ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,   ভাদ্র ১৮ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:৪৯, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক কম্পিউটার, সাড়ে ৩ মিলিয়ন ডলারের ‘ইনপুট বাংলা’

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

একটি ছোট ভাড়া ঘর, একটি কম্পিউটার আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস। ২০১৫ সালে এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল শ্রীমঙ্গলের ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান ‘ইনপুট বাংলা’র। এক দশকের কিছু বেশি সময়ে সেই ছোট উদ্যোগই এখন পরিণত হয়েছে কয়েক শত তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ঠিকানায়। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সম্পদমূল্য প্রায় সাড়ে ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছেন এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাকির হোসেন।

ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন ছিল জাকির হোসেনের। পাশাপাশি বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষ দিকে ঢাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। ওই বন্ধু ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, ডিজিটাল দুনিয়ার বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা জাকিরকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

শেষ পর্যন্ত প্রচলিত চাকরির পথ ছেড়ে বন্ধুর সঙ্গে অংশীদারত্বে শ্রীমঙ্গলে একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

২০১৫ সালের শুরুতে মৌলভীবাজার সড়কের ১ নম্বর পুলের পাশে ছোট্ট একটি ভাড়া ঘরে মাত্র একটি কম্পিউটার নিয়ে শুরু হয় ‘ইনপুট বাংলা’র পথচলা। পুঁজি বলতে ছিল নিজের আগ্রহ, বন্ধুর অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস।

তবে প্রতিষ্ঠান গড়েই থেমে থাকেননি জাকির। কাজের পাশাপাশি প্রায় আড়াই বছর ঢাকার বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেন। এমনকি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও কোনো পারিশ্রমিক নেননি। বিনিময়ে অর্জন করেছেন বাস্তব অভিজ্ঞতা, যা পরবর্তী সময়ে নিজের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কাজে লাগে।

ছোট ঘর থেকে বড় পরিসরে
একটি ছোট ভাড়া ঘর থেকে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। প্রথমে পাশের আরও দুটি ঘর যুক্ত করা হয়। সেখানেও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় একসময় নিজ বাসা থেকেই কাজ পরিচালনা করতে হয়। পরে ২০২৫ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ সবুজবাগ রোডে নতুন পরিসরে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়।

বর্তমানে সেখানে তিন শিফটে কাজ করছেন প্রায় ৩৬০ জন তরুণ-তরুণী। তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নারী। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ বেকার, আবার কেউ স্বল্পশিক্ষিত। শ্রীমঙ্গলের মতো একটি মফস্বল শহরে বসেই তারা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রোপার্টি ম্যানেজমেন্ট, ডাটা এন্ট্রি, ডাটা রিসোর্স, ভার্চুয়াল ল’ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইমিগ্রেশন ল’ ডাটা এন্ট্রি, ডাটা ট্রান্সফার, ফরম প্রসেসিং, ই-মেইল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন ও মার্কেটিং এবং রিমোট ভিডিও মনিটরিংয়ের মতো বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী শত শত তরুণ-তরুণী কম্পিউটারের বড় পর্দায় চোখ রেখে গভীর মনোযোগে কাজ করছেন। কারও চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কারও কাছে এটি জীবিকার নতুন পথ। মফস্বল শহরে বসেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তাদের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

‘চাকরি না করে কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন’
নিজের শুরুর সময়ের কথা বলতে গিয়ে জাকির হোসেন বলেন, অনার্স শেষ করার পর যখন প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন, তখন তাঁর বিয়ের কথাও চলছিল। কিন্তু সে সময় ফ্রিল্যান্সিংকে অনেকেই পেশা হিসেবে নিতে চাইতেন না। আত্মীয়স্বজনের কেউ কেউ তাঁকে ব্যাংকের চাকরিতে ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।

তবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন তিনি।

জাকির হোসেন বলেন, “তখনই বুঝতে শুরু করেছিলাম, ফ্রিল্যান্সিং ভবিষ্যতের একটি বড় কর্মক্ষেত্র হতে পারে। চাকরি করলে হয়তো কয়েকজন মানুষের অধীনে কাজ করতে হতো। আর এখন আমার প্রতিষ্ঠানে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ কাজ করছে, শিখছে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে।”

তিনি জানান, মোটামুটি ইংরেজিতে দক্ষ বিভিন্ন বয়সী তরুণ-তরুণীদের এখানে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। শুরুতে সর্বোচ্চ তিন মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণকালীন সময়ে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া না হলেও এ জন্য কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় না। দক্ষতা অর্জনের পর যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মীদের সম্মানজনক পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।

চা শ্রমিক পরিবারের সন্তানদেরও সুযোগ
শুধু শহরের তরুণদের নয়, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে ‘ইনপুট বাংলা’। বিশেষ করে চা শ্রমিক পরিবারের অনেক ছেলে-মেয়ে এখানে কাজ করছেন।

দূরবর্তী এলাকার কর্মীদের জন্য রাতে কাজ শেষে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

জাকির হোসেন বলেন, বর্তমানে জায়গার সংকটের কারণে অনেক আগ্রহী তরুণ-তরুণীকে অপেক্ষমাণ রাখতে হয়েছে। তাঁর পরিকল্পনা, কর্মীরা এখানে তিন থেকে পাঁচ বছর কাজ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, তা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে নিজেরাই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন।

ইতোমধ্যে এখান থেকে ফ্রিল্যান্সিং শিখে কয়েকজন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে সফল হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বাড়ছে আয়, বাড়ছে সম্পদ
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অগ্রগতির চিত্রও তুলে ধরেছেন জাকির হোসেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ‘ইনপুট বাংলা’র সম্পদমূল্য প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৪ হাজার ডলারে। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই টার্নওভার ২ লাখ ৮৪ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে।

জাকির বলেন, “এটা একদিনে হয়নি। শুরুর দিকে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। ঠিকমতো ঘুমানো, খাওয়া—কোনোটাই নিয়মমতো করা সম্ভব হয়নি। সেই শ্রম আর সময়ই আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।”

প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁর সরল উত্তর, “বাধাহীন বলে কিছু নেই। সব বাধা পেরিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হয়।”

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নীতিগত সহায়তার দাবি
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে জাকির হোসেন বলেন, বর্তমানে টেক সেক্টরে কর-সুবিধা ছাড়া তেমন কোনো সরকারি সহায়তা তিনি পাননি। তবে এজন্য সরকারকে দোষারোপ করতে চান না তিনি।

তাঁর মতে, সময়োপযোগী সরকারি কর্মসূচি ও নীতিগত সহায়তা পেলে দেশের টেক সেক্টরের চেহারা আমূল বদলে দেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।

কারণ ফ্রিল্যান্সিং ও আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ অত্যন্ত জরুরি।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টরা প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ব্যবস্থার অ্যাক্সেস রাখেন। একইভাবে প্রতিষ্ঠানকেও তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নির্দিষ্ট অ্যাক্সেস নিতে হয়।

‘১০ বছরে শ্রীমঙ্গল হতে পারে টেক সিটি’
মফস্বল শহরের তরুণদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জাকির হোসেন। তাঁর মতে, সরকারি ঋণ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন মফস্বল এলাকায় আরও অনেক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে।

তাঁর স্বপ্ন, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত সহযোগিতা পাওয়া গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে শ্রীমঙ্গলকে একটি সম্ভাবনাময় ‘টেক সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

দেশের অর্থনীতিতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতের মতো ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশই দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। তাই তরুণদের এই খাতে উৎসাহিত করা গেলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দুয়ার খুলতে পারে।

ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন থেকে ফ্রিল্যান্সার, আর একটি কম্পিউটার নিয়ে শুরু করা তরুণ থেকে কয়েক শত তরুণের কর্মসংস্থানের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা জাকির হোসেনের গল্প তাই কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, রাজধানীর বাইরে থেকেও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গলের মতো একটি মফস্বল শহরের তরুণদের সম্ভাবনাও যে কোনো অংশে কম নয়, ‘ইনপুট বাংলা’ তার একটি বাস্তব উদাহরণ।

ইএন/এসএ
 

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়