ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ১৮ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:৪৪, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেট: ২৩:৪৫, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোকালয়ে বন্যপ্রাণী, আবাসস্থল হারানোর সংকেত?

শ্রীমঙ্গলে ২০ বন্যপ্রাণী উদ্ধার, ১৭টিই সাপ

এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

চা-বাগান, বন, টিলা ও জলাভূমিবেষ্টিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকা। অথচ এই প্রকৃতির বাসিন্দারাই এখন ক্রমেই দেখা দিচ্ছে মানুষের বসতবাড়ি, আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি ও খামারে। কখনো ঘরের সিলিংয়ে অজগর, কখনো মাছ ধরার জালে দাঁড়াশ, আবার কখনো বসতঘরে বিষধর শঙ্খিনী।

শুধু আগস্ট মাসেই শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে ১৭টিই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। রয়েছে একটি শঙ্খচিল ও দুটি বানর। উদ্ধার হওয়া সাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অজগর, ৯টি, যার একটি ছিল মৃত।

প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি কেবল বর্ষা ও গরমের মৌসুমি প্রভাবে বন্যপ্রাণীর চলাচল বৃদ্ধি, নাকি বনভূমি সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থল ও খাদ্যব্যবস্থার পরিবর্তন এবং মানুষের অবকাঠামোগত বিস্তারের কারণে বন্যপ্রাণীরা ক্রমেই লোকালয়ের দিকে ঠেলে আসছে?

বন্যপ্রাণী ও পরিবেশসংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে, বিষয়টি শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বনাঞ্চলে মানুষের অনুপ্রবেশ, আবাসস্থলের পরিবর্তন, খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট এবং বনভূমির মধ্য দিয়ে সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, গরম ও বর্ষায় প্রাণীদের চলাচল বেড়ে যাওয়াও লোকালয়ে আসার অন্যতম কারণ হতে পারে।

আগস্টজুড়ে একের পর এক উদ্ধার
আগস্টের শুরুতেই হাইল হাওরের ধানখেত থেকে অজগর উদ্ধারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মাসব্যাপী এই উদ্ধার কার্যক্রম। ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর, ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি বেত আঁচড়া। ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে উদ্ধার করা হয় একটি মৃত অজগর।

১২ আগস্ট শাহীবাগ থেকে একটি শঙ্খচিল উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ১৩ আগস্ট উদ্ধার করা অজগরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২ ফুট এবং ওজন প্রায় ১৬ কেজি। পরে সেটিকে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

১৫ আগস্ট ছিল উদ্ধার অভিযানের অন্যতম ব্যস্ত দিন। ওই দিন রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়।

নোয়াগাঁওয়ে মাছ ধরার জালে আটকে পড়া দাঁড়াশ সাপটিকে স্থানীয়রা হত্যা না করে ফাউন্ডেশনকে খবর দেন। পরে উদ্ধারকারী দল গিয়ে সাপটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় মানুষের এমন সচেতনতা বন্যপ্রাণী রক্ষায় ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ এবং ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়। ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একটি শঙ্খিনী সাপ।

মাসের শেষ সপ্তাহেও থামেনি উদ্ধার কার্যক্রম। ২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সাপটির প্রজাতি শনাক্ত করা হয়। ২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

‘বনের ভেতরে খাবারের সংকট’
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, বনের ভেতরে খাবারের সংকট ও বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।

তিনি বলেন, উদ্ধার করা প্রাণীগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিচর্যা দিয়ে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

বন উজাড়ের প্রসঙ্গ তুলে স্বপন দেব সজল বলেন, বন উজাড় হচ্ছে। খাবার না থাকলে প্রাণী কীভাবে সেখানে থাকবে? এ বিষয়ে বন বিভাগের আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

হাইল হাওর থেকে অজগর উদ্ধারের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, কৃষকেরা প্রথমে সাপটিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় একজন ব্যক্তি বাধা দিয়ে ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল গিয়ে অজগরটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে।

‘গরম ও বর্ষায় চলাচল বাড়ে’
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগস্টের শুরুতে উদ্ধার করা অজগরটির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে বনে অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

এক মাসে এত বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন গরম ও বর্ষার সময়। এ কারণে হয়তো প্রাণীগুলো লোকালয়ে চলে আসছে। তাছাড়া খাবার ও অন্যান্য কোনো সংকট নেই।’

তবে বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক ও রেলপথ চলে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এতে অনেক প্রাণী আহত বা মারা যাচ্ছে বলেও জানান।

তাঁর মতে, সড়কপথের বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গেলে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব।

রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দিন দিন বনে প্রাণী বাড়ছে, কমছে না। আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি প্রাণী দেখা যাচ্ছে।’

দুই মত, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
বন বিভাগের এই বক্তব্যের সঙ্গে পরিবেশকর্মীদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে ভিন্নতা। সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি শুধু মৌসুমি চলাচলের ফল নয়; এর সঙ্গে তাদের আবাসস্থল, খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্রের পরিবর্তনের বিষয়টিও জড়িত।

শ্রীমঙ্গলের বন, চা-বাগান, টিলা ও জলাভূমি ঘিরে মানুষের বসতি এবং অবকাঠামো ক্রমেই বাড়ছে। এসব এলাকায় বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে তারা বিকল্প পথ হিসেবে মানুষের বসতি, কৃষিজমি কিংবা আবাসিক এলাকায় চলে আসতে পারে।

বিশেষ করে সাপের উপস্থিতি বৃদ্ধিকে শুধু সাপের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে না মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইঁদুর, ব্যাঙ, মাছসহ খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন উপাদানের অবস্থার সঙ্গেও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেটিকে হত্যা করেন। অথচ এসব প্রাণী প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি বলেন, বাড়ি বা লোকালয়ে সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল বা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

তাঁর মতে, সাপসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীকে হত্যা না করে নিরাপদে উদ্ধার করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

জবাব মেলেনি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার
এক মাসে ২০টি বন্যপ্রাণী লোকালয় থেকে উদ্ধারের কারণ এবং শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়।

তিনি ফোন ধরেন এবং প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। পরিচয় দেওয়ার পর ফোন রেখে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

একদিকে বন বিভাগের দাবি, বনে প্রাণী কমছে না, বরং বাড়ছে। অন্যদিকে মাত্র এক মাসে ২০টি বন্যপ্রাণী লোকালয় থেকে উদ্ধারের তথ্য সামনে আসছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর এই ঘন ঘন উপস্থিতি কি প্রকৃতির স্বাভাবিক চলাচল, নাকি তাদের আবাসস্থল ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চাপের একটি দৃশ্যমান সংকেত?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণীর বিচরণপথ, খাদ্যব্যবস্থা এবং মানুষের সম্প্রসারণের ওপর আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইএন/এসএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়