বুলবুল আনাম
আপডেট: ২২:১৬, ৬ নভেম্বর ২০২১
পর্ব ২
স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক অঙ্গণ
শ্রীমঙ্গল হানাদার মুক্ত হবার পর সবাই ফিরে আসতে শুরু করলো নিজ ভূমে। বিভিন্ন এলাকায় আইন শৃঙ্খলারক্ষায় ক্যাম্পও স্থাপিত হলো। সবার মাঝে আনন্দ উচ্ছ্বাস বহমান। বিভিন্ন এলাকায় মুক্তির কি উল্লাস আনন্দ, গান বাজনা করে আনন্দ খুশী করার তোড়জোড়, এক্ষেত্রে তারা নিজেরাই তা করছিলোও।
তখন সদ্য মুক্ত শ্রীমঙ্গলে গান-বাজনা করার তেমন কেউ ছিলোনা। কেবল দুজন - ইয়াকুব আলী ও একে আনাম ছাড়া, যিনি যুদ্ধকালীন সময়ে চাকরী ছেড়ে শ্রীমঙ্গলেই বসবাস করতেন। সাংসদ আলতাফুর রহমানের আহ্বানে একে আনামকে তো পাওয়া গেলো কিন্তু ইয়াকুব আলীকে সামনে আনা গেলনা। তার কথা 'যদি মেলেটারী আবার ফিরে আসে'! এনিয়ে প্রচুর হাসাহাসি হলো।
অতএব একে আনামই বিভিন্ন এলাকায় ও ক্যাম্পে গান গেয়ে বেড়ালেন। সমস্যা ছিলো তবলা বাদকের, আনাম ভাইর অভয়ে আমি হলাম তবলা বাদক (!) কোন তবলা শিক্ষা জ্ঞানতো নেই কেবল তালজ্ঞান টুকু সম্বল। মাঝে মাঝে ১/২ টা গানও গাইতাম ফাঁকে ফাঁকে। বিভিন্ন এলাকায় কি উৎসাহ উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা, এলাকাবাসী নিজেরাই ৪/৫ মিনিটের নাটকও করলো বিপুল বিক্রমে, যাতে হানাদার মিলেটারীকে হত্যা করা, বেধে রাখা, রাজাকারদের ধরে বেধে গণ-মাইর দেওয়া, ঘোড়ার মতো করে চড়ে বসা ইত্যাদি বীরত্বপূর্ণ মজার মজার দৃশ্য, আর দর্শকের কি বাধ ভাঙ্গা আনন্দ উল্লাস। আজ মনে পড়লে কেমন একটা বিষাদতায় মন ভরে যায়, মেঘে মেঘে কত দিন পেরিয়ে গেলো।
তারপর একসময় ইয়াকুব আলীও ঘর ছেড়ে বাইরে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করলেন এবং অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে এগিয়ে এলেন। তখন শ্রীমঙ্গলের সবচে অভিজ্ঞ ও উঁচু মানের একজন শিল্পী ছিলেন রংগলাল দেব চৌধুরী। আমাদের দুর্ভাগ্য, বেতারে সরকারী চাকুরী করার সুবাদে তার অবদান থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। এ কে আনামের ভাষ্য মতে উনারও গুরু ছিলেন তিনি, পাকিস্তানী আমলে কলকাতা থেকে স্থানীয় মাড়োয়ারিরা বড় বড় গাইয়ে এনে অনুষ্ঠান করতো সেখানেও তার গান গাওয়ার সুযোগ হয়ে ছিলো।
ক্রমে শরণার্থী ফিরে আসার সাথে সাথে শিল্পীরাও ঘরে আসতে থাকলো। এ কে আনাম তার চাকরীস্থলে ইতিমধ্যে ফিরে গেলেন শ্রীমঙ্গল ছেড়ে। এরপর সিনিয়র শিল্পী ইয়াকুব আলী ও অবিনাশ দেব তাদের সংগঠন 'সুর ও তান' নিয়ে মাঠে নামলেন। তাদের সংগঠনে তৎকালীন সময়ের সব ভালো ভালো শিল্পীরাই ছিলেন - বাচ্চু চৌধুরী, কান্চু ঘোষ, শোভা ভৌমিক, মিনতু চৌধুরী, আলো ঘোষ, নাসিমা, উত্তরা চৌধুরী, মল্লিকা, মানিক, অশোকসহ আরও অনেকেই যাদের অনেকের নাম স্মরণে আসছেনা বলে দুঃখ প্রকাশ করছি। ইয়াকুব আলী ও অবিনাশ দেব খুব ভালো সংগঠক ছিলেন তাদের সব অনুষ্ঠানমালাও ছিল অনেক উন্নত মানের।
অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা পর্বে - স আ মুজিব, খুকু রায়, শাহেদা আপা এবং স আ মুহিত ছিলেন। তাদের যাদের উপস্থাপনা ছিলো অত্যন্ত উন্নতমানের। যথারীতি তবলা বাদক বিজন দত্ত। ইয়াকুব ভাইর ছিলো বিরাট দেশ গানের সংগ্রহ, বাঘের দৃষ্টি নিয়ে তিনি আগলে রাখতেন তার গানের খাতা, যাতে কেউ সেদিকে হাত বাড়াতে না পারে। কিন্তু এর মাঝেও সুশীল তার খাতা থেকে গান লোপাট করে দিতো এনিয়ে আমরা খুব হাসাহাসি করতাম। বুঝতে পারলে ইয়াকুব ভাইতো অগ্নিশর্মা তার চেঁচামেচিতে হাওয়া গরম হয়ে যেতো। স আ মুহিতের লিখা কিছু দেশ গানও তার সংগ্রহে ছিলো। তাদের গানের মহড়ায়ও খুব জমজমাট, কারো ফাঁকি দিবার কোন উপায় নেই। একটু ভুল ভ্রান্তিতেই ইয়াকুব ভাইর তর্জন গর্জন শুরু হয়ে যেতো, আবার মুহূর্তেই শরবতের মতো ঠাণ্ডা !! বলতেন - 'প্রেশার ওর রুগী-তো, মাথা গরম অই যায় রে'।
তাদের সংগঠনের বিভিন্ন শিল্পী সংগ্রহের তালাশে থাকতেন অবিনাশ-দা। কোন্কোন্ বাড়ীতে গানের শিল্পী আছে এই নজর থাকতো তার অবিরত। প্রায় সব বাসায়ই অবাধ যাতায়াতের কারণে শিল্পী সংগ্রহ ছিলো তার কাছে অত্যন্ত সহজ বিষয়। আবার ইয়াকুব ভাই অবিনাশদার মাঝে মুহুর্তেই যেকোনোও সামান্য বিষয় নিয়েই বাজতো তুমুল ঝগড়া, আবার একটু পরই সব কিছু শেষ। দুটি মানুষের ছিলো অসম্ভব গলায় গলায় ভাব।
আবার ইয়াকুব ভাই সুশীলের অবস্থা ছিলো সাপ-নেউলের সম্পর্ক, কিন্তু সিরিয়াস পর্যায়ে তা যেত না। সুশীল তাকে ক্ষেপানোর তালেই থাকতো, সে সব ঘটনা কিযে উপভোগ্য বিষয় ছিলো লিখে বুঝানো বড় কঠিন। আজকের স্মৃতি আগামী কালের বেদনার স্মৃতি।
অবিনাশ-দা শ্রীমঙ্গলের অনেক উঠতি গায়ক-গায়িকাকে বেতারে গানের শিল্পী হিসাবে সংযুক্ত করে দিয়েছিলেন এ অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। এতো সরল সহজ দিল খোলা মানুষ সমাজে আজ বড় বিরল। 'সুর ও তানের' অনুষ্ঠানে তখন লাল নীল হলুদ সবুজ রাংতা কাগজ দিয়ে রঙ্গিন আলোর বাহার থাকতো, যেন সিনেমেটিক দৃশ্য। প্রায়ই 'সুর ও তান' বিভিন্ন স্থানে তাদের গীতি নকশা গানের অনুষ্ঠান অত্যন্ত সফল ভাবে পরিবেশন করে গেছে নিরলস ভাবে অনেকদিন ধরে।
আর একটি সাংস্কৃতিক দল স্বাধীনতা পরপরই গান নাটকের অনুষ্ঠান করতেন ভানুগাছ রোডস্থ লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসের অফিসাররা। ফিরুজ ভাই রাজ্জাক ভাইরা ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা। ফিরোজ ভাই ছিলেন অত্যন্ত সংস্কৃতি পাগল মানুষ, সব সময়ই তারা কোনও না কোন অনুষ্ঠান আয়োজন করতেনই। সাথে শহরের অনেক শিল্পীরাও যোগ দিতো সে সব অনুষ্ঠানে।
এরপর আসে ছাত্র ইউনিয়নের কথা, বিশেষভাবে মেয়ে শিল্পীদের কথা। আমি ৬৯ গণ আন্দোলনের একটা পর্বের লিখায় উল্লেখ করেছিলাম, শ্রীমঙ্গলের ছাত্রীরা মানেই যেন ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। তারা স্বাধীনতা পূর্বেও চমৎকার অনুষ্ঠান করতো, পরেও ভালো অনুষ্ঠান করেছে, উত্তরা চৌধুরী রীণা চৌধূরীরা ছিলো সম্মুখ ভাগে। তাদের সুরেলা দেশাত্মবোধক গান ও গণ সংগীত সবার জন্য ছিলো অত্যন্ত মনোহর ও হৃদয়গ্রাহী।
উদীচী শ্রীমঙ্গল স্বাধীনতা পরপরই বিভিন্ন কারণে সম্পূর্ণ সংগঠিত হতে পারেনি। তাদের শিল্পী সদস্যবৃন্দ আবার সংগঠিত হতে একটু সময় লেগেছিলো। এ অবস্থায়ই বিদ্যুৎ করকে সামনে রেখে তারা মোটামুটি একটু একটু করে সংগঠনটিকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করছিলো। এই প্রচেষ্টায় ছিলো হিমাদ্রি দত্ত বাচ্চু, মোসাদ্দেক হোসেন মেলা ও পরবর্তীতে অধ্যাপক এম এ মন্নানও এতে যোগ দেন। এছাড়া আরও অনেকেই প্রাথমিক অবস্থায় এর সাথে ছিলেন। এই অসংগঠিত অবস্থায়ই 'ইতিহাস কথা কয়' নামক একটি উচ্চমানের গীতি নাট্য তারা মঞ্চে নামায় যা বঙ্গবন্ধুর উপর রচিত। হিমাদ্রি দত্ত বাচ্চু গীতি নাট্যটি বিভিন্ন স্থানে মঞ্চস্থ করেছে অনেকদিন।
এছাড়া গণসংগীত দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠানও সংগঠনটি অত্যন্ত সফলভাবে করেছে। উদীচী মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক সংগঠন বিধায় তাদের অনুষ্ঠানের ব্যাপকতা ছিলো অনেক। প্রতিকুল সময়ের কারণে স্বাধীনতা পরপর তাদের কর্মকাণ্ড একটু সীমিত ছিলো বটে তবে পরবর্তীতে তার পূর্ণআত্মপ্রকাশ ঘটে। এ বিষয়ে আগামীতে উদীচী নিয়ে পরিপূর্ণ লিখা হবে।
চলবে...
বুলবুল আনাম, কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও গীতিকার
- দুলাভাইয়ের ধর্ষণের শিকার শ্যালিকা
- মৌলভীবাজারের রাজনগরে
আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বিধবা রুবির বিউটি পার্লার - `প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে আমাদের ধোকা দেওয়া হচ্ছে`
- রাখাল নৃত্যের মধ্য দিয়ে কমলগঞ্জে রাস উৎসব শুরু
- কমলগঞ্জে মাদকবিরোধী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত
- মেয়ের বাড়িতে ইফতার: সিলেটি প্রথার বিলুপ্তি চায় নতুন প্রজন্ম
- দেশের চতুর্থ ধনী বিভাগ সিলেট
- অবশেষে ক্লাস করার অনুমতি পেল শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম
- শ্রীমঙ্গল টু কাতারে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালি নেটওয়ার্ক
মৌলভীবাজারে অনলাইন জুয়ায় রাতারাতি কোটিপতি সাগর - এসএসসির ফলাফলে বিভাগে ৩য় স্থানে মৌলভীবাজার
























