ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৭

মুজিবুর রহমান রঞ্জু

প্রকাশিত: ২৩:৪৪, ১০ নভেম্বর ২০২০

ভিনদেশী গাছের বনায়নে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্য!

সড়কের দুইধারে কৃত্রিম বনায়ন

সড়কের দুইধারে কৃত্রিম বনায়ন

প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আকাশমনি, ম্যানজিয়াম, রাবার, ইউক্যালিপটাস সহ বিভিন্ন প্রজাতির ভিনদেশী গাছের বনায়নে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কৃষি ও প্রাণ বৈচিত্র্যের। আগ্রাসী প্রজাতির এসব গাছের কাঠ ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও দ্রুত বর্ধনশীল হিসেবে পরিগণিত হলেও সড়কের দুইধারে, বাড়িঘরের আশেপাশে, বনের টিলায় এসব গাছের কৃত্রিম বনায়ন সৃষ্টি হচ্ছে কয়েক যুগ ধরে।

মৌলভীবাজার জেলায় সামাজিক ও কৃত্রিম বনায়নে ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীরাই এ অভিযোগ তুলেছেন। অনুসন্ধানকালে জানা যায়, আকাশমনি, ম্যানজিয়াম প্রজাতির বিদেশী গাছগুলো দ্রুত বর্ধনশীল। কম সময়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় গত কয়েক যুগ ধরে এসব গাছ দিয়ে বনায়নের হিড়িক শুরু হয়।

সরকারি উদ্যোগে সিলেট বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সামাজিক ও সুফল বনায়নে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গাছ রোপন করা হয়েছে। এছাড়া রাস্তার দুইধারে সামাজিক বনায়ন এবং ব্যক্তি উদ্যোগে রোপিত আগ্রাসী প্রজাতির এসব বিদেশী ক্ষতিকর গাছের কৃত্রিম বনায়ন সমূহ শোভা পাচ্ছে। এতে কৃষি আবাদ, মৎস্য চাষাবাদে ক্ষতি ছাড়াও পশুপাখির খাদ্য তৈরি না হওয়ায় পরিবেশেরও ক্ষতি করছে।

ফলে দেশীয় প্রজাতির ফলের গাছ এবং ঔষধি গাছের চাষাবাদ উৎপাদন ও সংরক্ষণের বিষয়টি এখন প্রায় উপেক্ষিত। সড়ক ধারের সামাজিক বনের এসকল গাছের ছায়ায় পড়ে ধান গাছে রোগ ও পোকার আক্রমন মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যায়ক্রমে জমিতে ধান গাছ মরে যাচ্ছে। সঠিকভাবে ধান গাছে ফলন আসছে না বলেই এক পর্যায়ে ধানগাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে কিংবা গো-মহিষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অন্যদিকে কম ব্যয়ে অধিক আর্থিক সুবিধার কারণে চা বাগান সমূহে চা গাছের টিলা ভূমিতেও ক্ষতিকর রাবার গাছের চাষাবাদও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কমলগঞ্জের কৃষক নজির মিয়া, রুশন মিয়া, তোয়াবুর রহমান,মোবাশ্বির আলী বলেন, ধানী জমির সড়ক ধারে আকাশমনি, ম্যানজিয়াম এসব গাছ গাছালি ধান চাষাবাদে ও কৃষিজমি বিনষ্ট করে। মৎস্য খামারের আশেপাশে থাকলে মৎস্য উৎপাদনেও ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। গাছের ছায়ায় ধানী জমির জায়গা দখল করে ও ধান গাছ মরে যায়। চাষকৃত ধান গাছ কেটে গরু মহিষকে খাওয়ানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন(বাপা)সিলেট বিভাগীয় সম্পাদক আব্দুল করিম বলেন, এ গাছগুলো দেশীয় প্রজাতির সৃজিত গাছের জায়গা দখল করে সেগুলোকে বিপন্ন করে তোলে। এসব গাছ মাটির নিচের অতিরিক্ত পানি শোষণ করে মাটির নিচকে পানি শূণ্য করে দেয়।

মৌলভীবাজারের বন্য প্রাণী ব্যস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, আগ্রাসী প্রজাতির গাছগাছালি পশু পাখির খাবার তৈরি করে না এবং ব্যাপক বিস্তারে অন্য গাছগুলোর সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। যে কারণে জীববৈচিত্র্যের জন্য আগ্রাসী প্রজাতির গাছ খুবই ক্ষতিকর।

প্রকৃতিবিদ দ্বিজেন শর্মা তাঁর এক লেখায় এ বিষয়ে মত প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘ইউক্যালিপটাস, শিশু, মেহগনি, রেইনট্রি এই গাছগুলো অত্যধিক পানি শোষণ করে জমি শুকিয়ে ফেলে। শিকড় গভীরে প্রোথিত না হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আশপাশে অন্য গাছপালা জন্মাতে দেয় না।’

তাঁর মতে ‘আমাদের দেশে দরকার জলজ উদ্ভিদ। এখানে জলজ জায়গা বেশি। শিকড় গভীরে প্রোথিত হয়। ফলে পাশে অন্যকিছুও জন্মাতে পারে।’

কমলগঞ্জের রাজকান্দি বন রেঞ্জ কর্মকর্তা আবু তাহের আকাশমনি গাছের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে বলেন, এখন এসব গাছ রোপন এবং সরকারি নার্সারীগুলোতে আকাশমনি, ম্যানজিয়াম গাছের চারা উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই গাছগুলোর বিষয়ে উর্ধ্বতন মহলেও আলোচনা হচ্ছে এবং বনায়নে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্তি উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. শামসুদ্দীন আহমদ বলেন, আকাশি, ইউক্যালিপটাস গাছের ছায়ায় ধান গাছের পাতা মোড়ানো রোগসহ বিভিন্ন ছত্রাকে আক্রান্ত করে। তিনি আরও বলেন, আকাশি গাছের পাতা ঘন, এমনকি সূর্যের আলো মোটেও পড়ে না। এগুলো প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর। গাছের পাতা পড়ে কৃষি ক্ষেত বিনষ্ট হয়।

আইনিউজ/মুজিবুর রহমান রঞ্জু 

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়