঙ ইত্যাদি লিখে রাখা। সালিম আলীই প্রথম এর সাথে পাখি যে পরিবেশে থাকে তার পরিচয়, পাখির আচরণ, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদিকে অধ্যয়নের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশ্বের পাখি বিষয়ক গবেষকদের সামনে গবেষণার নতুন জানালা খুলে দেন।

তাঁর ‘বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস’ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৪১ সালে। এই বইটি ভারতীয় পাখিদের সম্পর্কে রঙিন ছবিযুক্ত প্রথম ফিল্ড গাইড। মাঠে গিয়ে পাখি দেখার জন্য গাইড বইয়ের যে প্রয়োজন সে ধারণা ড. সালিম আলীর উদ্ভাবিত। নিজে বই লিখে তিনি নিজের ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাঠে গিয়ে তিনি পাখিদের যেমন দেখেছেন – গতানুগতিক বর্ণনা ও মাপজোকের বাইরে পাখিদের পরিবেশ, স্বভাব, অভ্যাস, আচরণ ও জীবন ধারণের ওপর প্রচুর তথ্য এই বইতে পরিবেশন করেন।

 সালিম আলী পাখি অভয়ারণ্য

প্রাণীদের সমীক্ষার সাথে মূলত যুক্ত ছিলেন তিনি। বিশেষ করে বাবুই পাখির সামাজিক জীবন সম্পর্কে তার গবেষণা ও মুক্ত ভাবনা স্পষ্টতার দিক দিয়ে জুলিয়ান হাক্সলির গবেষণার সঙ্গে তুলনীয়। জীবনে পুরোটা সময় পাখি নিয়ে গবেষণা করেছেন ভারত, পাকিস্তান, বার্মা, বিলেতসহ নানা দেশে। পাখিদের নিয়ে লেখা তার বিখ্যাত বই বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস (১৯৪১)। এছাড়াও ডিলন রিপ্লির সাথে তিনি ১০ খন্ডের হ্যান্ডবুক অব দ্যা বার্ডস অব ইন্ডিয়া এন্ড পাকিস্তান (১৯৬৮-৭৪) তার সেরা কর্ম গুলোর মধ্যে অন্যতম। তিনি "ফল অব এ স্প্যারো" নামে আত্মজীবনী লিখে গিয়েছেন। 

সিডনি ডিলন রিপ্লির সাথে তিনি পাখিদের পায়ে রিং পড়ানোর কাজ শুরু করেন। গবেষণা কার্যে এর ভূমিকা অনেক। কিন্তু এটা করতে গিয়েও তিনি জটিলতার সম্মুখীন হন। অতীতে রিপ্লি  সিআইএ'র একটি সহযোগী সংস্থায় চাকরি করতেন। তাদের দু'জনের নামে অভিযোগ ওঠে যে, তারা যে পাখির পায়ে রিং পরান তা সিআইএ'র একটি পরিকল্পনা অংশ।

তিনি ১৯৫৮ সালে পদ্মভূষণ এবং ১৯৭৬ সালে পদ্মবিভূষণ খেতাব লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি মারা যান। তাকে ডাকা হয় "দ্যা বার্ডম্যান অব ইন্ডিয়া" নামে।

পাখির পাশাপাশি আরেকটি জিনিস তিনি খুবই ভালবাসতেন - মোটরসাইকেল। ১৯৫০ সালে সুইডেনের আপসালাতে পক্ষীবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি সানবীম মোটর সাইকেন চালিয়ে যান, তখন তার বয়স ছিল ৫৪। মোটরসাইকেলটি তিনি বোম্বে থেকে জাহাজে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল উক্ত বাইকে তিনি পুরো ইউরোপ ঘুরে বেড়াবেন। সত্যি সত্যি তিনি ইউরোপের অনেক দেশ ঘুরে বেড়ান ঐ মোটরসাইকেল করে। তার কালেকশনে ছিল হার্লে ডেভিডসনের ৩ টি মডেল, এছাড়াও একটা করে ডগলাস, স্কট, নিউ হাডসন এবং জেনিথ মোটরবাইক চালিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। 

ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট - পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন তার দূর সম্পর্কের কাজিন এবং তার ছোটবেলার খেলার সাথী। 

কলেজে পড়ার সময়ে ড. সালিম আলিকে নিয়ে পত্রিকায় একটি নিবন্ধ পড়েছিলাম। সেই থেকে পাখির প্রতি আমার ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায়। পাখি দর্শনের বিষয়ে উনি আমার আদর্শ৷ পাখি দেখা দারুণ একটি শখের ব্যাপার৷ 

সালিম আলী বলেছেন, ‘People say you cannot make a living from bird watching. That is perhaps true, but, it is also true that man does not live by bread alone. Just look at the people who have no such hobbies and spend all.’ 

আজ (১২ নভেম্বর) এই মহা মানুষের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন দ্যা বার্ডম্যান অব ইন্ডিয়া। 

কাজী এ আজাদ,লেখক 

Green Tea
সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়