ঢাকা, শনিবার   ১৬ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ১ ১৪২৮

বুলবুল আনাম

প্রকাশিত: ২১:৫৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ২৩:৩৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

১ম পর্ব

স্বাধীনতার পর শ্রীমঙ্গলে সাংস্কৃতিক জাগরণ: জাগৃতি শিল্পী গোষ্ঠী

`নীল সাগরের মুক্তা` নাটকে জাগৃতি শিল্পী গোষ্ঠী

`নীল সাগরের মুক্তা` নাটকে জাগৃতি শিল্পী গোষ্ঠী

সদ্য স্বাধীন দেশ- চারিদিকে অস্থির-অনিয়ন্ত্রিত-অস্বাভাবিক অবস্থা। কিশোর যুবকদের চলাফেরার মাঝেও নিয়ন্ত্রণ অনেকটা কম হয়তো তখনকার প্রেক্ষাপটে ছিলো স্বাভাবিক বিষয়। নয়মাসের অসহনীয় বন্দিদশা দুঃখ-যন্ত্রণা, ক্ষুধার জ্বালা, অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্ত আলোর স্বাদ নতুন স্বপ্ন নতুন চিন্তা স্বাভাবিক ভাবেই কোন কিছু করার একটা চঞ্চল পায়তারা।

বিষয়টা নজরে পড়লো তখনকার রাজনৈতিক নেতাদের চোখ। তৎকালীন সংসদ সদস্য জনাব আলতাফুর রহমান চৌধুরী ও জনাব মো. ইলিয়াস পরামর্শ দিলেন। পরামর্শ কি-  যেন আদেশই দিলেন থিয়েটার দল ও গানের দল গঠন করতে, মাঠে খেলাধুলায় মন দিতে, যা মেনে না নেবার কোন উপায় ছিলোনা। বিষয়টা পরিষ্কার যে যুবকদের মন অনিয়মের দিক থেকে ঘুরিয়ে সৃষ্টিশীলতার দিকে ঝুঁকিয়ে দেওয়া। নেতৃবৃন্দের সব রকমের সহযোগীতা আশ্বাসের প্রেক্ষিতে গঠিত হলো স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম নাট্য দল 'জাগৃতি শিল্পী গোষ্ঠী'।

চারিদিকে বেশ একটা সাড়া পড়লো, প্রায় সমস্ত অগ্রগামী যুবকরাই যোগ দিলো জাগৃতি শিল্পী গোষ্ঠীর ব্যানারে। যে যেভাবে পারে জাগৃতির ছায়াতলে এগিয়ে এলো প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনায়। জাগৃতির তৎকালীন সদস্যরা ছিলেন আশরাফুল আলম, বিরাজ সেন তরুন, স আ মুহিত দিদার আহমদ শাহীন, এম এ রহিম, শহীদূল আলম জিল্লুল আনাম, স আ মুজিব, সুশীল শীল্ মানিক কর, মুক্তিযুদ্ধা আতাউর রহমান, নিতাইদা, আ. লকিব, রফিকুল ইসলাম, আবু সহিদ, আবদূল্লাহ, কাজল রায়, নিহার ভৌমিক, হিমাদ্রী দত্ত বাচ্চু, রবিন্দ্র ভৌমিক, জিতেন্দ্র ভৌমিক, বাবুল পাল, চিত্ত ভৌমিক মতলিবসহ নাম মনে না পড়া তৎকালীন সময়ের প্রগতিশীল চিন্তার সব যুবকরাই প্রায়। নাট্য পরিচালক হলেন জনাব হিফজুল আনাম। নেপথ্য কারিগরী সহযোগীতায় ছিলেন আহমেদুর রহমান সেলেম, সাপুর আহমদ প্রমুখ।

কিন্তু সমস্যা দাঁড়ালো নাটকের পান্ডুলিপি জোগাড় নিয়ে। সদ্যমুক্ত দেশে কোথায় মিলবে নাটকের পান্ডুলিপি? সব ক্ষেত্র- সব কিছুইতো অগোছালো। চারিদিকে সন্ধানের পর পাওয়া গেলো কিরণ মিত্রের 'সংঘাত' নাটকটি। প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনায় পুরানো অগ্রণী ব্যাংকের দুতলায় মহড়া শুরু হলো। তখন দু'তলাটি ছিলো খালি। পরবর্তিতে ভিক্টোরিয়া হলটি সংস্কার করে মহড়া হতো। (ভিক্টোরিয়া টকিজ = বর্তমান পৌর হল)

আসল সমস্যা দাঁড়ালো নারী চরিত্রের অভিনেত্রী পাওয়া নিয়ে। তখন তো স্থানীয় কেউ এখনকার মতো অভিনয়ে জড়িত ছিলোনা, বিধায় এটা একটা মাথা ব্যাথার বড় কারণ হয়ে গেলো। তখন আর্থিক তেমন সংগতিও নেই যাতে বাইরের জেলা থেকে অভিনেত্রী কাউকে আনা যায়। এই অবস্হায় শর্বরী শীল নামের একটা সাহসী মেয়ের সন্ধান পাওয়া যায় যে কিনা নাটক করতে অত্যন্ত আগ্রহী। (শর্বরী- কন্ঠ শিল্পী সুশীল শীলের পিসাতো বোন) সংগ্রহ করলাম তাকে, কিন্তু কোনও ধরণের অভিজ্ঞতাই নেই একদম নতুন আনকোরা ও কম বয়সী। তবে তার উৎসাহ প্রচুর।

অনেক কষ্টে খেটেখুটে হাত ধরে অনেকটা উপযুক্ত করে তুলেন পরিচালক হিফজুল আনাম। শুরু হলো প্রবল উদ্যোমে-উৎসাহে মহড়া পর্ব। পরিচালকের অভিনয় পরীক্ষার পর যাকে যে চরিত্র দেয়া হতো তাই সবাই মেনে নিতো। মজার বিষয়ে এত উৎসাহী সদস্য ছিলো যারা নাটকে যে কোন ভাবে অংশ নিতে যারপর নাই প্রচন্ড উৎসাহী ছিলো। কিনতু কোন চরিত্র বাকী থাকলেতো দেবার কথা। সবার সাথে পরামর্শ করে পরিচালক ঠিক করলেন কয়েকটি নতুন চরিত্র সৃষ্টির। একেক দৃশ্যে শুধু মুখ দেখাবার জন্য অনেককে স্টেজে প্রবেশ করিয়ে দেয়া, যাতে সবাইকে খুশি রাখা যায়। সে সব নিয়ে হাসাহাসির অন্ত ছিলোনা। সে সময়টায় সবার মাঝে একটা সহযোগিতামূলক মনোভাব ছিলো প্রচুর। সন্ধ্যা হলেই দল বেধে জড়ো হতাম মহড়ায়। অনেক রাত অবধি চলতো মহড়া, আর অন্যরা বিপুল আগ্রহভরে বসে মহড়া উপভোগ করতো, যেন মহড়াটা তাদের জন্যও জরুরি অংশ।

তখন অনেক পৃষ্ঠপোষকরা চা-নাস্তার ব্যবস্থা করে দিতেন। জোর মহড়ার পর মোটামুটি মঞ্চায়ণযোগ্য একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেলো। আমি ছিলাম অভিনয়ের সাথে সাথে নাটকের আবহ সংগীতের দায়িত্বে, সাথে সহযোগীতায় ছিলো দেবদাস আচার্য (অবিনাশ আচার্যের মামা, যে কিনা অসাধারণ ভালো গান গাইতো)। আর সুশীল শীল, সে নেপথ্যে গানও গেয়েছিলো। সে সময়েই আমরা আবহ সংগীতে টেপ রেকর্ডারে স্টক মিউজিক ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু মঞ্চে সাইড উইংস তৈরি নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়লাম, সমাধান হলো অনেকের বাসা থেকে মা-বোন-মাসীদের শাড়ী এনে ব্যবহার করে। মঞ্চ সাজানোতে ছিলো রবীন্দ্র ভৌমিক, জিতেন্দ্র ভৌমিক এবং সাথে মেকআপ ম্যানও তারা। তাদের সাথে সুশীল শীলের কাকা, অত্যন্ত রসিক খোলা দিলের মানুষ ধীরু শীলও ছিলেন আরও একজন মেকআপ ম্যান হিসেবে। নির্ধারিত হলো তিনদিন নাটক মঞ্চায়ণ হবে। প্রথম দিন জনসাধারণের জন্য, দ্বিতীয় দিন আমন্ত্রিত অতিথি ও তৃতীয় দিন বিশেষ অতিথিদের জন্য।

এগিয়ে এলো নাটকের নির্দিষ্ট দিন, হল লোকে লোকারণ্য, আমরা তো অনেকটা হতবাক। হলের সমস্ত সিট পরিপূর্ণ, বাকি বিপুল সংখ্যক দর্শক অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়েই অপেক্ষমান। তখন শ্রীমঙ্গলে পিডিবি'র আওতায় ছিলো বিদ্যুৎ বিভাগ, এ ব্যাপারে কোন অসুবিধা তাই ভোগ করতে হয়নি। তারা অত্যন্ত সহযোগীতা করেছে লোকবল দিয়েও। নতুন দেশ যুবকদের একটা সৃজণশীল কাজ, শহরের প্রত্যেকটি কোনা থেকে আশাতীত সহযোগীতা অবলীলায় পাওয়া গেছে।

যথা সময়ের কিছুপর নাটক শুরু হয়ে গেলো, দর্শকদের বাধ-ভাঙা উচ্ছ্বাস আর করতালিতে বুঝলাম তাদের মন ভরাতে পারছি। দীর্ঘদিনের ক্ষুধার্ত জনতার প্রথম নির্মল আনন্দ খুশীর মূহুর্ত, স্বাভাবিক ভাবেই তারা মন ভরে উপভোগ করছিলো প্রত্যেকটি মূহুর্ত। প্রত্যেক অভিনেতার সংলাপ মুখস্থ করা ছিলো বাধ্যতামুলক, এ ব্যাপারে পরিচালক ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। তাই নাটকের গতি ছিলো প্রচুর। কমেডিয়ান বাবুল পালের স্বতঃস্ফুর্ত কৌতুক অভিনয় ও তাঁর বডি লেংগুয়েজ ছিলো অত্যন্ত মনোহর।

এক পুলিশের ভুমিকায় জিল্লুল আনামের 'যাক বলে গুলি মেরে' একটা মজার সংলাপ, রফিকের সিলেটি কথা (সংলাপ)- 'কই গেলেগো লাইলি' (সে শুদ্ধ সংলাপ বলতে পারতো না তাই তার সংলাপ সিলেটি করে দেয়া হয়েছিলো) দর্শকদের কে প্রবল আনন্দ দেয়।

'সংঘাত' নাটকে জাগৃতি শিল্পী গোষ্ঠী।

একটা সফল নাটক মঞ্চায়ণে আমাদের মাঝে বিরাট উৎসাহের সৃষ্টি হয়। এই সাফল্যে জাগৃতি কে সরকারি অনুমোদন দেয়া হয় (রেজিঃ নং সিল-৭৯)। এরপর বিভিন্ন ধরণের পরপর কয়েকটি নাটক আমরা মঞ্চস্থ করি অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গোয়েন্দা নাটক 'কালো ছায়া'। সংগীত নির্ভর সামজিক নাটক 'নীল সাগরের মুক্তা' - এ নাটকে তরুণ সেনের কৌতুকপূর্ণ সংলাপ দর্শকদের প্রচুর আনন্দ দেয়। 'সাগর সেচা মানিক' নাটকে মোহিনী মোহন রায় (কাজল রায়) এর আন্ডার টোন কৌতুক অভিনয় ছিলো অনবদ্য।

জাগৃতি বিভিন্ন স্থানে তাদের নাটক মঞ্চস্থ করে বেড়িয়েছে সাফল্যের সাথে এবং অনেক সুনামও অর্জন করেছে। ডিটেকটিভ নাটক 'কালো ছায়া'-তে রহিম ভাইর সিআইডি চরিত্রে ও 'নীল সাগরের মুক্তা; সংগীত নির্ভর নাটকে স আ মুহিতের ব্যর্থ প্রমিকের চরিত্রে অভিনয় দর্শকের প্রচুর প্রশংসা কুড়ায়। এই অভিনয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শর্বরী শীল (শর্বরী সেন) পরবর্তী সময়ে অভিনয়কে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে ও ঢাকা সিনেমা জগতের প্রবেশ করে।

কিন্তু সময়ের সাথে সবকিছু বদলাতে থাকে, এগিয়ে এলো মহা দূর্ভাগ্যের সেই কলংকময় ১৯৭৫। স্থিমিত হয়ে গেল সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা। সারা দেশের মতো জাগৃতির নীলাকাশেও জোছনাময় সুন্দর রূপালী সময় স্থব্ধ হয়ে গেলো, থেমে গেল শ্রীমঙ্গল সাংস্কৃতিক অঙ্গণও। সারাটা দেশই কালো চাদরে আবৃত হয়ে পড়লো ছিটকে পড়লো। উদ্যোমী উৎসাহী নাটক পাগল সৈনিকগুলো দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো।

চলবে... 

 বুলবুল আনাম, কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও গীতিকার

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়