ঢাকা, শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬,   শ্রাবণ ৩০ ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩:৫৭, ৩০ মে ২০২০
আপডেট: ১৪:১৮, ৩০ মে ২০২০

করোনা ভাইরাস নিয়ে ভুল তথ্যের যত মাশুল

"জীবাণুনাশক তো এক মিনিটের মধ্যে এ ভাইরাস মেরে ফেলতে পারে। এমন কোন ব্যবস্থা কি করা যায় যাতে এরকম কোন ইনজেকশন বা কিছু একটা দিয়ে ভেতরটা পরিষ্কার করা যেতে পারে?"

“‍করোনাভাইরাস আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেবার জন্য ব্যবহার করছে”

“ফাইভজি, তোমাদের কোন নীতি নেই,ফাইভজি আমাদের মেরে ফেলছে!‍”

”গরম পানি খেলে বা শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে ভাইরাস সেরে যায়। ”

"অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে।"

"এই ভাইরাস গুরুতর কিছু নয়,সাধারণ ফ্লুর মতোই"

উপরের সবগুলো তথ্যই করোনা ভাইরাস নিয়ে ছড়ানো একেকটা ভুল আর বিভ্রান্তিকর তথ্য।আর এই ভুল তথ্যের প্রভাবে বলি হয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের অসংখ্য মানুষ। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই ছড়িয়েছে একে কেন্দ্র করে নানা রকম ভুল তথ্য।এর ফলে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন গুজব,ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক ভুয়া তথ্যের ফলে অনেক রকম পরোক্ষ ক্ষতি ঘটে যায় - যার প্রভাব অনেক ব্যাপক ও গভীর।

“‍আমরা ভেবেছিলাম সরকার এই করোনাভাইরাসকে আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেবার জন্য ব্যবহার করছে অথবা এটার সাথে হয়তো ফাইভ-জির কোন সম্পর্ক আছে। তাই আমরা কোন নিয়মকানুন মানিনি, দ্রুত সাহায্যও চাইনি।”– ফ্লোরিডার এক হাসপাতাল থেকে জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রায়ান লী হিচেন্স,

তার স্ত্রীও কোভিড-১৯-এ সংকটজনক অবস্থায় ছিলেন পাশের একটি ওয়ার্ডে। তাকে অজ্ঞান করে ভেন্টিলেটর দিয়ে রাখা হয়।

ব্রায়ান জানান, তার স্ত্রীর ফুসফুসে প্রদাহ হচ্ছে এবং তার শরীর চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিলো না।

অথচ এই ব্রায়ানেরই ইন্টারনেটে ছড়ানো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পড়ে ধারণা হয়েছিলো – করোনাভাইরাস জিনিসটা পুরোপুরিই একটা গুজব – নাহলে বড়জোর একটা ফ্লুর চাইতে বেশি কিছু না।

কিন্তু মে মাসে তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনেই সংক্রমিত হবার পর এখন ব্রায়ান স্বীকার করছেন – তিনি বুঝেছেন যে করোনাভাইরাস কোন ভুয়া জিনিস নয়। এটা আছে এবং আমেরিকা জুড়ে ছড়াচ্ছে।

বিবিসি এক জরিপের মাধ্যমে জানায়, অনলাইনে ছড়ানো গুজবের কারণে ভারতে ক্ষিপ্ত জনতার আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, ইরানে ঘটেছে গণহারে বিষপ্রয়োগ।টেলিকম ইঞ্জিনিয়াররা হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন।যুক্তরাজ্যসহ কিছু দেশে ফোনের টাওয়ারে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। সবই ঘটেছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কারণে।

অনলাইনে কোভিড-১৯ সারাতে এ্যালকোহল কার্যকর - এমন গুজব ছড়ানোর পর ইরানে মদ্যপানজনিত বিষক্রিয়ায় শত শত লোক মারা গেছেন।এপ্রিল মাসের শেষে ইরানের একজন কর্মকর্তা জানান, করোনাভাইরাস সারাতে মদ খেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৭৯৬। তিনি আরো বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া খবরই এর কারণ।ইরানে মদ নিষিদ্ধ, এবং চোরাইবাজারে যে মদ পাওয়া যায় তা প্রায়ই বিষাক্ত হয় – তাই এরকম মৃত্যুর আসল সংখ্যা বলা কঠিন। যেখানে করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য পাঁচ বছরের এক শিশুকে তার অভিভাবকরাই চোরাই মদ পান করায় এবং শিশুটি তাতে অন্ধ হয়ে যায়।বিবিসির অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে আসে।

খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও করোনা নিয়ে ভুল বার্তা দিয়েছেন।হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ছাড়াও আরো কিছু কোভিড ‘চিকিৎসা’ সম্পর্কে তার দেয়া ভুল পদ্ধতি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়।এতে কেউ কেউ এ পদ্ধতি গ্রহণ করে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের জীবনকে ঠেলে দেন মৃত্যুর মুখে।

এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি বলেন,অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে।তারপর তিনি বলেন,"জীবাণুনাশক তো এক মিনিটের মধ্যে এ ভাইরাস মেরে ফেলতে পারে।এমন কোন ব্যবস্থা কি করা যায় যাতে এরকম কোন ইনজেকশন বা কিছু একটা দিয়ে ভেতরটা পরিষ্কার করা যেতে পারে?”

তার এসব কথার পর অনেক আমেরিকান হটলাইনে এ বিষয়ে জানতে ফোন করে।কানসাস অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রেসিডেন্টের ওই ব্রিফিংএর পর তারা এক ব্যক্তির জীবাণুনাশক সাবান পান করার ঘটনার কথা শুনেছেন।

নিউইয়র্কের এলমহার্স্ট হাসপাতালের একজন ডাক্তার ড. ডানকান মারু বলেছেন, তার সহকর্মীরা এমন কিছু রোগীর চিকিৎসা করেছেন যারা জীবাণুনাশক খাওয়ার পর মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা রাজ্যের এক দম্পতি ওয়ান্ডা আর গ্যারি লেনিয়াস। মার্চ মাসের শেষ দিকে তারা করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের কথা শুনলেন।

ফিনিক্সে তাদের বাড়িতে একদিন তারা একটা পুরোনো বোতল আবিষ্কার করলেন। তার লেবেলে যে উপাদানের নাম লেখা ছিল, সেটা পড়ে তাদের মনে হলো হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের সাথে এর মিল আছে।আসলে জিনিসটা ছিল মাছ চাষের পুকুর পরিষ্কারের একটা ক্লিনিং প্রোডাক্ট ।গ্যারি এবং তার স্ত্রী জিনিসটা এক ঢোক করে পান করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুজনের মাথা ঘোরাতে লাগলো, শুরু হলো বমি আর শ্বাসকষ্ট।

গ্যারি মারা গেলেন। ওয়ান্ডাকে নেয়া হলো হাসপাতালে, তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন।ওয়ান্ডা পরে বলেছিলেন, কেন তারা ওই তরলটা খেয়েছিলেন।

“ট্রাম্প তো বারবার বলছিলেন এতে করোনাভাইরাস সেরে যায়” – বলেন তিনি।

অথচ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। এটা হয়তো ভাইরাস মোকাবিলা করতে পারে, কিন্তু এখনো কিছুই প্রমাণ হয়নি। গত সোমবার বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে – কারণ এক জরিপে দেখা গেছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন বরং কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এটার কার্যকারিতা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা প্রথম শুরু হয় চীনে। এর পর একজন ফরাসি ডাক্তার দাবি করেন, তিনি এটা প্রয়োগ করে উৎসাহব্যঞ্জক ফল পেয়েছেন। এসব জরিপ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হলেও ইন্টারনেটে এবং মিডিয়ায় এ নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে।

গাড়ি নির্মাতা টেজলার প্রধান এলন মাস্ক, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো,মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এটা নিয়ে কথা বলতে থাকেন।ট্রাম্প তার টুইটে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন এবং এ্যাজিথ্রোমাইসিন একসংগে খাবার কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলেন।

মে মাসে হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংএ তিনি বলেন, “এটা খেয়ে দেখুন, আপনার হারানোর তো কিছু নেই।”প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন ,তিনি নিজেও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন খাচ্ছেন।সামাজিক মাধ্যমে এসব মন্তব্য এ বিষয়ে লোকের আগ্রহ ভীষণভাবে বাড়িয়ে দেয়।

এছাড়া যুক্তরাজ্যে অনলাইনে গুজব ছড়ায় যে,ফাইভ-জি মোবাইল ফোন প্রযুক্তি কোন-না-কোনভাবে কোভিড-১৯ ভাইরাসের জন্য দায়ী।এপ্রিল মাসে লেস্টার শহরের কাছে ডিলান ফ্যারেল নামে ওপেনরিচ কোম্পানির একজন ইঞ্জিনিয়ারকে একজন লোক গালাগালি করে। তার গাড়ির জানালা দিয়ে লোকটি চিৎকার করছিল, ‍“ফাইভজি, তোমাদের কোন নীতি নেই, ফাইভজি আমাদের মেরে ফেলছে!‍”মি. ফ্যারেল দ্রুত গাড়ি নিয়ে ওই স্থান ত্যাগ করেন। তিনি বলছেন,তার গাড়ি লক করা না থাকলে নিশ্চিতভাবে লোকটি ঢুকে তাকে আক্রমণ করতো।

গত এপ্রিল মাসে ভারতের দিল্লিতে তিনজন মুসলিম লোককে তিনটি আলাদা ঘটনায় পেটানো হয়। এর আগে গুজব ছড়ায় যে মুসলিমরা ভারতে ভাইরাস ছড়াচ্ছে।এ নিয়েই পূর্ব ভারতের সিসাই গ্রামে এক দাঙ্গায় একজন নিহত হয়।ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ড শহরে দক্ষিণ এশিয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে গুজব ছড়ায় যে অশ্বেতাঙ্গ কোভিড-১৯ রোগীদের মারা যেতে দেয়া হচ্ছে।ভারতের ইন্দোর শহরে একদল ডাক্তার কোভিড আক্রান্ত লোকদের চিহ্নিত করাতে তাদের ওপর পাথর দিয়ে আক্রমণ চালানো হয়।

এর আগে হোয়াটসএ্যাপে বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ায় যে চিকিৎসাকর্মীরা স্বাস্থ্যবান মুসলিমদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং ইনজেকশন দিয়ে তাদের দেহে ভাইরাস ঢুকিয়ে দিচ্ছে।মে মাসে নিউইয়র্ক শহরের কুইন্স বারাতে একটি জরুরি হাসপাতালে হাজির হয় দুজন লোক। তারা রুমমেট, একই বিছানায় ঘুমায়, বয়স চল্লিশের কোঠায়। দু‌জনেই গুরুতর অসুস্থ।

হাসপাতালের ডাক্তার রাজীব ফার্নান্দো বলছিলেন, কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাদের একজন মারা যায়, অন্যজনকে ভেন্টিলেটর দেয়া হয়।ডাক্তার ফার্নান্দো জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা কেন আরো আগে হাসপাতালে আসেনি। জবাবে তারা জানায়, তারা ইন্টারনেটে পড়েছে যে এই ভাইরাস গুরুতর কিছু নয়, সাধারণ ফ্লুর মতোই - এবং তারা ঘরে বসে বিকল্প চিকিৎসা নিচ্ছিল।

এরকম বহু ভুল ধারণা – যেমন গরম পানি খেলে বা শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে ভাইরাস সেরে যায় ইত্যাদি অনেক রোগীর মধ্যে দেখতে পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের রয়াল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স-এর অধ্যাপক মার্টিন মার্শাল ও তার সহকর্মীরা। তাদের অনেকে মনে করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে কোন কাজ হয় না, বা কোভিড-১৯ ভাইরাসের আসলে কোন অস্তিত্ব নেই।

ডাক্তাররা এও বলেন, তারা এখন যা ঘটতে দেখছেন তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের কারণ আছে।করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের গবেষণা যখন চলছে, তখন অনেক টিকা-বিরোধী বা ষড়যন্ত্রের-মানসিকতা সম্পন্ন গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংখ্যা বাড়ছে।একে সম্ভাব্য হুমকি বলে মনে করেন অনেকেই।

তবে ফ্লোরিডার কোভিড রোগী ব্রায়ান - কয়েকদিন আগেও যিনি নিজেই নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বিশ্বাস করতেন – এসব তত্ত্বে বিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে একটা বার্তা দিয়েছেন।

তিনি লিখেছেন - “আমার মত বোকামি করবেন না। তাহলে আমার আর আমার স্ত্রীর ভাগ্যে যা ঘটেছে –তা আপনাদের বেলায় ঘটবে না।”

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়