ঢাকা, সোমবার ৩১ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১৬ ১৪৩৩

আবুজার বাবলা

প্রকাশিত: ২০:৪২, ৩১ আগস্ট ২০২৬

পকেট কাটছে বিকাশ!

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডে টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, বেতন গ্রহণ কিংবা দোকানে QR কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করে আর্থিক লেনদেনের চিত্রই বদলে দিয়েছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)। বাংলাদেশে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং এ্যাপ এখন কোটি মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক জীবনের অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩টি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। 

কিন্তু এই ডিজিটাল আর্থিক বিপ্লবের বিপরীতে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন -ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বছরে কত টাকা কমিশন ও চার্জ দিতে হচ্ছে?
আরও বড় প্রশ্ন হলো- প্রতিবেশী দেশ ভারত যেখানে ডিজিটাল লেনদেনকে গণমানুষের কাছে প্রায় বিনা খরচে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করছে, সেখানে বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র কেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ পেমেন্ট সিস্টেম রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলে শুধু ক্যাশ আউট হয়েছে ৬ হাজার ৩৭১ বিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ৬ লাখ ৩৭ হাজার ১শ' কোটি টাকা। একই বছরে বি-টু-বি লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ১২৮ বিলিয়ন টাকা বা ৬ লাখ ১২ হাজার ৮শ' কোটি টাকা এবং মার্চেন্ট পেমেন্ট হয়েছে ৯৬০ বিলিয়ন টাকা বা ৯৬ হাজার কোটি টাকা। 

মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমে বিকাশের আধিপত্য সবচেয়ে বেশী। দেশের মোবাইল ব্যাংকিং খাতের মোট লেনদেনের প্রায় ৮০-৮৭ শতাংশই বিকাশের নিয়স্ত্রণে। বাকি ১৩-২০ শতাংশ রকেট, নগদ ও অন্যদের নিয়ন্ত্রণে। 

বিকাশের লেনদেন চার্জ বেশী কেন?
প্রতিবেশী দেশ ভারতে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় কোন ফি নেই। সেখানে দেশের জনপ্রিয় ও শীর্ষ ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিকাশ এর সেবা চার্জ চড়া। বিকাশ-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ এজেন্টের মাধ্যমে ক্যাশ আউট চার্জ প্রতি হাজারে ১৮.৫০ টাকা। নির্দিষ্ট -এর ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি হাজারে ১৩.৯৫ টাকা, আর নির্দিষ্ট এটিএম-এ প্রতি হাজারে ১৪.৯০ টাকা চার্জ রয়েছে। 

অর্থাৎ একজন বিকাশ গ্রাহক ৫০ হাজার টাকা উত্তোলনে ৯শ' ২৫ টাকা ও ১ লাখ টাকা উত্তোলনে ১ হাজার ৮শ' ৫০ টাকা চার্জ দিতে হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যাংক গ্রাহকের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা স্থানান্তরে কোন ফি আরেপিত হয় না। যদিও বিকাশের এই ১৮.৫০ টাকা পুরোটাই মুনাফা নয়। এর মধ্যে এজেন্ট কমিশন, বিতরণ নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তি, পরিচালন ব্যয়, করসহ বিভিন্ন খরচ থাকতে পারে। তবে বিকাশ এর মুনাফাকে শুধু গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা ক্যাশ আউট বা লেনদেন দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। 

প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী লেনদেন পরিচালনার আয় থেকে পরবর্তি আর্থিক ব্যবস্থানায় বিকাশের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রথম ৬ মাসে বিকাশ ক্যাশ ইন আর ক্যাশ আউট করে আয় করে ৩শ’ ১৯ কোটি টাকা একই সাথে বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের হিসাবে প্রতিদিন যে বিশাল অঙ্কের অর্থ জমা ও প্রবাহিত হয়, সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা বা গ্রাহকের অর্থ অন্যত্র বিনিয়োগ করে বিকাশ মুনাফা করে ১শ’ ১৭ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২৪ বছরের হিসাবে বিকাশ পরিচালনা আয় ছিল যেখানে ৩শ’ ৪২ কোটি টাকা তার বিপোরীতে অর্থ ব্যবস্থাপনা থেকে মুনাফা করে ১শ’ ৯০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার বৃদ্ধির হার প্রায় ৮৬ শতাংশ। এসময় তারা প্রায় ৬ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা ক্যাশ আউট করে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী বিকাশ গ্রাহকের কাছে অর্থ লেনদেন করে মানুফার পাশাপাশি একই গ্রাহকের টাকা পুনরায় বিনিয়োগ করে মুনাফা করছে। 

সংবাদ মাধ্যম বিজনেজ ষ্ট্যান্ডার্ড এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিকাশ যদি শুধু গ্রাহকের ক্যাশ আউট বা ট্রান্সফার এর টাকা গ্রহন না করে তাদের লেনদেন পরিচালনা করে- তবুও তারা কেবল গ্রাহকের অর্থ ব্যবস্থাপনা করে পরিচালণা ব্যয় মিটিয়ে মুনাফা অর্জন করতে পারে। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি কোটি মানুষের আর্থিক অবকাঠামো। অথচ এই অবকাঠামো ব্যবহার করতে গিয়ে জনগণকে প্রতিবছর কত হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। দেশের অনেক ব্যাংকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত টাকা পাঠানোর ফি নেয়া হয় না। বিকাশে দুই ধাপে একই পরিমান পাঠানোর খরচ এর সাথে টাকা উত্তোলন মিলে খরচ দাঁড়ায় ৯শ' ৪৫ টাকা।

অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো ডিজিটার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভারত ডিজিটাল পেমেন্ট -কে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে রাষ্ট্রীয় incentive ব্যবহার করেছে। গেল ২০২৫সালে ভারত এই খাতে ১৫ হাজার কোটি রুপি ভুর্তুকি প্রদান করে জনগনকে বিনা মূল্যে মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা দিয়েছে। ২০২৬ সালের নতুন নীতিতেও সাধারণ মানুষের লেনদেন বিনামূল্যে রাখার অবস্থান নিয়েছে সে দেশের সরকার। অন্যদিকে, দেশের প্রান্তীক জনগোষ্ঠির জন্য সরকারি ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বেতন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি, ক্ষুদ্র ব্যবসার লেনদেন- এসবের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতায় দরিদ্র জনগনের পকেট কাটার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল অর্থনীতির সুবিধা দেশের জনগণকে বঞ্চিত করলে ‘ডিজিটাল অর্থনীতি’ থেকে দেশ ছিটকে পড়তে পারে। 

জনগনের মনে এখন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে এ প্রক্রিয়ায় বিকাশ রকেট নগদ-কে জনগনের পকেট কাটার দায়িত্ব কেন তাদের হাতে দেয়া হলো?
জুলাই বিপ্লব পরবর্তি সরকার ব্যবস্থায় এ প্রশ্নের জবাব চায় মানুষ।

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়