ঢাকা, সোমবার ৩১ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১৫ ১৪৩৩

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২:১৫, ৩০ আগস্ট ২০২৬

সিন্দুরখাঁনে বালু লুটের মহোৎসব, ঝুঁকিতে নদী-খাল ও জনপদ

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নের বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দিন-রাত বিভিন্ন নদী ও খালের নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ বালু তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পরে ট্রাক, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে এসব বালু অন্যত্র নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

এভাবে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে নদী ও খালের তলদেশের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে বড় বড় গর্ত। কোথাও কোথাও নদী ও খালের পাড়ে ভাঙনের ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

দিন-রাত চলছে বালু উত্তোলন
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নের বিভিন্ন নদী ও খালের একাধিক পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চলছে। দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও বালু উত্তোলনের কাজ চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। উত্তোলন করা বালু বিভিন্ন যানবাহনে করে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিয়ম-নীতি ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা না করে নদী ও খালের তলদেশ থেকে বালু তোলার কারণে এসব জলাধারের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানিপ্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে নদী ও খালের তীরবর্তী কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

বদলে যাচ্ছে নদী-খালের তলদেশ
নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে নদী ও খালের তলদেশের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কোনো কোনো স্থানে গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। এসব গর্তে বর্ষাকালে পানির প্রবাহ ও স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পাড়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

স্থানীয়রা বলছেন, নদী ও খালের তলদেশ প্রাকৃতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্যের মধ্যে থাকে। সেখান থেকে অতিরিক্ত বালু তুলে নেওয়া হলে তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে কৃষিজমি ও বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নের নদী ও খালগুলো স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব জলাধারের পানি কৃষিকাজ, মাছসহ জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। একই সঙ্গে নদী ও খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কিংবা আকস্মিক ভাঙনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

প্রতিবাদে ভয়, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “দিন-রাত নদী ও খাল থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকরভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে দাবি তাদের।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বালু উত্তোলনকারীদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনের নজরদারি ও অভিযান দাবি
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদী ও খাল রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি যেসব এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করে সত্যতা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সচেতন মহলের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করে না, দীর্ঘমেয়াদে নদী ও খালের গতিপথ, তীরবর্তী কৃষিজমি এবং মানুষের বসতভিটাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

তাদের দাবি, সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নের নদী ও খালের যেসব পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ কর্মকাণ্ড অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে নদী ও খালের স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে নদীভাঙন ও পরিবেশগত ঝুঁকি। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ চান সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

ইএন/এসএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়