Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,   ফাল্গুন ১২ ১৪৩২

সাজু মারছিয়াং

প্রকাশিত: ১৪:৪৮, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

ভিক্ষা ছাড়ার পথে জন্মান্ধ রাম নারায়ণের স্বপ্নভঙ্গ

জন্ম থেকেই অন্ধ রামনারায়ন রবিদাস। ছবি: আই নিউজ

জন্ম থেকেই অন্ধ রামনারায়ন রবিদাস। ছবি: আই নিউজ

জন্ম থেকেই আলো দেখেননি রামনারায়ন রবিদাস। চোখে না দেখলেও জীবনের নিষ্ঠুরতা তিনি হাড়ে হাড়ে দেখেছেন। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের পালকিছড়া চা-বাগানে টিনের চালার নিচে চারজনের পরিবার নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের যুদ্ধ শুধু বেঁচে থাকার। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভিক্ষা করে কোনো রকমে দিন পার করতেন। তবু মনের ভেতরে ছিল একটুখানি স্বপ্ন, এই জীবন বদলাবেন, ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখবেন চিরতরে।

অনেক কষ্টে, অনেক লজ্জা আর অনিশ্চয়তা সয়ে তিনি নিলেন এক লাখ টাকার ঋণ। ঘরের জমানো শেষ সম্বল যোগ করে কিনলেন একটি অটোরিকশা। ভেবেছিলেন, ছেলে সেটি চালাবে, ঘরে দু’মুঠো ভাত নিশ্চিত হবে, ভিক্ষার জীবনের অবসান হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাঁচলো মাত্র ছয় মাস।

গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে ঘুম ভাঙতেই রামনারায়নের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার যেন জন্মান্ধতার চেয়েও ভয়ংকর। উঠোনে এসে দেখেন তালা ভাঙা, ভেতরে অটোরিকশা নেই। সব শেষ। যে বাহনটি ছিল বেঁচে থাকার শেষ ভরসা, সেটিও চোরের হাতে হারিয়ে গেল।

বুধবার বিকেলে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা। কোনো হাসি নেই, কোনো কথার শব্দ নেই। টিনের চালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন হেরে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি। শরীরে গরম কাপড় নেই, চোখে মুখে ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব।

উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় রামনারায়ন বলেন, বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করেই সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে রিক্সাটা কিনছিলাম। ভাবছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে চালাবে, সংসার চলবে। কিন্তু আল্লাহ আর সে সুখ দিলেন না।

এই কথাটুকু বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাস শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, এই অটোরিক্সাটাই আছিল বিপদের ভরসা। মনে করছিলাম, আর ভিক্ষা করবো না। সংসারটা একটু দাঁড়াইবো। সব শেষ হয়ে গেল। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল।

রামনারায়নের কণ্ঠে আছে ক্ষোভের চেয়ে বেশি হতাশা। তিনি বলেন, পুলিশকে জানাইয়া লাভ কী? এলাকায় কত গরু চুরি হইছে, কোনটার খবর মিলছে? আমারটা কীভাবে পাইবো?

স্থানীয়দের ভাষ্য, গত সাত মাসে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৫টি গরু চুরি হয়েছে। একটি গরুও উদ্ধার হয়নি। চোরের সাহস বেড়েছে, মানুষের ভয় বেড়েছে।

এ বিষয়ে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত পরিতাপের। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রামনারায়নের বাড়িতে পুলিশ খোঁজ নিতেও আসেনি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য গনেশ গোয়ালা বলেন, অন্ধ চোখে যে মানুষটি একটু আলোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আলো নিভে গেছে চোরের হাতে।

ইএন/এসএ

Green Tea
সারাবাংলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়