ঢাকা, রোববার ৩০ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ১৪ ১৪৩৩

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩:২৬, ২৯ আগস্ট ২০২৬
আপডেট: ২৩:৪০, ২৯ আগস্ট ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আলাউর রহমান চৌধুরী আর নেই

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আলাউর রহমান চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আলাউর রহমান চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক ছাত্রনেতা ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আলাউর রহমান চৌধুরী আর নেই। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ৮টা ২০ মিনিটে মৌলভীবাজার শহরের কাজিরগাঁও এলাকার নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মরহুম আলাউর রহমান চৌধুরী ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলনে মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছিলেন। তিনি মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, মৌলভীবাজার জেলা বাকশালের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় মৌলভীবাজার শহরের কাজিরগাঁও টিকরবাড়ির টিলায় তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাজনগর উপজেলার ভাংগারহাট প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দুপুর ২টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর ছেলে তাসনিম চৌধুরী নাঈম মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।

তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুসংবাদে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, সাবেক ছাত্রনেতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

এদিকে আলাউর রহমান চৌধুরীর মৃত্যুতে মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা জানানো হয়েছে। এক শোকবার্তায় ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ মান্নান, ফাউন্ডেশনের ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফাউন্ডিং প্রেসিডেন্ট ও গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকের কেন্দ্রীয় কনভেনর মোহাম্মদ মকিস মনসুর, সহসভাপতি জয়নাল আবেদিন খান, সাধারণ সম্পাদক এম মুহিবুর রহমান মুহিব, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুজিব মনসুরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শোকবার্তায় মোহাম্মদ মকিস মনসুর বলেন, আলাউর রহমান চৌধুরী ছিলেন একজন সৎ, নির্লোভ ও পরোপকারী মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারবাসী আন্দোলন-সংগ্রামের একজন প্রবীণ সহযোদ্ধাকে হারিয়েছে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ছাত্র আন্দোলনে ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অবদান স্থানীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আলাউর রহমান চৌধুরীর কর্মময় জীবন, সততা, মানবিকতা ও সমাজসেবার প্রতি তাঁর নিবেদন মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মহান আল্লাহর কাছে তাঁকে জান্নাতবাসী করার জন্য দেশ-বিদেশের সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়
আলাউর রহমান চৌধুরী রাজনগর উপজেলার ভাংগারহাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মরহুম ইসমাইল আলী চৌধুরীর সন্তান। গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে রাজনগর পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে মৌলভীবাজার কলেজের কলা বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করার পর সেন্ট্রাল ল’ কলেজে আইন বিষয়ে পড়াশোনায় ভর্তি হন।

স্কুলজীবন থেকেই তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাস করার পর তিনি ন্যাপে যোগ দেন।

আলাউর রহমান চৌধুরীর রাজনৈতিক ও ছাত্রজীবনের সঙ্গে মৌলভীবাজারের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মৌলভীবাজার কলেজের ১৯৬৪ সালের ছাত্র সংসদের মিলনায়তন সম্পাদক ছিলেন। সে সময় মৌলভীবাজারে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগেও তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শহীদ মিনার নির্মাণের সেই সময়কার বিভিন্ন ঘটনা স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তুলে ধরেন।

ষাটের দশকের শেষভাগে স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন ছাত্রসমাজের আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বস্থানীয় কর্মী হিসেবে তিনি রাজপথের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

স্থানীয়ভাবে পরিচিতি ছিল, তিনি অনর্গল বক্তৃতা দিয়ে সহজেই মানুষের মন জয় করতে পারতেন। কলেজজীবনে তিনি ছিলেন সহপাঠী ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় নেতা। ১৯৬৯-৭০ সালের উত্তাল সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় ও তুখোড় নেতা হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও আলাউর রহমান চৌধুরী সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, সদালাপী, হাস্যোজ্জ্বল ও পরোপকারী মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে একজন প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সমাজসেবককে হারাল মৌলভীবাজার।

ইএন/এসএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়