ঢাকা, রোববার ৩০ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১৪ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:৪৩, ২৯ আগস্ট ২০২৬

১৫ অভিযোগ সত্য, তবু অব্যাহতি!

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা কিশোরীদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য পরিচালিত গাজীপুরের কোনাবাড়ী সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালিকা)। এই কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম ও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা ১৫টি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মতিয়ার রহমান। তদন্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পরে গত ২৫ জানুয়ারি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে পরবর্তী বিভাগীয় শুনানিতে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার, বরখাস্তকালকে কর্মকাল হিসেবে গণ্য এবং ওই সময়ের বকেয়া বেতন-ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরে তাকে আবার কোনাবাড়ী সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রেই দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া এবং পরবর্তী শুনানিতে অব্যাহতির এই পার্থক্যই এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তদন্ত-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ জুলাই কয়েকজন কিশোরী মো. সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগটি জেলা ও বিভাগীয় দপ্তর হয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরে পৌঁছায়। পরে ১০ নভেম্বর কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (উপসচিব) ও বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়, ঢাকার পরিচালক আয়েশা আক্তার।

৮ ডিসেম্বর দেওয়া প্রতিবেদনে ছয়জন কিশোরীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল একা কক্ষে ডেকে নেওয়া, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অভিযোগ করলে হয়রানির আশঙ্কা দেখানো।

কয়েকজন কিশোরীর অভিযোগ, ছুটির দিন, সন্ধ্যা এমনকি রাতেও তাদের একা কক্ষে ডেকে নেওয়া হতো। একজন অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে তিনি তত্ত্বাবধায়কের হাতে কামড় দিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন। আরেকজনকে বাথরুমে একসঙ্গে সময় কাটানোর প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিবাহিত কিশোরীদের স্বামী ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে বিব্রতকর প্রশ্ন করা এবং স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। অভিযোগকারীদের কয়েকজন আগে বিষয়টি জানালেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছরের ৩০ অক্টোবর কয়েকজন নিবাসী সেতারুজ্জামানের ওপর চড়াও হয়ে তার কক্ষের আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাটিকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তদন্তে আরও অভিযোগ উঠে আসে, নিজের মুঠোফোন ব্যবহার করে টাকা নিয়ে কিশোরীদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়া, টাকা দিতে না পারলে যোগাযোগের সুযোগ না দেওয়া, অভিভাবকদের কাছ থেকে উপহার বা বিশেষ খাবার নেওয়া, কেস ওয়ার্কারকে বাদ দিয়ে কিশোরীদের একা কক্ষে ডাকা এবং আনসার সদস্যদের মাধ্যমে কিশোরীদের ডেকে নেওয়া।

এ ছাড়া খাবার ও সাক্ষাৎ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, নারী কর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং বডি শেমিংয়ের অভিযোগও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

এক অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীর গর্ভপাত করানোর উদ্দেশ্যে খাবারের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়। তবে বিভাগীয় শুনানিতে এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মতিয়ার রহমান জানান, আয়েশা আক্তারের তদন্তে সেতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা ১৫টি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে সেতারুজ্জামান আত্মপক্ষ সমর্থন করে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। গত ১ জুলাই ব্যক্তিগত শুনানির পর তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তবে তদন্তে সত্য বলে বিবেচিত অভিযোগগুলোর কোনটি কী কারণে বিভাগীয় শুনানিতে টেকেনি, নতুন কী সাক্ষ্য বা প্রমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পার্থক্যের কারণ কী, তা স্পষ্ট হয়নি।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা আয়েশা আক্তারও অব্যাহতির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে উল্লেখ রয়েছে। তিনি দ্রুত বদলি, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বালিকা কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে একজন নারী কর্মকর্তাকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিলেন।

অন্যদিকে মো. সেতারুজ্জামান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করেছেন।

সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা কিশোরীদের নিরাপত্তা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা, বিভাগীয় বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এসেছে।

তদন্তে ১৫টি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও কীভাবে শেষ পর্যন্ত ওই কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো, কোন ভিত্তিতে অভিযোগগুলো খারিজ হলো এবং তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পার্থক্যের কারণ কী, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইএন/এসএ

Green Tea
সারাবাংলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়