ঢাকা, মঙ্গলবার ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ১৭ ১৪৩৩

নূরুর রহিম নোমান, যুক্তরাজ্য

প্রকাশিত: ০৯:০৫, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ধারাবাহিক ফিচার: পঞ্চম পর্ব (দ্বিতীয় ভাগ) পূর্ব প্রকাশিতের পর

মনু নদী-হাওর: উন্নয়নের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এক জলজ সভ্যতা

এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

পঞ্চম পর্বের প্রথম ভাগে আমরা দেখেছি, কীভাবে মনু নদী সেচ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি পরিবহন, প্লাবনভূমির সঙ্গে নদীর মেলবন্ধন এবং পানি ব্যবস্থাপনার রূপরেখায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু নদীর গতিপথ কিংবা হাওরের পানির স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পশুপালন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জলভিত্তিক লোকজ সংস্কৃতির ওপর।

একসময় মনু নদী ও কাওয়াদিঘি হাওরকে ঘিরে যে সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেখানে পানি ছিল না আতঙ্কের নাম। পানি ছিল জীবনের সম্পদ, জীবিকার স্পন্দন এবং লোকসংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি।

হাওরের বিস্তৃত পানি মানেই ছিল দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার। প্লাবনভূমি ছিল মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র। ধান কাটা শেষ হলে হাওরের বুক হয়ে উঠত গরু-মহিষের সমৃদ্ধ চারণভূমি। বর্ষার শুরুতে প্রথম পানির ছোঁয়া মানেই ছিল নদী ও জলাভূমিকে ঘিরে উৎসবের আমেজ। কৃষিজমিতে পানি জমলে ধানের পাশাপাশি উন্মুক্ত হতো মাছ ধরার নানা সুযোগ।

আজ সেই বৈচিত্র্যময় জলজ জীবন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

কোথাও উন্মুক্ত জলাভূমি সংকুচিত হয়েছে, কোথাও জমির প্রাকৃতিক ব্যবহার বদলে গেছে। আবার কোথাও পানি নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহকে সীমিত করেছে। ফলে কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যেতে বসেছে এমন কিছু লোকায়ত প্রথা, যা একসময় এ অঞ্চলের অর্থনীতি, সমাজ ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

বাথানপ্রথা: হাওরে আরেক জীবন, মৌসুমি বাস্তুতন্ত্র ও সংস্কৃতির প্রায় বিলুপ্তি
কাওয়াদিঘি হাওর ও আশপাশের অঞ্চলের লোকায়ত জীবনব্যবস্থার অন্যতম অনন্য অধ্যায় ছিল ‘বাথানপ্রথা’।

জলজ বাস্তুতন্ত্রের এই রূপান্তর শুধু প্রকৃতির ক্ষতি করেই থেমে থাকেনি; হাওরাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও অর্থনৈতিক লোকসংস্কৃতিকেও বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আর এই বাথানপ্রথার সঙ্গে লেখকের নিজের শৈশব-অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে হাওরের পানি শুকিয়ে এলে জেগে উঠত প্রকাণ্ড উন্মুক্ত সবুজ ঘাসের প্রান্তর। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হতো ‘হাওর ভাসা’ বা ‘বাথানের সময়’। রাজনগর ও আশপাশের গ্রামের গৃহস্থরা তাঁদের গরু-মহিষ বাথানিদের, অর্থাৎ পশুচারণকারীদের জিম্মায় দিতেন।

বাথানিরা গরু-মহিষের পাল নিয়ে হাওরের গভীরে চলে যেতেন। বাঁশ, খড় ও নাড়া দিয়ে তৈরি করতেন অস্থায়ী ‘নেরার ঘর’। মাসের পর মাস সেখানেই চলত তাঁদের মৌসুমি জীবন।

সেখানে গরু-মহিষের দুধ দোহন করা হতো। সেই দুধ থেকে তৈরি হতো খাঁটি বাথানের ঘি ও দই।

এই প্রথা সরাসরি নির্ভর করত হাওরের স্বাভাবিক ও পূর্বানুমানযোগ্য শুষ্ক-মৌসুমি চক্রের ওপর। বাঁধ-ব্যারেজ নির্মাণের ফলে হাওরের প্রাকৃতিক পানি-প্রবাহের চক্র বদলে যাওয়া এবং গোচরভূমি সংকুচিত হওয়ার কারণে ছয় দশক ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী বাথান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়।

কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে মাঠে মাঠে ধান কাটা শেষ হলে রাজনগর, মৌলভীবাজারসহ আশপাশের এলাকার কৃষকেরা তাঁদের গরু-মহিষ হাওরে চরানোর জন্য পাঠাতেন। গৃহস্থরা গবাদিপশু বাথানিদের নির্দিষ্ট জিম্মায় দিয়ে দিতেন। বাথানিরা গরু-মহিষের পাল নিয়ে হাওরের বিস্তীর্ণ চর, উন্মুক্ত তৃণভূমি ও সবুজ ঘাসসমৃদ্ধ এলাকায় চরাতেন।

ধান কাটার পর কৃষিজমি যখন কিছু সময়ের জন্য অপেক্ষাকৃত খালি থাকত, তখন হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হতো গবাদিপশুর স্বাভাবিক ও প্রাচুর্যময় খাদ্যভূমিতে।

বাথানিদের মৌসুমি জীবনও ছিল শতভাগ হাওরনির্ভর। তাঁরা অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত হাওরের গভীরে থেকে পশুচারণ করতেন। সকালে দুধাল গরু-মহিষের দুধ দোহানো হতো। ঘোষরা, অর্থাৎ যারা দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রি করতেন, তাঁরা বাথানিদের কাছ থেকে সেই দুধ কিনে নিয়ে আসতেন।

বাথানিরা হাওরেই বসবাস করতেন। সপ্তাহান্তে তাঁরা হাওর থেকে নিকটবর্তী গ্রামীণ হাটে আসতেন, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং আবার ফিরে যেতেন বাথানের নিরিবিলি পরিবেশে।

এই জীবনব্যবস্থা কেবল সাধারণ পশুপালন ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি স্বাবলম্বী স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি।

বাথানিদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল গবাদিপশুর দুধ বিক্রি এবং গৃহস্থ কৃষকের কাছ থেকে রাখালি বাবদ পাওয়া পারিশ্রমিক।

অর্থাৎ কৃষক, বাথানি, গবাদিপশু, হাওরের বিস্তৃত ঘাসভূমি এবং দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার, সবকিছু মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক নির্ভরতার একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র।

ঐতিহ্যবাহী এই বাথানপ্রথা আজও একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। তবে তা কেবল সীমিত পরিসরে টিকে আছে। আগের মতো রাজনগর কিংবা পার্শ্ববর্তী উজান অঞ্চল থেকে শত শত গরু-মহিষ হাওরে নিয়ে যাওয়ার সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।

হাওরের প্রাকৃতিক চরিত্র বদলেছে। চারণভূমি সংকুচিত হয়েছে। পানির স্বাভাবিক ওঠানামার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। এমনকি কৃষির মৌসুমি সময়সূচিও বদলে গেছে।

ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এই লোকজ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটিও ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

‘বাইরকা’: প্রথম পানির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক হারিয়ে যাওয়া জলসংস্কৃতি
মনু নদী ও সংলগ্ন জলাভূমির জলজ সংস্কৃতির আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় ছিল ‘বাইরকা’।

স্থানীয় মানুষের পরিভাষায়, বর্ষার শুরুতে নদীতে যখন পাহাড়ি প্রথম ঘোলা পানি, অর্থাৎ ‘গুলা’, নেমে আসত, তখন নদী ও জলাভূমির চেনা রূপ বদলে যেত। নতুন পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে শুকনো খাল-বিল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতো এবং শুরু হতো মাছের চলাচল।

সেই প্রথম পানির আগমনকে কেন্দ্র করেই তৈরি হতো ‘বাইরকা’র আয়োজন ও উৎসবের আবহ।

‘গুলা’ কেবল নদীর পানি বৃদ্ধির সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি ছিল নতুন জলজ মৌসুমের সূচনার একটি বিশেষ বার্তা।

নদী ফুলে উঠত। শুকনো খাল-বিল নতুন পানিতে পূর্ণ হতো। মাছের চলাচল শুরু হতো। জলজ উদ্ভিদে জাগত নতুন প্রাণের স্পন্দন। আর নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত আনন্দ-উৎসবের আমেজ।

‘বাইরকা’ তাই শুধু মাছ ধরার কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না; এটি ছিল নদীর সঙ্গে মানুষের গভীর সামাজিক ও লোকায়ত সম্পর্কের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

নদী যখন ছিল আরও উন্মুক্ত, প্লাবনভূমি যখন ছিল বিস্তীর্ণ এবং খাল-বিলের সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক সংযোগ বজায় ছিল, তখন প্রথম পানি আসার এই বার্তা মানুষের সামাজিক জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করত।

আজ সেই পুরোনো বাইরকার আমেজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

নদীর কোনো কোনো অংশে তলদেশ ভরাট হয়েছে, পানির স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হয়েছে এবং জলাভূমির সঙ্গে নদীর ঐতিহাসিক সংযোগও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে। ফলে নতুন পানির সঙ্গে মাছের স্বাভাবিক চলাচল এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকজ সংস্কৃতিও ক্রমে ম্লান হয়ে গেছে।

একটি নদীর চরিত্র বদলে যাওয়া তাই কেবল পানি বাড়া-কমার বৈজ্ঞানিক হিসাব নয়; এর সঙ্গে আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ইতিহাসও।

ক্ষেতের আইল ও ‘ডরি-ফারন-উকা-হুফা’: কৃষিজমিতেও ছিল জলজ জীবনের অংশ
মাছ ধরার ঐতিহ্য কেবল গভীর নদী, হাওর বা বিশাল বিলেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

বর্ষায় যখন কৃষিজমিতে পানি জমত, তখন ধানের ক্ষেতও হয়ে উঠত মৌসুমি জলজ আবাসস্থল। বিশেষ করে মনু নদীর পুরোনো প্লাবনভূমির বিস্তৃত সমতল এলাকায়, রাজনগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে, ধানের জমিতে জমে থাকা পানি মাছের চলাচলের সুযোগ তৈরি করত।

ক্ষেতের আইল, ছোট নালা ও পানির স্বাভাবিক চলাচলের মুখগুলোকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মানুষ নানা ধরনের মাছ ধরার ফাঁদ পাততেন। এসব লোকজ উপকরণের মধ্যে স্থানীয়ভাবে ‘ডরি’, ‘ফারন’, ‘উকা’ ও ‘হুফা’ নামে পরিচিত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হতো।

কৃষিজমিতে পানি জমলে ছোট নালা, খাল বা পানির ধারায় এসব সরঞ্জাম বসিয়ে রাখা হতো। স্রোতের সঙ্গে আসা মাছ সেই পথ দিয়ে যেতে গিয়ে ফাঁদে আটকা পড়ত। কৃষকেরা পরে সেগুলো সংগ্রহ করতেন।

এটি ছিল প্রকৃতিনির্ভর এক অনন্য কৃষি-মৎস্য সমন্বিত ব্যবস্থা।

একই জমি থেকে কৃষক যেমন ধান ঘরে তুলতেন, তেমনি বর্ষাকালে সেই জমিতে আসা মাছ পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাত এবং বাড়তি আয়েরও সুযোগ তৈরি করত।

হাওরের অভ্যন্তরীণ এলাকাতেও মাছ ধরার নিজস্ব লোকায়ত পদ্ধতি ছিল। কোথাও ‘কোঁচা’ দিয়ে মাছ ধরা হতো, কোথাও ব্যবহার করা হতো ছোট ছোট জলপথ ও নালা।

এসব ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্মে সঞ্চিত স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ফল।

কোন সময়ে কোন মাছের চলাচল বাড়ে, কোন ধরনের পানিতে মাছের আগমন বেশি, কোথায় কোন সরঞ্জাম বসালে মাছ পাওয়া যায়, এসব জ্ঞান কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বই থেকে শেখা নয়। জলাভূমির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই এই প্রজ্ঞা গড়ে উঠেছিল।

আজ পানি ব্যবস্থাপনা, ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং জলাভূমির স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই লোকায়ত জ্ঞান ও এসব সরঞ্জামের ব্যবহারও অনেকটাই কমে এসেছে।

যখন নদী-হাওর ছিল একটি সংযুক্ত জীবন্ত ব্যবস্থা
একসময় মনু নদী, তার বিস্তৃত প্লাবনভূমি, নদীসংলগ্ন খাল-বিল এবং কাওয়াদিঘি হাওরকে আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন জলাশয় হিসেবে দেখা হতো না। এগুলো ছিল পরস্পর-সংযুক্ত একটি জীবন্ত জলজ ব্যবস্থা।

বর্ষায় নদীর পানি প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ত। সেই পানি ক্রমান্বয়ে খাল-বিল ও দূরের নিম্নাঞ্চলে পৌঁছাত। মাছও সেই জলপথ ব্যবহার করে এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে চলাচল করত।

এই প্রাকৃতিক সংযোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পশুপালন এবং মানুষের জীবন-জীবিকা।

ধান কাটা শেষে হাওরে নেমে যেত গরু-মহিষের বাথান। বর্ষার শুরুতে ধানের ক্ষেতে জমে থাকা পানিতে পাওয়া যেত মাছ। নদীতে প্রথম ঘোলা পানি এলে ‘বাইরকা’র আনন্দে মুখরিত হতো নদীপাড়। হাওরের বুকে গড়ে উঠত বাথানের নেরার ঘর। বাথানিদের সংগৃহীত দুধ ও ঘি স্থানীয় বাজারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে উঠত।

কৃষক একই ভূপ্রকৃতি থেকে পেতেন ধান ও মাছ, দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ও জীবিকার উৎস।

অর্থাৎ এই জলাভূমি কেবল পানি ধরে রাখার কোনো আধার ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ, জীবন্ত ও পরস্পরনির্ভর পরিবেশগত-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

নদীকে বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা, প্লাবনভূমিকে নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করা, জলপ্রবাহের প্রাকৃতিক পথ পরিবর্তন এবং ভূমির ব্যবহারে পরিবর্তনের ফলে সেই ঐতিহাসিক সংযোগ দিন দিন দুর্বল হয়েছে।

এর প্রভাব শুধু মাছের ওপর পড়েনি; কৃষি, পশুপালন, স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের ঐতিহ্যগত জীবনধারণের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে।

সবুজ বিপ্লবের প্রকল্প, কৃষকের দুর্ভোগের নতুন বাস্তবতা?:
মনু নদী সেচ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল সেচের আওতা বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিকে অধিক উৎপাদনশীল করার মাধ্যমে এই প্রকল্প এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আজ একটি কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

যে অবকাঠামো কৃষকের হাতকে শক্তিশালী করতে তৈরি করা হয়েছিল, সেই প্রকল্পের পানি ব্যবস্থাপনাই যদি কোনো সময় কৃষকের ফসলের জন্য সংকট তৈরি করে, তবে সমস্যাটি কোথায়?

কাওয়াদিঘি হাওর এলাকার কৃষকেরা আজ সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সমময়ে পানি নিষ্কাশিত না হলে বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। আবার হাওরে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে আমন চাষের জমি প্রস্তুত করার সময় পেরিয়ে যায়।

অনেক সময় কৃষককে একই জমিতে নতুন করে চারা রোপণ করতে হয়। নষ্ট হয় বীজ, সার, কীটনাশক এবং কৃষকের শ্রমের বিনিয়োগ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ যুক্ত হলে চোখের সামনেই পুরো বছরের ফসল বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ফলে এই ক্ষতি কেবল এক মৌসুমের খাদ্য ঘাটতির মধ্যেই থেমে থাকে না।

কৃষকের ঘাড়ে ঋণের বোঝা বাড়ে। পরিবারের মৌলিক ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী মৌসুমে নতুন করে বিনিয়োগের আর্থিক সক্ষমতা কমে যায়। কখনো জমিজমা বিক্রি কিংবা চড়া সুদের ঋণের ওপর নির্ভর করার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

যে পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত কৃষির ওপর দাঁড়িয়ে, তাদের কাছে একটি মৌসুমের ফসল নষ্ট হওয়া মানে শুধু শস্যের ক্ষতি নয়, পুরো পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নড়বড়ে হয়ে যাওয়া।

কাজেই মনু প্রকল্পের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার পরিমাপ কেবল কত হেক্টর জমিতে সেচ পৌঁছেছে, কত কিলোমিটার বাঁধ তৈরি হয়েছে কিংবা কতগুলো পাম্প বসানো হয়েছে, এই সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে শেষ করা যাবে না। 

বরং প্রশ্ন করতে হবে:

এই প্রকল্পের আসল সুফল কারা পাচ্ছেন, আর এর ঝুঁকি কাদের কাঁধে পড়ছে?
কৃষক, মৎস্যজীবী ও হাওরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা কি পানি ব্যবস্থাপনার নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে?

হারিয়ে যাওয়া জলজ জীবন: শুধু স্মৃতি নয়, একটি পরিবেশগত সতর্ক সংকেত
আজ হাওরের পারে দাঁড়িয়ে প্রবীণ মানুষেরা যখন অতীতের কথা স্মৃতিচারণ করেন, তখন তাঁদের কথায় ভেসে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জলজ পরিবেশের ছবি।

সেই স্মৃতিক্যানভাসে ছিল অফুরন্ত পানি, মাছের স্বাধীন বিচরণ, নদী ও খাল-বিলের অবাধ মেলবন্ধন, বাথানের কর্মমুখর দিন, দুধ-ঘির বাজার, বাইরকার আনন্দ-উৎসব এবং বর্ষায় পানিতে ভেসে থাকা দিগন্তবিস্তৃত কৃষিজমি।

আজ সেই বৈচিত্র্যময় রূপের অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

কোথাও জলাভূমি শুকিয়ে সংকুচিত হয়েছে। কোথাও ভূমির ব্যবহার বদলে গেছে। কোথাও নদীর সঙ্গে তার প্লাবনভূমির সংযোগ দুর্বল হয়েছে। কোথাও মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননের পথ সংকুচিত হয়েছে। কোথাও বাথানপ্রথা সীমিত হয়ে এসেছে। আর কোথাও হারিয়ে যেতে বসেছে লোকজ জলসংস্কৃতির পুরোনো চিহ্ন।

এসবকে কেবল প্রবীণদের ‘পুরোনো দিনের স্মৃতিময় আকুলতা’ হিসেবে এড়িয়ে গেলে বড় ভুল হবে।

কারণ একটি অঞ্চলের ঐতিহাসিক জলজ সংস্কৃতি যখন হারিয়ে যেতে থাকে, তখন এর পেছনে প্রায়ই থাকে জলাভূমির পরিবেশগত পরিবর্তনের বাস্তব ইতিহাস।

নদীর স্বাভাবিক চরিত্র বদলালে মানুষের বাঁচার ধরন বদলায়। হাওরের জলচক্র ব্যাহত হলে কৃষির চাকা থমকে দাঁড়ায়। মাছের বিচরণপথ সংকুচিত হলে খাদ্য ও জীবিকায় টান পড়ে। চারণভূমি কমলে বাথানপ্রথা সংকুচিত হয়।

আর জলনির্ভর জীবন সংকুচিত হয়ে এলে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রজন্মের পর প্রজন্মের লোকসংস্কৃতিও ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যায়।

লেখকের নিজের দেখা সেই সময়
আমাদের পরিবারেরও গরু-মহিষ ছিল। শৈশব-কৈশোরে দেখেছি, গরু-মহিষ বাথানে দিয়ে দেওয়া হতো। মনে পড়ে, বাইরকায় মনু নদীতে মাছ ধরার উৎসবমুখর দৃশ্য দেখার কথাও।

দেখেছি, কৃষিজমিতে বর্ষার পানি জমলে ‘ডরি’, ‘পারন’, ‘উকা’ কিংবা ‘হুফা’ পাতার সেই পুরোনো মাছ ধরার দৃশ্য। আমাদের পরিবারের কৃষিকাজে যারা সহায়তা করতেন, তাঁরাও এসব লোকজ পদ্ধতিতে মাছ ধরতেন।

অর্থাৎ বাথানে গরু-মহিষ নিয়ে যাওয়া ও পালনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, হাওরের দিকে যেতেন। তাই বাথানপ্রথা, বাইরকা কিংবা কৃষিজমির আইল-খালে মাছ ধরার কথা আমার কাছে কেবল শোনা কোনো পুরোনো গল্প নয়; এগুলো আমার নিজের দেখা স্মৃতির অংশ।

হাওরের ওপর নতুন চাপ: সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
হাওর ও জলাভূমির ওপর অতীতের অবকাঠামোগত চাপের মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা। দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগও এখন আলোচনার বিষয়। কাওয়াদিঘি হাওর এলাকাতেও এ ধরনের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ রয়েছে।

কাওয়াদিঘি হাওর এমনিতেই জলজ জীববৈচিত্র্য, দেশীয় মাছের আবাসস্থল, জলপ্রবাহের পরিবর্তন এবং মানুষের জীবিকা সংকোচনের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এমন একটি সংবেদনশীল জলাভূমিতে নতুন অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা হাওরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ, জলজ উদ্ভিদ, মাছের আবাসস্থল এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সে প্রশ্ন সামনে আসা স্বাভাবিক।

বিশেষ করে স্থানীয় প্রকৃত মৎস্যজীবীরা এমনিতেই জলমহাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে বঞ্চনার অভিযোগ করে আসছেন। এর মধ্যে হাওরের ওপর নতুন ধরনের অবকাঠামো স্থাপন করা হলে প্রান্তিক মানুষের জীবিকা ও অধিকার আরও কতটা প্রভাবিত হবে, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।

তবে এ ধরনের প্রকল্প সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত দেওয়ার আগে প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, ভৌত নকশা, ভূমির ব্যবহার, জলপ্রবাহের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং পরিবেশগত সমীক্ষা, বিশেষ করে প্রয়োজনীয় Environmental Impact Assessment (EIA), নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা অপরিহার্য।

এসব পরিকল্পনা কতটা পরিবেশসম্মত, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ এবং হাওরের প্রকৃত অংশীজন, স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, মৎস্যজীবী ও অন্যান্য নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মতামত কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, তার স্পষ্ট উত্তর খোঁজা জরুরি।

এই মুহূর্তে কেবল এতটুকু সতর্কবার্তা দিয়ে রাখা যায়, হাওরের ওপর শুধু অতীতের প্রকৌশলগত সিদ্ধান্তের চাপই নেই; আধুনিক ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’র নামে আসা নতুন প্রকল্পগুলোকেও হাওরের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও জনস্বার্থের নিরিখে গভীরভাবে পরখ করে দেখা দরকার।

একটি নদী, একটি হাওর এবং মানুষের বদলে যাওয়া জীবন
মনু নদী ও কাওয়াদিঘি হাওরের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের বিবরণ তাই কেবল একটি নদীর গল্প নয়; এটি একটি জটিল জলাভূমির দীর্ঘ সংগ্রাম এবং মানুষের রূপান্তরিত জীবিকারও ইতিহাস।

এটি কেবল প্রকৌশল দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস নয়।

এটি মাছের হারানো গতিপথের ইতিহাস।

এটি সংকুচিত হয়ে আসা মুক্ত জলাভূমির ইতিহাস।

এটি কৃষকের বুকজুড়ে জমতে থাকা অনিশ্চয়তার ইতিহাস।

এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মের ঐতিহ্য বাথানপ্রথার প্রায় অবসানের ইতিহাস।

এটি ‘বাইরকা’র মতো প্রাণবন্ত লোকাচার ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস।

এবং সর্বোপরি, এটি এমন এক ভঙ্গুর জলব্যবস্থার ইতিহাস, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সহাবস্থানকে কৃত্রিম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবর্তিত করা হয়েছে।

সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, শুধু নদীর ভূ-আকৃতিই বদলায়নি; বদলে গেছে পুরো অঞ্চলের সামাজিক ও বাস্তুতাত্ত্বিক জীবনব্যবস্থা।

এসব পরিবর্তন আলাদাভাবে দেখলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, এটি শুধু নদীর পরিবর্তন নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র এবং সেই বাস্তুতন্ত্রের ওপর গড়ে ওঠা মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর।

আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় বাস্তুতন্ত্রের রূপান্তর (Ecosystem Transformation)।

এটাই প্রকৃত অর্থে ‘বাস্তুতন্ত্রের রূপান্তর’, যেখানে পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনও একসঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। এই রূপান্তরের হিসাব কোনো সরকারি নথিতে সম্পূর্ণভাবে ধরা পড়ে না। এটি বেঁচে থাকে এই অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে, তাঁদের মুখে মুখে বলা গল্পে, কথায়।

আর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় বার্তাটি হয়তো এটাই

প্রকৌশল দিয়ে প্রকৃতিকে হয়তো সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা যায়; কিন্তু প্রকৃতির মূল গতিধারা এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে উপেক্ষা করে গড়ে তোলা কোনো ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

কারণ নদী ও হাওরের আসল রূপান্তর শুধু তার মানচিত্রের রেখায় পরিবর্তন আনে না; মানুষের জীবন, জীবিকা, লোকাচার ও প্রজন্মের স্মৃতির ক্যানভাসেও তার গভীর ছাপ রেখে যায়।

নূরুর রহিম নোমান, যুক্তরাজ্য
(চলবে...)

ইএন/এসএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়